মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর ২০২৬ - ২২:২৬
দক্ষিণ লেবাননে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান স্থায়ী হবে না: হিজবুল্লাহ মহাসচিব

হাওজা নিউজ এজেন্সি— ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেম বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননের মুক্তি এখন “আমাদের চোখের সামনে” এবং ইসরায়েল সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারবে না—এতে যত সময়ই লাগুক।

মঙ্গলবার প্রয়াত হিজবুল্লাহ মহাসচিব শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য একটি ফাউন্ডেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রতিরোধ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে দৃঢ়তার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা এক ধরনের কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, আগ্রাসন যতদিন থাকবে, প্রতিরোধও ততদিন অব্যাহত থাকবে।

শেখ নাঈম কাসেম বলেন, সমাধানের সূচনা হবে “শত্রুর অপমানজনক প্রত্যাহার” দিয়ে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, তারা নিজেদের স্বার্থে অঞ্চলটিতে আগ্রাসন ও অস্থিতিশীলতায় ইসরায়েলকে সর্বাত্মক সমর্থন দিচ্ছে। লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সহযোগিতার জন্য হিজবুল্লাহ প্রস্তুত থাকলেও বিদেশি কোনো পক্ষের নির্দেশ তারা মেনে নেবে না।

তিনি বলেন, যুদ্ধ বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘটিত হলেও শেষ পর্যন্ত বিজয় তাদেরই হয়, যারা ভূমি ও সত্যের পক্ষে থাকে এবং মুজাহিদ ও শহীদদের পথ অনুসরণ করে।

ইরাক ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে
ইরাকের জনগণ, দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসকে (আল-হাশদ আল-শাবি) অভিনন্দন জানিয়ে কাসেম বলেন, তাদের আত্মত্যাগ ও দৃঢ়তার কারণে ইরাক থেকে মার্কিন দখলদারিত্বের অবসান ঘটেছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইরাককে নিয়ন্ত্রণ করতে যে শক্তিই চেষ্টা করুক না কেন, ইরাকি জনগণ তাদের দেশ থেকে দখলদারদের বিতাড়িত করতে সক্ষম এবং ইরাককে স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও শক্তিশালী রাখতে সক্ষম হবে।

ফিলিস্তিনিদের আত্মত্যাগকে “বিশাল” উল্লেখ করে শেখ নাঈম কাসেম বলেন, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের অবিচারও নজিরবিহীন। তবে ফিলিস্তিনি জনগণের মর্যাদা ও আত্মত্যাগের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। গাজা, পশ্চিম তীর ও আল-কুদসসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য তিনি সাফল্য ও মুক্তির প্রার্থনা করেন।

শহীদ নাসরুল্লাহর ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন ফাউন্ডেশন
শেখ নাঈম কাসেম জানান, হিজবুল্লাহর শুরা কাউন্সিলের উদ্যোগে এবং মহাসচিবের তত্ত্বাবধানে শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য নতুন ফাউন্ডেশনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো হাসান নাসরুল্লাহর বক্তব্য, বক্তৃতা, বৈঠক, সংলাপ, নথি ও মৌখিক স্মৃতি সংরক্ষণ করে গবেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তিনি বলেন, হাসান নাসরুল্লাহর কয়েক দশকের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক, শিক্ষামূলক ও প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের বিপুল উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান বই, প্রকাশনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণের জন্যও উন্মুক্ত করা হবে।

শেখ নাঈম কাসেমের দাবি, ১৯৯২ সালে হিজবুল্লাহর মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর নাসরুল্লাহ তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৩১ বছর ধরে প্রতিরোধের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন এবং মুক্তি, মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার একটি আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

শহীদ নাসরুল্লাহর চিন্তার ছয়টি প্রধান ভিত্তি
শেখ নাঈম কাসেম শহীদ হাসান নাসরুল্লাহর রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের ছয়টি প্রধান দিক তুলে ধরেন—

প্রথমত, ইসলাম: তিনি বলেন, নাসরুল্লাহর চিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল ইসলাম ও “প্রামাণিক মুহাম্মাদি ইসলাম”, যা ব্যক্তির নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের পথ নির্দেশ করে।

দ্বিতীয়ত, জিহাদের শিক্ষা: শেখ নাঈম কাসেমের মতে, ভূমি, অধিকার, প্রজন্ম ও মর্যাদা রক্ষায় প্রতিরোধ ও সংগ্রাম অপরিহার্য। নাসরুল্লাহ জিহাদের ধারণাকে কারবালা ও আশুরার আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করে আত্মত্যাগ ও শহীদত্বের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে ইমাম হুসাইন ও হযরত জয়নাবের ভূমিকা তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।

তৃতীয়ত, ‘উইলায়াহ’ বা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য: শেখ নাঈম কাসেম বলেন, শহীদ নাসরুল্লাহর চিন্তায় আল্লাহ, মহানবী, ইমাম আলী ও ইমামদের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি সমকালীন ইসলামী ফকিহের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ইমাম খোমেনি ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর নেতৃত্বের প্রতি নাসরুল্লাহর আনুগত্যকে এই ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

চতুর্থত, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)’র সঙ্গে সম্পর্ক: শহীদ নাসরুল্লাহ সবসময় ইমাম মাহদী (আ.ফা.)’র আবির্ভাব, তাঁর পতাকার অধীনে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের কথা বলতেন বলে শেখ নাঈম কাসেম উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অপেক্ষার যুগ বলতে ইমাম মাহদীর প্রতি আনুগত্য, চূড়ান্ত বিজয় ও বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাসকে বোঝায়।

পঞ্চমত, ইসলামী ঐক্য: সুন্নি-শিয়া ঐক্য, শিয়া সমাজের অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং বৃহত্তর জাতীয় ও মানবিক ঐক্যের ওপর নাসরুল্লাহ জোর দিয়েছেন বলে কাসেম বলেন। তাঁর মতে, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম ও স্বাধীনতাকামী মানুষ নাসরুল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।

লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হাসান নাসরুল্লাহ সহাবস্থান, তাইফ চুক্তি, জাতীয় ঐক্য এবং “সেনাবাহিনী, জনগণ ও প্রতিরোধ”—এই সমন্বিত অবস্থানের পক্ষে ছিলেন বলেও কাসেম উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এর লক্ষ্য ছিল বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে লেবাননের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখা।

ষষ্ঠত, প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ: কাসেম নাসরুল্লাহকে আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান প্রতিরোধী নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, নাসরুল্লাহ প্রতিরোধকে একটি দায়িত্ব ও রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনের মধ্যে যোগাযোগ ও ঐক্য গড়ে তুলতে কাজ করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি ইমাম খোমেনি, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী, ইমাম মুসা আল-সদর, শেখ রাগেব হারব ও সাইয়্যেদ আব্বাস আল-মুসাভির অবদান উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক প্রতিরোধ কাঠামোয় শহীদ ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির “গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা”র কথাও তুলে ধরেন।

শেষে শেখ নাঈম কাসেম বলেন, হাসান নাসরুল্লাহর এই বিশাল ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অধ্যয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha