হাওজা নিউজ এজেন্সি’র তথ্য মতে, ইরানের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রধান মোহসেন হাজি মিরজায়ীর সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ঐক্য ও সংহতিই বিজয়ের প্রথম পদক্ষেপ
বৈঠকে পবিত্র কোরআনের ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না’—আয়াতটি উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—আল্লাহ কেন ‘কোরআনকে আঁকড়ে ধরো’ না বলে ‘আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো’ বলেছেন?
তিনি বলেন, এর তাৎপর্য হতে পারে, বিচ্ছিন্ন হয়ে শৃঙ্খলা হারানো কোনো জনগোষ্ঠীর অবস্থা কূপে পড়ে যাওয়া মানুষের মতো। তাকে উদ্ধার করতে যেমন দড়ি এগিয়ে দেওয়া হয়, তেমনি সংকট থেকে উত্তরণের জন্যও ঐক্য ও সংহতি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ইনশা আল্লাহ এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, তাহলে প্রথমেই প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও সংহতি। বিজয়ের প্রথম পদক্ষেপ হলো—আমাদের কণ্ঠস্বর এক হওয়া এবং একটি অভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরা।’
প্রেসিডেন্টকে পাহাড়ের মতো অটল থাকার আহ্বান
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, তিনি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত পুরুষ সেই, যে সময়ের ঘাত-প্রতিঘাতে জাঁতার নিচের পাথরের মতো অবিচল থাকে।’ কঠিন পরিস্থিতি ও সংকটেই মানুষ তার দৃঢ়তা ও সাহসের পরিচয় দেয়। জাঁতার নিচের পাথরের মতো তাকে নিজের অবস্থানে অবিচল থাকতে হয়।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টকে পাহাড়ের মতো অটল থাকতে হবে, আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। ইনশা আল্লাহ, আল্লাহ তাঁকে সহায়তা করবেন।’
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, এই উপমা ও পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, প্রেসিডেন্ট যেন কোনো পরাজয়, হতাশা কিংবা দুঃখকে মনে জায়গা না দেন। মহান আল্লাহ তাঁকে সহায়তা করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি বন্ধের আহ্বান
অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, গণমাধ্যমে এ সংকট নিয়ে আলোচনা হলেও কিছু ব্যক্তি এখনো নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। এতে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের বিষয়টি বাস্তবে অনুভব করতে চাই, তাহলে সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) তাঁর শিক্ষায় শুধু উচ্চবিত্ত নয়, বরং সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতিও মনোযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করেছে, তা মেনে চলতে হবে এবং এর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। এটিও ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।
আলোচনার বিষয়ে ইসলাম কী বলে?
আলোচনা প্রসঙ্গে আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, কখনো কখনো দেখা যায়, কিছু বন্ধু আলোচনাকে পছন্দ করেন না। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে, এ বিষয়ে ইসলাম কী বলে।
এ প্রসঙ্গে ইরানের সংবিধান প্রণয়নের সময়কার একটি স্মৃতিচারণ করেন তিনি। আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, সংবিধান প্রণয়নের জন্য তাঁরা তেহরানে গিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই সংবিধান প্রণয়ন পরিষদের প্রথম সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আয়াতুল্লাহ বেহেশতি, আয়াতুল্লাহ মুন্তাজেরি, আয়াতুল্লাহ মাকারেমসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইমাম খোমেনিকে বলেছিলেন, ‘আপনি আমাদের সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছেন, অথচ আমরা আগে কখনো সংবিধান লিখিনি।’ জবাবে ইমাম খোমেনি বলেছিলেন, ‘ইসলাম যা বলে, আপনারা তা-ই লিখুন।’
আলোচনার ফলাফল দেখতে হবে
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ‘বাস্তবেই আমাদের দেখতে হবে, ইসলাম আমাদের আলোচনার দিকে আহ্বান জানায়, নাকি সংঘাতের দিকে।’
তিনি বলেন, ইসলামে শত্রুর মোকাবিলায় শক্তি ও সামর্থ্য অর্জনের নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তাদের মোকাবিলায় যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখো, যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে ভীতসন্ত্রস্ত করতে পারবে।’ একই সঙ্গে কোরআনে শান্তির প্রস্তাব গ্রহণের নির্দেশও রয়েছে: ‘আর তারা যদি শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও তার দিকে ঝুঁকে পড়ো এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’
তিনি বলেন, ‘আলোচনা নিজেই কোনো সমস্যা নয়; দেখতে হবে আলোচনার ফল কী হয়। আলোচনার মাধ্যমে যদি আমরা আমাদের মৌলিক নীতি, স্বাধীনতা ও জনগণের দাবি নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে তা হবে উত্তম। আর তা সম্ভব না হলে অন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
শক্তিশালী প্রতিরক্ষার পাশাপাশি আলোচনাও চালাতে হবে
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ‘আমাদের সবার উচিত আলোচনার প্রতি সমর্থন জানানো। তবে আলোচনার ফলাফলের বিষয়েও আমাদের অবস্থান রাখতে হবে এবং দেখতে হবে, শেষ পর্যন্ত কী ফল আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, ইনশা আল্লাহ সমাধানের পথ হলো—আমরা যেমন শক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলব, তেমনি শক্তিশালী প্রতিরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখব এবং আলোচনাতেও অংশ নেব। বিষয়টি নির্ভর করবে প্রতিপক্ষ কীভাবে আচরণ করে, তার ওপর।’
অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শের আহ্বান
নিজের বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, গত ৪০ বছরে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনকেও আমন্ত্রণ জানিয়ে পরামর্শ নেওয়া উচিত। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, তাঁদেরও ইরানি ও ইসলামী চিন্তাধারা রয়েছে এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব। তাঁদের পুরোপুরি দৃশ্যপটের বাইরে রাখা সমীচীন নয়।’
বৈঠকের শুরুতে প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রধান মোহসেন হাজি মিরজায়ী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ও বৃহৎ পরিসরের বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে আয়াতুল্লাহ সুবহানিকে অবহিত করেন।
আপনার কমেন্ট