হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সুলহ-মির্জাই, যিনি নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের (মজলিসে খোব্রেগানে রাহবারি) সদস্য, বুধবার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘আফতাবে শার্কি’-তে ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, বিপ্লবের ধারায় গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক উপাদান এমন এক শক্তি সৃষ্টি করেছে, যার ওপর নির্ভর করে ইরানি জনগণ আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর সুসংগঠিত জোটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর ব্যাপক অর্থনৈতিক, সামরিক, গণমাধ্যম ও শিল্প-সাংস্কৃতিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই জোট বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়া, বিভিন্ন দেশের সম্পদ ব্যবহার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ এবং ব্যাপকভাবে গণমাধ্যম ও শিল্পের ব্যবহার করে নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি তৈরি এবং বিশ্বের সামনে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম সুলহ-মির্জাই আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে আধ্যাত্মিক শক্তি সমীকরণ পরিবর্তন করতে এবং বস্তুগত শক্তির দৃশ্যমান প্রভাব ও আধিপত্য ভেঙে দিতে পারে। এই আধ্যাত্মিক শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান। ইসলামী বিপ্লবের সময় জনগণের মধ্যে যে ঈমান সৃষ্টি হয়েছিল, তা বিপ্লবের বিজয় থেকে শুরু করে পবিত্র প্রতিরক্ষাযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে প্রকাশ পেয়েছে।
ঈমান-শত্রুর মোকাবিলায় শক্তি সৃষ্টির অন্যতম কারণ
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে ঈমানের ভূমিকার ওপর ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর গুরুত্বারোপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) তাঁর ওসিয়তনামা ও বিভিন্ন বক্তৃতায় বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর ক্ষমতা ও প্রভুত্বের ওপর বিশ্বাস বিপ্লবের সৃষ্টি ও বিজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই সদস্য বলেন, মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সমগ্র বিশ্বের মালিক ও পরিচালনাকারী এবং তাঁর ইচ্ছার বাইরে কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই, তখন এই বিশ্বাস বাস্তব জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে একটি কার্যকর শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে ‘আল্লাহু আকবার’-এর ভূমিকা সম্পর্কে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন এক সময়ে যখন পাহলভি শাসকগোষ্ঠীর হাতে সেনাবাহিনী, বিদেশি সামরিক উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন শক্তির সমর্থন ছিল, তখন জনগণ ঈমানের ওপর নির্ভর করে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। এর মাধ্যমে এমন সব সমীকরণ পরিবর্তিত হয়েছিল, যা বস্তুগত হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে পরিবর্তন করা কঠিন বলে মনে করা হতো।
হুজ্জাতুল ইসলাম সুলহ-মির্জাই বলেন, পবিত্র প্রতিরক্ষাযুদ্ধের সময়ও এই ঈমানের প্রকাশ ঘটেছিল। বিপ্লবের পরবর্তী পর্যায়গুলোতেও দেশ পুনর্গঠন, প্রতিরক্ষা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে এর ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও জনগণ তাদের ঈমান ও দৃঢ়তার মাধ্যমে দেখিয়েছে যে, ঈমান এখনো ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
আল্লাহর প্রতি ঈমানের ফল হলো দৃঢ়তা
নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই সদস্য পবিত্র কোরআনের আয়াত- «إِنَّ الَّذینَ قالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَیْهِمُ الْمَلائِکَةُ»-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, কোরআন তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদা নির্ধারণ করেছে, যারা আল্লাহকে নিজেদের প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণ করে এবং এই বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকে। কোরআনে তাদের ওপর ফেরেশতাদের অবতরণ এবং তাদের সুসংবাদের কথাও বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঈমান তখনই কার্যকর হয়, যখন এর সঙ্গে দৃঢ়তা যুক্ত হয়। অর্থাৎ মানুষ আল্লাহকে চেনার পর নিজের পথে অবিচল থাকবে এবং কঠিন পরিস্থিতি ও বাধার মুখে পিছু হটবে না।
হুজ্জাতুল ইসলাম সুলহ-মির্জাই আরও বলেন, পবিত্র প্রতিরক্ষাযুদ্ধ এবং বিভিন্ন জিহাদ ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সময়ও এই ঈমান ও দৃঢ়তার কারণে মুমিনরা সীমিত বস্তুগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রচলিত হিসাব-নিকাশের চেয়ে বহুগুণ বেশি সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।
ঐক্য-ইরানি জনগণের শক্তির আরেকটি উপাদান
তিনি আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বিতীয় উপাদান হিসেবে ঐক্য ও সংহতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম বড় নিয়ামত ছিল-বিভিন্ন চিন্তাধারা, জাতিগোষ্ঠী ও সামাজিক পটভূমির মানুষ একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য একত্রিত হয়েছিল।
হুজ্জাতুল ইসলাম সুলহ-মির্জাই বলেন, ইসলামী বিপ্লবের বিজয়, পবিত্র প্রতিরক্ষাযুদ্ধ, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও ‘সমন্বিত যুদ্ধ’ মোকাবিলা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা ও সংকটের সময় জনগণ তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং দেশকে রক্ষা করেছে।
এই অর্জন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ঐক্য ও সংহতিকে একটি জাতীয় নিয়ামত ও সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে যাদের বক্তব্য দেওয়ার মঞ্চ, কলম, মিম্বর ও গণমাধ্যম রয়েছে-ঐক্য সংরক্ষণে তাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে।
নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই সদস্য বলেন, আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক কারণ দেখিয়েও সমাজে বিভেদ ও মতপার্থক্য উসকে দেওয়া উচিত নয়। কারণ কঠিন পরিস্থিতিতে ঐক্য ধরে রাখাও ইরানি জনগণের শক্তির একটি অংশ।
আল্লাহর জন্য আন্দোলন-আধ্যাত্মিক শক্তির তৃতীয় উপাদান
পবিত্র কোরআনের আয়াত-«قُلْ إِنَّمَا أَعِظُکُم بِوَاحِدَةٍ أَن تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَیٰ وَفُرَادَیٰ»-এর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক শক্তি গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘কিয়ামুল্লাহ’-অর্থাৎ আল্লাহর জন্য দাঁড়ানো এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা।
ইমাম খোমেনি (রহ.) এবং শহীদ নেতা ‘আল্লাহর জন্য আন্দোলন’-এর ধারণার ওপর যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা উল্লেখ করে হুজ্জাতুল ইসলাম সুলহ-মির্জাই বলেন, মানুষ যখন আল্লাহর জন্য কোনো কাজে এগিয়ে যায়, তখন সেই পদক্ষেপই ধারাবাহিকভাবে বড় বড় ঘটনা ও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন যে, লাখ লাখ মানুষের ইচ্ছাশক্তি যখন আল্লাহর উদ্দেশ্যে একই লক্ষ্যে একত্রিত হয়, তখন তারা বড় ধরনের পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহর জন্য আন্দোলন বলতে কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়াকে বোঝায় না। কখনো এটি দোয়া ও ফরিয়াদের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, কখনো সামরিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে, কখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এবং কখনো অন্যদের সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই সদস্য আরও বলেন, যখন সমাজে এই মানসিকতা শক্তিশালী হয় এবং মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তখন এমন একটি শক্তি গড়ে ওঠে, যা বস্তুগত সক্ষমতার কিছু ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা পূরণ করতে পারে।
বস্তুগত সক্ষমতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক শক্তি
হুজ্জাতুল ইসলাম সুলহ-মির্জাই বলেন, আধ্যাত্মিক শক্তি বস্তুগত সক্ষমতার বিকল্প নয়। একটি জাতির বৃহৎ শক্তির মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তাগত সক্ষমতাও প্রয়োজন। তবে এই বস্তুগত সক্ষমতাগুলোকে যে শক্তি সঠিক দিকনির্দেশনা দেয় এবং বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর শক্তিতে পরিণত করে, তা হলো ঈমান, সংহতি ও আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রেরণা।
তিনি বলেন, বর্তমানে ইরানি জনগণের সামনে এমন একটি জোট রয়েছে, যারা ব্যাপক অর্থনৈতিক, সামরিক, গণমাধ্যম ও শিল্প-সাংস্কৃতিক শক্তির অধিকারী। তবে ইসলামী বিপ্লবের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, কেবল বস্তুগত মানদণ্ড দিয়ে কোনো জাতির শক্তি পরিমাপ করা যায় না।
নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই সদস্য বলেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান, দৃঢ়তা, ঐক্য এবং আল্লাহর জন্য আন্দোলন-ইসলামী বিপ্লবের আধ্যাত্মিক সম্পদ। এসব উপাদানের ধারাবাহিকতা ইরানি জনগণের জন্য বিভিন্ন সমস্যা ও চাপের মোকাবিলায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর সক্ষমতা এবং সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আপনার কমেন্ট