শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬ - ১৯:৩৬
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা কীভাবে ব্যর্থ করে দিল ইরানের নিখুঁত হামলা?

উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের সুনির্দিষ্ট হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ের প্রমাণ, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং জ্বালানি ও নিরাপত্তা খাতের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের সামরিক পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আকস্মিকভাবে পড়ে এসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করলেও, হামলাগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এবং অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল।

অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা

বিশেষজ্ঞদের প্রমাণ ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা কাজে লাগিয়ে তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে ধারাবাহিক হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বন্দরটি দেশটির তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে তেল পরিবহনের পাইপলাইন-সংযুক্ত স্থাপনাগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ফলে রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি সময়ে ফুজাইরা থেকে তেল লোড করার পরিমাণ আগের গড়ের অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়াও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জ্বালানি স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনাগুলোতে হামলার ফলে বিশ্ববাজারে এই গ্যাসের সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হুমকির মুখে পড়ে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ শীতলীকরণ সরঞ্জামগুলো সম্পূর্ণ মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন এবং রাস তানুরা ও জিজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শোধনাগারগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পানি, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্য

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হামলা শুধু তেল ও গ্যাস স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দৈনন্দিন জীবন ও জনসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও এর আওতায় এসেছে।

কুয়েতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির পানীয় জলের একটি বড় অংশ এসব স্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। ফলে আল-সুবাইয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি গুরুতর সংকটের মুখে পড়ে এবং সরকারকে পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা সেন্টারসহ উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামোয় সাইবার ও সরাসরি হামলার ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হামলার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ওই অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এসব হামলার ব্যাপকতা ও নির্ভুলতা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে।

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরস্পর-সম্পর্কিত। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নীতি অব্যাহত থাকলে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব ঘটনার পর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক পক্ষ তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে উত্তেজনা এড়িয়ে চলা, কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha