হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন নাসের রাফিয়ি সূরা আলে ইমরানের ৮৩ থেকে ৮৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এসব আয়াতে মহান আল্লাহ আহলে কিতাবের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, কারণ তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মেনে নেয়নি। অথচ শেষ নবীর আবির্ভাবের আগে তারা নিজেদের আসমানি কিতাবগুলোতে তাঁর আগমনের সুসংবাদ সম্পর্কে জানত।
তিনি বলেন, আল্লাহর নবীরা কখনো তাঁদের পূর্ববর্তী নবীদের অস্বীকার করেননি; বরং তাঁদের সত্যায়ন করেছেন এবং পরবর্তী নবীদের আগমনের সুসংবাদও দিয়েছেন। সুতরাং আকিদার মূলনীতির ক্ষেত্রে সব নবীর রিসালাত একই সত্যের অংশ এবং তাঁদের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই।
এই হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সব নবী-রাসুলের প্রতি ঈমান রাখতেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
«قُلْ آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ عَلَیْنَا وَمَا أُنزِلَ عَلَیٰ إِبْرَاهِیمَ وَإِسْمَاعِیلَ وَإِسْحَاقَ وَیَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِیَ مُوسَیٰ وَعِیسَیٰ وَالنَّبِیُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَیْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ»
অর্থাৎ, মুসলমানরা নবীদের মূল রিসালাত ও হেদায়াতের ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।
তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থী যেমন শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে একই বিষয়কে ভিন্ন ও আরও পূর্ণাঙ্গ স্তরে শেখে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক তাকে এ কথা বলেন না যে প্রাথমিক পর্যায়ে তুমি যা শিখেছ তা ভুল ছিল। একইভাবে আল্লাহর নবীরাও একে অপরকে অস্বীকার করেন না। বরং প্রত্যেক নবী তাঁর সময় ও সমাজের উপযোগী করে আল্লাহর হেদায়াতের একটি পর্যায় মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
রাফিয়ি ইসলাম ধর্মের পূর্ণাঙ্গতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
«الْیَوْمَ أَکْمَلْتُ لَکُمْ دِینَکُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَیْکُمْ نِعْمَتِی وَرَضِیتُ لَکُمُ الْإِسْلَامَ دِینًا»
অর্থাৎ, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’
তিনি বলেন, এই আয়াতের ভিত্তিতে ইসলাম হলো আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত দ্বীন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে হেদায়াত করার জন্য এসেছে।
তিনি সূরা আলে ইমরানের ৮৫ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন:
«وَمَن یَبْتَغِ غَیْرَ الْإِسْلَامِ دِینًا فَلَن یُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِی الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِینَ»
অর্থাৎ, আল্লাহর চূড়ান্ত দ্বীন আসার পর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মকে গ্রহণ করবে, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
পবিত্র মাজারে বক্তৃতাদানকারী এই আলেম বলেন, এর অর্থ এই নয় যে অমুসলিমের কোনো ভালো কাজই গ্রহণ করা হবে না। কোনো অমুসলিম ব্যক্তি হাসপাতাল নির্মাণ করতে পারেন, কোনো আবিষ্কার করতে পারেন কিংবা সমাজের জন্য কোনো কল্যাণকর সেবা দিতে পারেন। আল্লাহ তার ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই অথবা অন্য কোনো উপায়ে দিতে পারেন। তবে কুরআনের আয়াত অনুযায়ী, কোনো আমল চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং তার পরকালীন পুরস্কার লাভের জন্য আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ও তাঁর প্রেরিত দ্বীন গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আকিদা সুদৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তা
হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আকিদা সুদৃঢ় করার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘ইতিকাদ’ শব্দটি ‘আকদ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে কোনো বিশ্বাসের দৃঢ়ভাবে গেঁথে যাওয়া। এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত্রুরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে নানা সংশয় সৃষ্টি এবং তরুণদের ধর্মীয় বিশ্বাস দুর্বল করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, তরুণসহ সর্বসাধারণকে নিজেদের বিশ্বাস সুদৃঢ় করার জন্য পড়াশোনা, গবেষণা ও চিন্তাভাবনায় মনোযোগী হতে হবে এবং কোনো সংশয়কে উত্তরহীন অবস্থায় মনে স্থান দেওয়া উচিত নয়।
জ্ঞান অর্জনের পাঁচটি মাধ্যম
রাফিয়ি জ্ঞান অর্জনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমের কথা উল্লেখ করে বলেন:
প্রথম মাধ্যম-ইন্দ্রিয়:
মানুষ তার পাঁচ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। পবিত্র কুরআনও বহুবার মানুষকে সৃষ্টিজগত পর্যবেক্ষণ ও তা নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:
«أَفَلَا یَنظُرُونَ إِلَی الْإِبِلِ کَیْفَ خُلِقَتْ»
‘তারা কি উটের দিকে তাকায় না-কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে?’
দ্বিতীয় মাধ্যম-বুদ্ধি:
ইন্দ্রিয় তখনই মানুষকে জ্ঞানের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, যখন তার সঙ্গে বুদ্ধি কাজ করে। মানুষ যা দেখে, তা থেকে সিদ্ধান্ত ও যুক্তি গ্রহণ করে। এ কারণেই পবিত্র কুরআন বারবার মানুষকে চিন্তা ও বুদ্ধি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে।
তৃতীয় মাধ্যম-হৃদয়:
তিনি বলেন, বুদ্ধি হলো চিন্তা ও মননের কেন্দ্র, আর হৃদয় মানুষের অনুভূতি ও আবেগের স্থান। পবিত্র কুরআন মানুষের হৃদয় সম্পর্কে আলোচনা করেছে এবং হৃদয়ের কঠোরতা ও তার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
চতুর্থ মাধ্যম-ওহি:
রাফিয়ি বলেন, মানুষ ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও হৃদয়ের মাধ্যমে কিছু সত্য উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু সত্যকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানা এবং সৌভাগ্যের পথে চলার জন্য তার আল্লাহর হেদায়াত প্রয়োজন। এ কারণেই মহান আল্লাহ মানুষকে পথ দেখানোর জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন।
তিনি বলেন, নবী-রাসুলরা মানুষের বুদ্ধিকে জাগ্রত করতে এবং মানুষ যে সত্যগুলো থেকে গাফেল হয়ে থাকতে পারে, সেগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে এসেছেন। এ কারণেই বিভিন্ন বর্ণনায় নবীদের জাগরণকারী ও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে।
পঞ্চম মাধ্যম-ইমাম ও ঐশী নেতা:
পবিত্র মাজারের এই বক্তা বলেন, মহান আল্লাহ মানুষের হেদায়াতের জন্য ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, হৃদয় ও ওহির পাশাপাশি ইমাম ও ঐশী নেতার ব্যবস্থাও রেখেছেন, যাতে হেদায়াতের পথ এবং দ্বীনি জ্ঞানের সঠিক ব্যাখ্যা সমাজের সামনে সুস্পষ্ট থাকে।
তিনি আরও বলেন, মানুষ বিভিন্ন উপায়ে আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে পারে। কোনো বিজ্ঞানী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা ও জীবজগত নিয়ে গবেষণা করে আল্লাহর অস্তিত্বে পৌঁছাতে পারেন, আবার অন্য কোনো বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের বিশাল গ্যালাক্সি ও সৃষ্টির সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আল্লাহকে চিনতে পারেন। এমনকি একজন সাধারণ মানুষও তার চারপাশের জগত ও দৈনন্দিন জীবনের শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ করে একজন প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ যেন জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করে।
শেষে তিনি সমাজের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আকিদাগত ভিত্তি সুদৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মানুষ যদি ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, হৃদয়, ওহি এবং ঐশী নেতার হেদায়াতকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে সত্যের সন্ধান লাভ করে, তাহলে সে আর মূর্তি ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের সামনে মাথা নত করবে না; বরং তাওহিদ ও আল্লাহর ইবাদতের পথ বেছে নেবে।
আপনার কমেন্ট