বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর ২০২৬ - ১৪:২৪
ইয়েমেনের কাছে সৌদি আরবের লজ্জাজনক গোয়েন্দা ব্যর্থতার নেপথ্যে

ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অস্থির পরিস্থিতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এক দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও দেশটির ভয়াবহ গোয়েন্দা ব্যর্থতা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের আগ্রাসন ও অবরোধের জবাবে ইয়েমেনিরা এখনো সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংঘাতের এই পর্যায়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইয়েমেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন করতে সৌদি আরবের স্পষ্ট ব্যর্থতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা বুঝতে রিয়াদের অক্ষমতা।

এক দশকের অভিজ্ঞতার পরও ইয়েমেনের কাছে সৌদি আরবের চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সংবাদপত্র আল-আখবার-কে জানিয়েছে, ২০১৫ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব যেসব ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, তার মধ্যে ইয়েমেনে গোয়েন্দা ব্যর্থতা অন্যতম প্রধান।

এই ব্যর্থতা কেবল কৌশলগত ও যুদ্ধক্ষেত্রের ভুল কিংবা ইয়েমেনিদের পরিকল্পিত ফাঁদে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেনে বিমান হামলা চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রও বারবার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আগ্রাসী জোটের ইয়েমেনবিরোধী যুদ্ধের এক দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও রিয়াদ নিজেদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইয়েমেনের জটিল পরিস্থিতি, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তন এবং প্রকৃত শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও তারা গড়ে তুলতে পারেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের গোয়েন্দা ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো সৌদি নেতৃত্বের অহংকার ও আত্মম্ভরিতা। তারা ইয়েমেনিদের এবং তাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে অবমূল্যায়ন করেছিল।

তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে বলা যায় না যে ইয়েমেনের অভিযান শুরুর সময় সৌদি আরব সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। কারণ, এসব অভিযানের কয়েক সপ্তাহ আগেই সানার নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তারা জানিয়েছিল, ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়নে অব্যাহত অস্বীকৃতি জানানো হলে ইয়েমেন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ বেছে নেবে।

ইয়েমেনের সামরিক প্রস্তুতি বুঝতেও ব্যর্থ সৌদি আরব

সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও ইয়েমেনিরা কয়েক মাস আগে থেকেই সেনা নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের কার্যক্রম শুরু করেছিল। একই সঙ্গে দেশজুড়ে বিভিন্ন সামরিক মহড়া চালানো হয়েছিল, যেখানে বর্তমান যুদ্ধে ব্যবহৃত কৌশলগুলোর অনুশীলন করা হয়।

মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সানার বাহিনী পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলগুলো মুক্ত করার এক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের ভাড়াটে যোদ্ধারা তাদের হুমকির মুখে ফেলা সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে সৌদি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিল। তারা জানিয়েছিল, ইয়েমেনি বাহিনী বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাড়াটে যোদ্ধারা সানার বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য সৌদি আরবের কাছে বিমান সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও চেয়েছিল। এদিকে মার্কিন কর্মকর্তারাও সৌদি কর্তৃপক্ষকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও সৌদি আরব চরম ব্যর্থতার মুখে পড়ে।

সৌদি আরবের গোয়েন্দা ব্যর্থতা কেবল সানার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপ্তি মূল্যায়নে অক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইয়েমেনের সামরিক শিল্পের পরিমাণগত ও গুণগত উন্নয়ন উপলব্ধি করতেও দেশটি ব্যর্থ হয়েছে।

এ ছাড়া সৌদি আরব দক্ষিণ ইয়েমেনে ‘জায়ান্টস ব্রিগেড’-এর মতো সালাফি ভাড়াটে যোদ্ধাদের নিজেদের পক্ষে নিয়োগ করতে এবং বিশেষ করে ‘হোমল্যান্ড শিল্ড’ নামে পরিচিত যোদ্ধাদের নিয়ে অন্যান্য গোষ্ঠী গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত ভাড়াটে বাহিনী গড়ে তুলতে পারেনি। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সৌদি আরব ও মার্কিন সমর্থনের মরীচিকা

সৌদি আরবের কৌশলগত দুর্বলতার সবচেয়ে বড় দিক হলো, বারবার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মার্কিন সহায়তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সুরক্ষার ওপর নিরন্তর নির্ভর করে চলেছে।

সৌদি আরবের পূর্বানুমান করা উচিত ছিল যে, ভুল হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অপরিকল্পিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর, যার পরিণতি সমগ্র অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য ছিল সুদূরপ্রসারী, যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি বিপজ্জনক যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইবে না। ইউরোপীয় দেশগুলোরও এ ধরনের সংঘাতে জড়ানোর কোনো আগ্রহ ছিল না।

তা সত্ত্বেও সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে যাওয়ার ব্যাপারে অনড় থেকেছে। এখনো তারা এই একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল সৌদি আরব এখন এমন একটি যুদ্ধের পরিণতি মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছে, যে যুদ্ধ তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন নতুন করে কোনো ব্যাপক সামরিক সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না-বিশেষ করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।

এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সহায়তার অনুরোধ দুইবার প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

সৌদি আরবের সামনে দুটি কঠিন বিকল্প

ওয়াশিংটন পোস্ট উপসংহারে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব নিজেকে দুটি কঠিন বিকল্পের মধ্যে দেখতে পাচ্ছে।

  • সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি: এর ফলে ইয়েমেনিদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ও অমীমাংসিত সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট তৈরি হতে পারে।
  • উত্তেজনা প্রশমন: এই পদক্ষেপকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে, যা ইয়েমেনকে আরও হামলা চালাতে উৎসাহিত করতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি জোর দিয়ে বলেছে, একই সঙ্গে এই আশঙ্কাও বাড়ছে যে, বর্তমান সংকট আঞ্চলিক জোটগুলোর কাঠামো বদলে দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-গ্যারান্টির ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha