হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম পর্ব:
হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর জীবন ও ফজিলতের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর জীবন ও ফজিলত সম্পর্কে কলম ধরা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। তাঁর মহিমান্বিত জীবন ও অসাধারণ গুণাবলি যথাযথভাবে তুলে ধরা লেখকদের সাধ্যের বাইরে। তিনি ছিলেন এমন এক সূর্য, যাঁর আবির্ভাব আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) এবং সিদ্দিকা শহিদা হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর আলোকোজ্জ্বল জীবনে নতুন উষ্ণতা ও প্রাণসঞ্চার করেছিল। তাঁর আগমনে হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর ঘর আরও একটি নূরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল।
এই পবিত্র পরিবারের তৃতীয় সন্তানটির নাম রাখা হয়েছিল ‘জয়নাব’। নিঃসন্দেহে, তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা, বিশুদ্ধ ভাষণশৈলী, জ্ঞান, তাকওয়া ও অতুলনীয় ধৈর্যের মাধ্যমে তিনি তাঁর পিতার জন্য গৌরব ও সৌন্দর্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।
নিম্নে তাঁর কয়েকটি ফজিলত ও উন্নত নৈতিক গুণাবলি তুলে ধরা হলো।
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জন্ম
পঞ্চম হিজরির ৫ জমাদিউল আউয়াল তারিখে পবিত্র ও নূরানি ব্যক্তিত্ব হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁর সম্মানিত পিতা ছিলেন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) এবং তাঁর মাতা ছিলেন উভয় জাহানের মহীয়সী নারী হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)।
হযরত জয়নাব (সা.)-এর জন্মের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর গৃহে আগমন করেন। নবজাতককে দেখার পর মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তাঁর এই অবস্থা দেখে হযরত ফাতিমা (সা.আ.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সম্মানিত পিতাকে জিজ্ঞাসা করেন:
«ما يبكيك يا أبتي؟ لا أبكى الله لك عيناً.»
আব্বাজান! কী হয়েছে আপনার? আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ যেন কখনো আপনার চোখে অশ্রু না আনেন।
তখন মহানবী (সা.) বিষণ্ন কণ্ঠে উত্তর দেন:
«يا فاطمة، اعلمي أنّ هذه البنت بعدي وبعدك سوف تنصبّ عليها المصائب والرزايا.»
হে ফাতিমা! জেনে রেখো, আমার ও তোমার ইন্তেকালের পর এই কন্যার ওপর একের পর এক বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্ট নেমে আসবে।
(আল-কুরাইশি, বাকির শরিফ, আস-সাইয়্যিদা জয়নাব রাইদাতুল জিহাদ ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৪১; প্রকাশক: লেখক নিজেই; প্রথম সংস্করণ, ১৪২০ হিজরি/২০০০ খ্রিষ্টাব্দ)
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জন্মের পর মহানবী (সা.)-এর কান্না
মরহুম সাইয়্যিদ নূরুদ্দিন জাযায়েরি ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:
روي أن زينب بنت علي بن أبي طالب (عليهما الصلاة والسلام) لما ولدت أخبر بذلك رسول الله (صلى الله عليه وآله وسلم) فجاء إلى منزل فاطمة (عليها السلام) وقال: يا بنتاه! إيتيني بنيّتك المولودة، فلما أحضرتها أخذها رسول الله (صلى الله عليه وآله وسلم) وضمها إلى صدره الشريف، ووضع خده المنيف على خدها فبكى بكاءً عاليا، وسال الدمع حتى جرى على كريمته الشريفة.
فقالت فاطمة (عليها السلام): مم بكاءك، لا أبكى الله عينيك يا أبتاه؟
فقال(صلى الله عليه وآله وسلم): يا بنية يا فاطمة! اعلمي أن هذه البنت بعدك وبعدي تبتلى ببلايا فادحة، وترد عليها مصائب ورزايا مفجعة.
فبكت فاطمة (سلام الله عليها) عند ذلك، ثم قالت: يا أبه! فما ثواب من يبكي عليها وعلى مصائبها؟
فقال (صلى الله عليه وآله وسلم): يا بضعتي ويا قرة عيني إن من بكى عليها وعلى مصائبها كان ثواب بكائه كثواب من بكى على أخويها، ثم اختار لها اسم: (زينب).
বর্ণিত হয়েছে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জন্ম হলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এ সংবাদ জানানো হয়। তিনি তখন হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর গৃহে আগমন করেন এবং বলেন, হে আমার কন্যা! তোমার সদ্যোজাত কন্যাটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
শিশুটিকে তাঁর কাছে আনা হলে মহানবী (সা.) তাকে কোলে তুলে নিজের পবিত্র বক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেন। এরপর নিজের পবিত্র গাল শিশুটির গালের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। এ সময় তিনি উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন এবং তাঁর চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ে পবিত্র মুখমণ্ডল ভিজিয়ে দেয়।
হযরত ফাতিমা (সা.আ.) জিজ্ঞাসা করেন: আপনি কাঁদছেন কেন? আব্বাজান! আল্লাহ যেন কখনো আপনার চোখে অশ্রু না আনেন!
মহানবী (সা.) উত্তর দেন: হে আমার প্রিয় কন্যা ফাতিমা! জেনে রেখো, তোমার ও আমার ইন্তেকালের পর এই কন্যাকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। তার ওপর নেমে আসবে ভয়াবহ বিপদ, দুঃখজনক ঘটনা ও হৃদয়বিদারক মুসিবত।
এ কথা শুনে হযরত ফাতিমা (সা.আ.) কেঁদে ফেলেন। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করেন: হে আব্বাজান! যে ব্যক্তি তাঁর জন্য এবং তাঁর ওপর নেমে আসা মুসিবতগুলোর জন্য কাঁদবে, তার প্রতিদান কী হবে?
মহানবী (সা.) বলেন: হে আমার প্রাণের টুকরা, হে আমার চোখের প্রশান্তি! যে ব্যক্তি তাঁর জন্য এবং তাঁর ওপর নেমে আসা মুসিবতগুলোর জন্য কাঁদবে, তার কান্নার প্রতিদান হবে তাঁর দুই ভাইয়ের জন্য কাঁদার প্রতিদানের সমতুল্য।
এরপর মহানবী (সা.) তাঁর নাম রাখেন ‘জয়নাব’।
(আল-জাযায়েরি, সাইয়্যিদ নূরুদ্দিন, আল-খাসায়িসুয জয়নাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩২; প্রকাশক: দারুল হাওরা; প্রথম সংস্করণ, ১৪২৫ হিজরি/২০০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
বর্ণিত হয়েছে, হযরত আলী (আ.)-এর কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.) জন্মগ্রহণ করলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এ সংবাদ জানানো হয়। তখন তিনি হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর গৃহে আগমন করেন এবং বলেন, হে আমার কন্যা! তোমার সদ্যোজাত কন্যাটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
শিশুটিকে তাঁর কাছে আনা হলে মহানবী (সা.) তাকে কোলে তুলে নিজের পবিত্র বক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেন। এরপর নিজের পবিত্র গাল শিশুটির কোমল মুখমণ্ডলে রাখেন এবং গভীরভাবে কাঁদতে থাকেন। তাঁর কান্না এতটাই প্রবল ছিল যে, চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ে শিশুটির গায়ে।
হযরত ফাতিমা (সা.আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আব্বাজান! আল্লাহ যেন কখনো আপনার চোখে অশ্রু না আনেন।
মহানবী (সা.) বললেন, হে আমার কন্যা! জেনে রেখো, আমার ও তোমার ইন্তেকালের পর সে কঠিন বিপদ-আপদের সম্মুখীন হবে। তার ওপর নেমে আসবে অসংখ্য দুঃখ-কষ্ট ও হৃদয়বিদারক মুসিবত।
এ কথা শুনে হযরত ফাতিমা (সা.আ.) কেঁদে ফেললেন। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আব্বাজান! যে ব্যক্তি তাঁর জন্য এবং তাঁর ওপর নেমে আসা মুসিবতগুলোর জন্য কাঁদবে, তার প্রতিদান কী হবে?
মহানবী (সা.) উত্তর দিলেন, হে আমার প্রাণের টুকরা, হে আমার চোখের প্রশান্তি! যে ব্যক্তি তাঁর জন্য এবং তাঁর ওপর নেমে আসা মুসিবতগুলোর জন্য কাঁদবে, তার প্রতিদান হবে তাঁর দুই ভাই-ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য কাঁদার প্রতিদানের সমতুল্য।
এরপর মহানবী (সা.) সেই কন্যার নাম রাখলেন জয়নাব।
কয়েকজন ঐতিহাসিক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত জয়নাব (সা.আ.)-কে হযরত খাদিজা কুবরা (সা.আ.)-এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করতেন।
(আল-জাযায়েরি, সাইয়্যিদ নূরুদ্দিন, আল-খাসায়িসুয জয়নাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৪৪–৪৫; প্রকাশক: দারুল হাওরা; প্রথম সংস্করণ, ১৪২৫ হিজরি/২০০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জন্ম সম্পর্কে একজন মিসরীয় লেখিকার বক্তব্য
মিসরীয় নারী লেখক ড. আয়েশা বিনতে শাতি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:
إنها الزهراء بنت النبي، توشك أن تضع في بيت النبوة مولوداً جديداً، بعد أن أقرت عيني الرسول بسبطيه الحبيبين: الحسن والحسين، وثالث لم يقدر الله له أن يعيش، هو المحسن بن علي... .
তিনি হলেন নবী (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা যাহরা। নবুওয়তের পবিত্র গৃহে তিনি শিগগিরই আরেকটি সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। এর আগে তাঁর দুই প্রিয় নাতি-হাসান ও হুসাইন-জন্মগ্রহণ করে মহানবী (সা.)-এর চোখ জুড়িয়েছিল। আর তৃতীয় একজনও ছিলেন, যাঁর বেঁচে থাকা আল্লাহর তাকদিরে নির্ধারিত হয়নি; তিনি হলেন আলী ইবনে আবি তালিবের পুত্র মুহসিন।
(আয়েশা আব্দুর রহমান বিনতে শাতি, আস-সাইয়্যিদা জয়নাব আকীলাতু বনি হাশিম (রাদিয়াল্লাহু আনহা), প্রকাশক: দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, লেবানন; ১৪০৬ হিজরি/১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)
হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য
হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে-লজ্জাশীলতা ও সতীত্ব, প্রজ্ঞা ও পূর্ণতা, জ্ঞানগত মর্যাদা, নিজ যুগের ইমামের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব, হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা, অসাধারণ ধৈর্য, অতুলনীয় ইবাদত, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা, সাহসিকতা, মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে তাঁর মর্যাদা এবং হযরত আবা আব্দিল্লাহ আল-হুসাইন (আ.)-এর ওপর নেমে আসা মুসিবতগুলোর বর্ণনাকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা। নিম্নে এসব বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি আলোচনা করা হলো।
১. হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর লজ্জাশীলতা ও সতীত্ব
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর লজ্জাশীলতা ও সতীত্বের অবস্থা এমন ছিল যে, তিনি যখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র কবর জিয়ারত করতে যেতেন, তখন কবরের চারপাশের মোমবাতি ও প্রদীপের আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো, যাতে কেউ তাঁর ছায়াও দেখতে না পায়।
এ বিষয়ে ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) একবার তাঁর সম্মানিত পিতা আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-কে এই কাজের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ঘটনাটি নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে।
ইয়াহইয়া আল-মাযিনি বলেন:
وحدث يحيى المازني قال : كنت في جوار أمير المؤمنين في المدينة مدة مديدة ، وبالقرب من البيت الذي تسكنه زينب ابنته ، فلا والله ما رأيت لها شخصا ولا سمعت لها صوتا ، وكانت إذا أرادت الخروج لزيارة جدها رسول الله تخرج ليلا والحسن عن يمينها والحسين عن شمالها وأمير المؤمنين (ع) أمامها ، فإذا قربت من القبر الشريف سبقها أمير المؤمنين (ع) فأخمد ضوء القناديل ، فسأله الحسن (ع) مرة عن ذلك فقال (ع) : أخشى أن ينظر أحد إلى شخص أختك زينب .
আমি দীর্ঘ সময় মদিনায় আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করেছি। আমি তাঁর কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর বাসস্থানের কাছেই থাকতাম। আল্লাহর কসম! আমি কখনো তাঁকে দেখিনি এবং তাঁর কণ্ঠস্বরও শুনিনি।
তিনি যখন তাঁর নানা মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে বের হতেন, তখন রাতে বের হতেন। ইমাম হাসান (আ.) তাঁর ডান পাশে, ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর বাম পাশে এবং আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) সামনে হাঁটতেন।
তাঁরা যখন পবিত্র কবরের কাছাকাছি পৌঁছাতেন, তখন আমিরুল মুমিনিন (আ.) আগে এগিয়ে গিয়ে প্রদীপগুলোর আলো নিভিয়ে দিতেন।
একদিন ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) তাঁর পিতাকে এই কাজের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আমিরুল মুমিনিন (আ.) উত্তর দিলেন: আমি আশঙ্কা করি, কেউ যেন তোমার বোন জয়নাবের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে।
(বাহরাইন ও কাতিফের একদল আলেম, ওয়াফায়াতুল আয়িম্মাহ, খণ্ড/পৃষ্ঠা ৪৩৫–৪৩৬; প্রকাশক: দারুল বালাগাহ লিত্তিবাআতি ওয়ান-নাশরি ওয়াত-তাওযি, বৈরুত, লেবানন; ১৪১২ হিজরি/১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ)
২. প্রজ্ঞা ও জ্ঞানগত পূর্ণতা
আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন সেই মহান নারী, যাঁর কাছ থেকে ইবনে আব্বাস হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর ফাদাক-সংক্রান্ত বক্তব্য বর্ণনা করেছেন।
তিনি লিখেছেন:
«زينب العقيلة بنت علي بن أبي طالب. وأمها فاطمة بنت رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم ... والعقيلة هي التي روى ابن عباس عنه كلام فاطمة في فدك، فقال: حدثتني عقيلتنا زينب بنت علي.»
জয়নাব আল-আকিলা হলেন আলী ইবনে আবি তালিবের কন্যা। তাঁর মাতা ছিলেন মহানবী (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (সা.আ.)।
এই আল-আকিলাই সেই মহীয়সী নারী, যাঁর কাছ থেকে ইবনে আব্বাস ফাদাক সম্পর্কে হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আমাদের আকিলা-আলী (আ.)-এর কন্যা জয়নাব-আমাকে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
(আবুল ফারাজ আলী ইবনে আল-হুসাইন আল-ইসফাহানি (মৃত্যু: ৩৫৬ হিজরি), মাকাতিলুত তালিবিয়্যিন, পৃষ্ঠা ২৫; আল-জামিউল কাবির সংস্করণ অনুযায়ী)
‘আল-আকিলা’ উপাধির পরিচিতি
মিসরীয় লেখিকা ড. আয়েশা বিনতে শাতি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:
«وغلب عليها هذا اللقب فكان يقال العقيلة فيعرف أنها هي.»
এই উপাধিটি তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল যে, ‘আল-আকিলা’ বলা হলেই মানুষ বুঝতে পারত যে, তাঁকেই বোঝানো হচ্ছে।
এখানে ‘আল-আকিলা’ উপাধিটি হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও মহত্ত্বের পরিচায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
(আয়েশা আব্দুর রহমান বিনতে শাতি, আস-সাইয়্যিদা জয়নাব আকীলাতু বনি হাশিম, পৃষ্ঠা ৫৩; প্রকাশক: দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, লেবানন; ১৪০৬ হিজরি/১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জ্ঞানগত মর্যাদা
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জ্ঞানগত মর্যাদা বোঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, আল্লাহর চতুর্থ হুজ্জাত, সাইয়্যিদুস সাজিদীন ইমাম আলী ইবনে হুসাইন জয়নুল আবেদীন (আ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন:
«وَأَنْتِ بِحَمْدِ اللَّهِ عَالِمَةٌ غَيْرُ مُعَلَّمَةٍ فَهِمَةٌ غَيْرُ مُفَهَّمَةٍ.»
আল্লাহর প্রশংসা যে, আপনি এমন একজন জ্ঞানী নারী, যিনি কারও কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেননি; আর আপনি এমন প্রজ্ঞার অধিকারিণী, যাঁকে কেউ বুঝিয়ে না দিলেও আপনি নিজেই বিষয়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন।
(আবু মনসুর আহমাদ ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব আত-তাবারসি (মৃত্যু: ৫৪৮ হিজরি), আল-ইহতিজাজ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৫; সম্পাদনা ও টীকা: সাইয়্যিদ মুহাম্মদ বাকির আল-খুরাসানি; প্রকাশক: দারুন নু‘মান লিত্তিবাআতি ওয়ান-নাশর, নাজাফ আল-আশরাফ, ১৩৮৬ হিজরি/১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জ্ঞানচর্চার আসর
আয়েশা বিনতে আব্দুর রহমান বিনতে শাতি, জাহিজের বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন:
«وكان لها ـ فيما تقول بعض الروايات ـ مجلس علمي حافل، تقصده جماعة من النساء اللواتي يردن التفقه في الدين.»
কিছু রেওয়ায়েত অনুসারে, হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর একটি সমৃদ্ধ জ্ঞানচর্চার আসর ছিল। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ও দ্বীনের গভীর উপলব্ধি লাভ করতে আগ্রহী নারীরা তাঁর সেই শিক্ষার আসরে উপস্থিত হতেন।
(আয়েশা আব্দুর রহমান বিনতে শাতি, আস-সাইয়্যিদা জয়নাব আকীলাতু বনি হাশিম, পৃষ্ঠা ৫৩; প্রকাশক: দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, লেবানন; ১৪০৬ হিজরি/১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)
জ্ঞান ও তাকওয়ায় পিতার সাদৃশ্য, কোমলতা ও মমতায় মাতার সাদৃশ্য
আয়েশা বিনতে শাতি একই গ্রন্থে জাহিজের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আরও লিখেছেন:
«إنها كانت تشبه أمها لطفاً ورقةً، وتشبه أباها علماً وتقى.»
হযরত জয়নাব (সা.আ.) কোমলতা, নম্রতা ও মমতায় তাঁর মাতা হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর মতো ছিলেন। আর জ্ঞান ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর পিতা হযরত আলী (আ.)-এর সাদৃশ্য ধারণ করতেন।
নিজ যুগের ইমামের পক্ষ থেকে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর বিশেষ প্রতিনিধিত্ব
কয়েকজন ঐতিহাসিক ও লেখক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত জয়নাব (সা.আ.) ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে শায়খ সাদুক (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে:
«كانت زينب (سلام الله عليها) لها نيابة خاصة عن الحسين (عليه السلام) وكان الناس يرجعون إليها في الحلال والحرام حتى برئ زين العابدين (عليه السلام) من مرضه.»
হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব ছিল। মানুষ হালাল-হারামসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর কাছে আসত এবং তাঁর কাছ থেকে সমাধান গ্রহণ করত। এ অবস্থা অব্যাহত ছিল, যতক্ষণ না ইমাম জয়নুল আবেদীন (আলাইহিস সালাম) তাঁর অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
(বাহরাইন ও কাতিফের একদল আলেম, ওয়াফায়াতুল আয়িম্মাহ, পৃষ্ঠা ৪৪০; প্রকাশক: দারুল বালাগাহ লিত্তিবাআতি ওয়ান-নাশর ওয়াত-তাওযি, বৈরুত, লেবানন; ১৪১২ হিজরি/১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ)
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পক্ষ থেকে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর কাছে আমানত হস্তান্তর
শায়খ সাদুক (রহ.) তাঁর কামালুদ্দীন গ্রন্থে আহমদ ইবনে ইবরাহিমের সূত্রে একটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। এতে ইমাম মাহদি (আজ্জা.)-এর ফুফু এবং ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর বোন হযরত হাকিমা (সা.আ.)-এর বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
এই রেওয়ায়েত অনুযায়ী, আশুরার দিন ইমাম হুসাইন (আ.) বাহ্যিকভাবে তাঁর বোন হযরত জয়নাব (সা.আ.)-কে নিজের ওসিয়ত ও দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি ইমামতের গোপন বিষয়াবলি ও জ্ঞান তাঁর কাছে আমানত হিসেবে রাখেন, যাতে পরবর্তী সময়ে তা ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এর ফলে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর জীবনও শত্রুদের বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়।
এ প্রসঙ্গে বর্ণনায় এসেছে:
«وَالْحُسَيْنُ بْنُ عَلِيٍّ أَوْصَى إِلَى أُخْتِهِ زَيْنَبَ بِنْتِ عَلِيٍّ فِي الظَّاهِرِ، وَكَانَ مَا يَخْرُجُ عَنْ عَلِيِّ بْنِ الْحُسَيْنِ عَلَيْهِ السَّلَامُ مِنْ عِلْمٍ يُنْسَبُ إِلَى زَيْنَبَ سَتْراً عَلَى عَلِيِّ بْنِ الْحُسَيْنِ عَلَيْهِ السَّلَامِ.»
আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর কাছ থেকে যে জ্ঞান প্রকাশিত হতো, তা হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর নামে সম্বন্ধিত করা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-কে আড়ালে রেখে তাঁর জীবন রক্ষা করা। এ কারণেই ইমাম হুসাইন (আ.) বাহ্যিকভাবে তাঁর বোন জয়নাব বিনতে আলী (সা.আ.)-এর কাছে ওসিয়ত করেছিলেন।
(আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আল-হুসাইন আশ-শায়খ আস-সাদুক (মৃত্যু: ৩৮১ হিজরি), কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি‘মাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫০১; প্রকাশক: ইসলামিয়্যাহ, তেহরান; দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৯৫ হিজরি)
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর সংগ্রামী ভূমিকা
প্রখ্যাত শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ আবুল কাসিম আল-খুয়ী (রহ.) হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর মর্যাদা ও ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছেন:
«إنها شريكة أخيها الحسين عليه السلام في الذب عن الإسلام والجهاد في سبيل الله، والدفاع عن شريعة جدها سيد المرسلين، فتراها في الفصاحة كأنها تفرغ عن لسان أبيها، وتراها في الثبات تنئ عن ثبات أبيها، لا تخضع عند الجبارة، ولا تخشى غير الله سبحانه، تقول حقاً وصدقاً، لا تحركها العواصف، ولا تزيلها القواصف، فحقاً هي أخت الحسين عليه السلام وشريكته في سبيل عقيدته وجهاده.»
নিঃসন্দেহে, ইসলামকে রক্ষা করা, আল্লাহর পথে জিহাদ করা এবং তাঁর নানা-সর্বশেষ রাসুলদের নেতা মহানবী (সা-)-এর শরিয়তকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে হযরত জয়নাব (সা.আ.) তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সহযোগী ও অংশীদার ছিলেন।
বাগ্মিতা ও ভাষণশৈলীতে তাঁকে এমন মনে হতো, যেন তিনি তাঁর পিতার ভাষারই প্রতিচ্ছবি। দৃঢ়তা ও অবিচলতার ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর পিতার মতো ছিলেন। কোনো অত্যাচারী ও উদ্ধত শাসকের সামনে তিনি মাথা নত করতেন না এবং মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করতেন না। তিনি সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতেন। ঝড়ঝঞ্ঝা তাঁকে বিচলিত করতে পারত না, আর বিপদের প্রচণ্ড আঘাতও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে সরাতে পারত না।
অতএব, নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বোন এবং তাঁর আদর্শ, বিশ্বাস ও সংগ্রামের পথে তাঁর প্রকৃত সহযোগী।
(সাইয়্যিদ আবুল কাসিম আল-মুসাভি আল-খুই (মৃত্যু: ১৪১১ হিজরি), মু‘জামু রিজালিল হাদিস ওয়া তাফসিলু তাবাকাতির রুওয়াত, খণ্ড ২৪, পৃষ্ঠা ২১৯; পঞ্চম সংস্করণ, ১৪১৩ হিজরি/১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ)
চলবে....
অনুবাদ: মজিদুল ইসলাম শাহ
আপনার কমেন্ট