মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:২৫
ইসলামি মাজহাবগুলোর দৃষ্টিতে তাকাত্তুফ (নামাজে হাত বাঁধা)

ইসলামি মাজহাবগুলোর ফকিহদের মধ্যে নামাজে তাকফীর-অর্থাৎ ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা-ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে কোনো সর্বসম্মত মত নেই।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বিতীয় পর্ব:-

নামাজে ‘তাকফীর’  (হাত বাঁধা) কি ফরজ?

ইসলামি মাজহাবগুলোর ফকিহদের মধ্যে নামাজে তাকফীর-অর্থাৎ ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা-ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে কোনো সর্বসম্মত মত নেই।

বরং বিভিন্ন মাজহাবের ফকিহদের বক্তব্য এবং তাঁদের বর্ণিত হাদিসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নামাজে হাত বাঁধা একটি সুন্নত ও মুস্তাহাব আমল; এটি ফরজ বা অপরিহার্য নয়।

এর সমর্থনে নিম্নোক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করা হয়েছে:

১. সুনান আদ-দারেকুতনীতে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে:

«وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِي الصَّلَاةِ سُنَّةٌ»

নামাজে এক হাতের তালু অপর হাতের ওপর রাখা একটি সুন্নত। [ সুনান আদ-দারেকুতনী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৪ ]

২. আবু দাউদ তাঁর সুনান-এ ইবনু যুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

«صَفُّ الْقَدَمَيْنِ وَوَضْعُ الْيَدِ عَلَى الْيَدِ مِنَ السُّنَّةِ»

দুই পা সোজা করে রাখা এবং এক হাত অপর হাতের ওপর রাখা-সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। [সুনানে আবি দাউদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৯]

৩. ইমাম নববীও তাঁর আল-মাজমূ‘ ফি শরহিত তাহযীব গ্রন্থে একই বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। [আল-মাজমূ‘ ফি শরহিত তাহযীব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১১]

ইজমা বা সর্বসম্মতি:-

নামাজে তাকফীর-অর্থাৎ ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখা-ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ইজমা বা সর্বসম্মতি রয়েছে, এমন দাবি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ এ বিষয়ে ইসলামি মাজহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ কারণেই বিভিন্ন মাজহাবের বিশিষ্ট আলেমগণও এই দাবির বিরোধিতা করেছেন।

এ বিষয়ে ইমাম মালিক তাঁর আল-মুআত্তা, এবং ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ-এ, আবু হাজিমের সূত্রে সাহল ইবনে সা‘দ থেকে বর্ণনা করেছেন। সাহল ইবনে সা‘দ বলেন:

«كَانَ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةِ»

তাদের নির্দেশ দেওয়া হতো,তারা যেন নামাজে তার ডান হাতটি বাম হাতের বাহুর ওপর রাখে। [আল-মুআত্তা-ইমাম মালিক, পৃ. ১৩৩; সহিহ বুখারি, খণ্ড ১, পৃ. ১৭৮]

এখানে ‘সুন্নত’ শব্দটি ফকিহদের পরিভাষায় মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় আমল অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; এর দ্বারা ফরজ বা অবশ্য পালনীয় বিষয় বোঝানো হয় না।

এর প্রচলন কখন থেকে শুরু হয়েছে?

আল-মুসান্নাফে পুস্তকে বলা হয়েছে, এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে নামাজে এভাবে হাত রাখার প্রথা প্রচলিত হয়। যেখানে আরও দাবি করা হয়েছে যে, তিনি মানুষকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এ পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য করতেন।

এ প্রসঙ্গে আল-মুসান্নাফ গ্রন্থে ইবনে আবি শাইবা তাঁর সনদে হানযালা আস-সুদূসী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:

«سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يَقُولُ: كَانَ يُؤْمَرُ بِالسَّوْطِ فَتُقْطَعُ ثَمَرَتُهُ ثُمَّ يُدَقُّ بَيْنَ حَجَرَيْنِ ثُمَّ يُضْرَبُ بِهِ، فَقُلْتُ: فِي زَمَنِ مَنْ كَانَ هَذَا؟ قَالَ: فِي زَمَنِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ.»

হানযালা আস-সুদূসী বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিককে বলতে শুনেছি: চাবুক আনার নির্দেশ দেওয়া হতো। এরপর তার অগ্রভাগ কেটে ফেলা হতো, তারপর সেটিকে দুটি পাথরের মাঝখানে পিটিয়ে শক্ত করা হতো এবং তা দিয়ে মানুষকে প্রহার করা হতো।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কার শাসনামলে ঘটত?

তিনি বললেন, উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে

[ আল-মুসান্নাফ, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৫০]।

হানাফি আলেম আল-ক্বারী শরহু মুআত্তা মুহাম্মদ ইবনুল হাসান গ্রন্থে «يُؤْمَرُونَ»—তাদের নির্দেশ দেওয়া হতো-এই বাক্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:

«يُؤْمَرُونَ يعني بأمرهم الخلفاء أو الأمراء»

অর্থাৎ, তাদের নির্দেশ দেওয়া হতো-এর অর্থ হলো, খলিফাগণ অথবা শাসকগণ তাদের এ কাজের নির্দেশ দিতেন। [ রিসালাতুত তাকরীব, সংখ্যা ৬২, পৃ. ৫২]।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, আনাস ইবনে মালিক ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবিদের অন্যতম।

একই অর্থের বর্ণনা ইমাম মালিক তাঁর আল-মুআত্তা গ্রন্থে এবং ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ-এ আবু হাজিমের সূত্রে সাহল ইবনে সা‘দ থেকে বর্ণনা করেছেন। সাহল ইবনে সা‘দ বলেন:

«كَانَ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةِ»

তাদের নির্দেশ দেওয়া হতো যে, নামাজের মধ্যে তার ডান হাতটি বাম হাতের বাহুর ওপর রাখে। [আল-মুআত্তা-ইমাম মালিক, পৃ. ১৩৩; সহিহুল বুখারি, খণ্ড ১, পৃ. ১৭৮]

আরও একটি বক্তব্যে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ইবনু রুশদ আল-হানবালির বিদায়াতুল মুজতাহিদ ও নিহায়াতুল মুকতাসিদ গ্রন্থে। তিনি বলেন:

«قَدْ جَاءَتْ آثَارٌ ثَابِتَةٌ نُقِلَتْ صِفَةَ صَلَاتِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، وَلَمْ يُنْقَلْ فِيهَا أَنَّهُ كَانَ يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى.»

রাসূলুল্লাহ (সা.) কীভাবে নামাজ আদায় করতেন-সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বহু বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সেসব বর্ণনার মধ্যে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখতেন। [বিদায়াতুল মুজতাহিদ ও নিহায়াতুল মুকতাসিদ-ইবনে রুশদ আল-হানবালি, খণ্ড ১, পৃ. ১০৭]

ইমাম মালিকের মত সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি নামাজে হাত ছেড়ে রাখার (ইরসাল) পক্ষে ছিলেন। এ বিষয়ে ইমাম নববী বলেন:

«فَإِنَّهُ قَالَ بِالإِرْسَالِ لِلْيَدِ فِي الصَّلَاةِ مُطْلَقًا»

 তিনি নামাজে হাত ছেড়ে রাখার মত পোষণ করতেন।

ইমাম নববী আরও বলেন, ইবনে কাসিম ইমাম মালিকের এ মতটি বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মাগরিবের (উত্তর আফ্রিকার) সকল আলেম অথবা অধিকাংশ আলেম এ মতের ওপর ছিলেন। [আল-মাজমূ‘-ইমাম নববী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩১২]

আল-যুরকানীও ইবনে আবদিল বার-এর বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে কাসিম ইমাম মালিক থেকে নামাজে হাত ছেড়ে রাখার মতটি বর্ণনা করেছেন এবং তাঁদের অধিকাংশ আলেম এই মত গ্রহণ করেছিলেন। [শরহুল মুআত্তা-খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯]

চলবে....

অনুবাদ: হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা গোলাম মুস্তাফা নাজাফী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha