শনিবার ১৭ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:৩১
মাটির ওপর সিজদা

নামাজের পরিভাষায় সেজদা হলো-আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট অঙ্গসমূহ মাটিতে রেখে তাঁর সামনে সম্পূর্ণ বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম পর্ব:

সেজদা কী?

আরবি «سُجُود» (সুজূদ) শব্দটি এসেছে «سَجَدَ» (সাজাদা) থেকে। এর মূল অর্থ হলো-নত হওয়া, মাথা অবনত করা, বিনয় প্রকাশ করা এবং কারও শ্রেষ্ঠত্বের সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা স্বীকার করা।

নামাজের পরিভাষায় সেজদা হলো-আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট অঙ্গসমূহ মাটিতে রেখে তাঁর সামনে সম্পূর্ণ বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা।

কিন্তু এর আরও একটি গভীর সত্য রয়েছে: তা হলো-নিজের ‘আমি’কে সরিয়ে আল্লাহর ‘মহত্ত্ব’-এর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করা।

মানুষের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক রোগ হলো অহংকার-“আমি”র অনুভূতি।

আমি জ্ঞানী,ৎআমি শক্তিশালী, আমি ধনী, আমি সম্মানিত, আমি অন্যের চেয়ে বড়-এই “আমি” যত বড় হয়, আল্লাহর সামনে মানুষের বিনয় তত কমে যায়। সেজদা সেই “আমি”-কে ভেঙে দেয়, মানুষ যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তার মাথা উঁচু থাকে। কিন্তু আল্লাহর সামনে সে নিজের সবচেয়ে সম্মানিত অঙ্গ-মাথা-মাটিতে রেখে বলে: হে আল্লাহ! আমার মাথা আমার অহংকারের প্রতীক নয়; আমার মাথাও আপনার বান্দা।

এ কারণেই সেজদা মানুষের আত্মাকে শিক্ষা দেয়-

তুমি বড় নও; তোমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই মহান।

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই যে আমরা তাঁকে সেজদা করব। আমাদের সেজদা আল্লাহকে বড় করে না; কারণ তিনি আমাদের সেজদার আগেও পরম মহান ছিলেন এবং আমাদের সেজদার পরেও পরম মহান থাকবেন।

তাহলে সেজদার লাভ কার?

আমাদের।

সূরা ফাতিরে আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ

হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, সকল প্রশংসার অধিকারী।

অর্থাৎ সেজদা মূলত আল্লাহর প্রয়োজন পূরণ নয়; মানুষের নিজের বাস্তব পরিচয় আবিষ্কার, আমি ফকীর, তিনি গনী। আমি সৃষ্ট, তিনি স্রষ্টা। আমি দুর্বল, তিনি শক্তির অধিকারী। আমি মৃত্যুশীল, তিনি চিরঞ্জীব। আমি মুখাপেক্ষী, তিনি অমুখাপেক্ষী। এবং সেজদা এই সত্যকে শুধু মুখে নয়, শরীর দিয়েও স্বীকার করা।

সুতরাং সেজদা মানুষের অহংকারের বিরুদ্ধে ঘোষণা দেওয়া, ইবলিসের পতনের মূল কারণ কী ছিল?

অহংকার।

আল্লাহ আদম (আ.)-কে সেজদার নির্দেশ দিলেন। ইবলিস বলল:  (أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ) আমি তার চেয়ে উত্তম। এখানে ইবলিসের সমস্যা ছিল শুধু সেজদা না করা নয়; তার সমস্যা ছিল “আমি,র অহংকার”। সে নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর আদেশের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে মুমিন যখন সেজদায় যায়, তখন সে যেন ঘোষণা করে: আমি শ্রেষ্ঠ নই; আমার রব শ্রেষ্ঠ।” এ কারণেই সেজদা কেবল একটি শারীরিক কাজ নয়-এটি ইবলিসের অহংকারের বিপরীতে বান্দার বিনয়ের ঘোষণা।

মানুষের মাথার সঙ্গে তার-চিন্তা, বুদ্ধি, পরিকল্পনা, অহংকার, আত্মপরিচয়, সিদ্ধান্তৎএসবের সম্পর্ক রয়েছে, সেজদায় সেই মাথাই মাটিতে রাখা হয়, অর্থাৎ বান্দা যেন বলছে: হে আল্লাহ! আমার বুদ্ধি আপনার উপরে নয়; আমার জ্ঞান আপনার জ্ঞানের সামনে সীমিত। এটি বুদ্ধি পরিত্যাগ করা নয়। বরং বুদ্ধিকে তার সীমা উপলব্ধি করানো, মানুষ যত জ্ঞানী হয়, তার তত বেশি উপলব্ধি হওয়া উচিত-আমি যত জানি, তার চেয়ে অসীম বেশি আমি জানি না। তাই প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে না; বরং তাকে সেজদায় নিয়ে যায়।

কুরআন মানুষকে তার প্রকৃত পরিচয় স্মরণ করিয়ে দেয়: (خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ) তিনি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের শরীর শেষ পর্যন্ত কোথায় ফিরে যায়? মাটিতে।

সেজদায় মানুষ সেই মাটির কাছেই মাথা রাখে। এ যেন একটি গভীর আধ্যাত্মিক স্মরণ: আমি মাটি থেকে এসেছি, মাটিতেই ফিরে যাব এবং আজও আমার রবের সামনে মাটির মতো বিনয়ী হয়েছি, যে মাটি আমার পায়ের নিচে, আজ তোমার সম্মানে কপাল সেই মাটিতে রেখেছি।

 তাই সেজদা মানুষের অহংকারকে তার উৎসের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সেজদার আগে আমরা বলি: (اللَّهُ أَكْبَرُ) “আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।” তারপর সেজদায় গিয়ে বলি: (سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى وَبِحَمْدِهِ) “আমার সর্বোচ্চ রব পবিত্র; তাঁরই প্রশংসা।” এখানে একটি অপূর্ব আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্য রয়েছে। বান্দা যখন নিজেকে সবচেয়ে নিচু অবস্থায় নিয়ে যায়-মাটিতে মাথা রাখে-তখন সে ঘোষণা করে: “আমার রবই সর্বোচ্চ।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ

“বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সেজদারত থাকে।” এখানেই সেজদা আমাদের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা দেয় যে, কেউ মাটিতে মাথা রাখতে পারে, কিন্তু তার অহংকার মাথার ভেতরেই থাকতে পারে। মানুষ যখন আল্লাহকে নিজের প্রকৃত রব হিসেবে গ্রহণ করে সেজদা করে, তখনই তার বাহ্যিক সেজদা অন্তরের সেজদায় পরিণত হয়।

আল্লাহর সামনে মাথা নত করা মানে স্বাধীনতা হারানো নয়, বরং আল্লাহর বান্দা হওয়া মানুষকে অন্য সব কিছুর দাসত্ব থেকে মুক্ত করে, ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর কারবালার সেজদা তাঁর সংগ্রামের মূল ছিল—মানুষের তৈরি অন্যায় কর্তৃত্বের সামনে মাথা নত না করা। তিনি আল্লাহর সামনে মাথা নত করেছেন, কিন্তু জুলুমের সামনে আত্মসমর্পণ করেননি, এবং যে আল্লাহর সামনে সেজদা করতে জানে, সে বাতিলের সামনে মাথা নত করতে পারে না।

সুতরাং যে ব্যক্তি মসজিদে আল্লাহর সামনে মাথা রাখে, কিন্তু জুলুমের সামনে নিজের বিবেক বিক্রি করে দেয়—সে সেজদার গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে পারেনি।

মানুষ যখন সেজদায় যায়, তখন তার মাথা-যা তার অহংকারের কেন্দ্র-মাটিতে নেমে আসে। এর মাধ্যমে সে নিজের নফসকে বলে:

আমি তোমার মালিক নই; আল্লাহ আমার মালিক। এখানে সেজদা তিনটি সত্যের স্বীকৃতি দেয়:

رَبٌّ -রব আছেন

عَبْدٌ -আমি বান্দা

عُبُودِيَّةٌ - আমার কর্তব্য হলো তাঁর দাসত্ব।

তাই সেজদা হলো আবূদিয়্যাহর সর্বোচ্চ প্রকাশ, একটি ইবাদত, যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। কোনো নবী, ইমাম, ফেরেশতা বা অন্য কোনো সৃষ্টির সামনে ইবাদতের উদ্দেশ্যে সেজদা করা যাবে না।

তাই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার: (سُجُودٌ لِلَّهِ) আল্লাহর জন্য সেজদা" - ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য। (سُجُودٌ لِلتَّكْرِيمِ) সম্মান প্রদর্শনের জন্য সেজদা।

এই দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে: তাই ইমামগণের মাজারে যেয়ে সেজদা করা, এটি আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁদের প্রতি সম্মান, তাঁদের কাছে সালাম, তাঁদের জিয়ারত-এসব ইবাদত নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশিত ওয়ালায়াত ও সম্মানের প্রকাশ।

কিন্তু ইবাদতের নিয়তে সেজদা কেবল আল্লাহর জন্য। অর্থাৎ: আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসা থাকতে পারে, কিন্তু ইবাদতের সেজদা কেবল আল্লাহর। এটাই তাওহিদের সীমারেখা।

এবার আমরা মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, অর্থাৎ আল্লাহর জন্য সেজদা ও তার বিধান ও কোন বস্তুর ওপর সেজদা করা প্রয়োজন।

মাটির ওপর সিজদা:

 এখানে কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন:

প্রথমত: সিজদার বিধান ও তার প্রকৃতি:

জানাযার নামাজ ব্যতীত অন্যান্য ফরজ নামাজে দুটি সিজদা করা রুকনি ওয়াজিব। অর্থাৎ, নামাজের দুটি সিজদা নামাজের মৌলিক ও অপরিহার্য অংশ। তাই সিজদা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি-সিজদা কেবল মহান আল্লাহর জন্যই করা যায়। কোনো সৃষ্টির জন্যে সিজদা করা বৈধ নয়; সে ব্যক্তি যত মর্যাদাবানই হোক না কেন-এমনকি কোনো নবী বা ওসিও যদি হন, তবুও তাঁর জন্য ইবাদতের সিজদা করা যাবে না।

এখানে ‘সিজদা’ বলতে ফিকহের পরিভাষাগত অর্থ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, কপাল এবং সিজদার অন্যান্য নির্ধারিত অঙ্গ ভূমিতে স্থাপন করা।

সিজদার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো-কপাল ভূমির ওপর রাখা হবে। আর ‘ভূমি’ (الأرض) বলতে শুধু সাধারণ মাটিই বোঝায় না; বরং ভূমির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানও এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন-

মাটি - التراب

পাথর - الصخر

কঙ্কর বা নুড়ি - الحصى

বালি - الرمل

কাদা - الطين

এ ছাড়াও ভূমির অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য উপাদান এর আওতায় পড়ে।

দ্বিতীয়ত: মাটির ওপর সিজদার নববী দলিল:

মাটির ওপর সিজদার প্রধান দলিল হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর বিখ্যাত বাণী:

«جُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا»

“জমিনাকে আমার জন্য সিজদার স্থান এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।”

এই হাদিসের আলোকে বোঝা যায় যে, ভূমি ও তার মাটি সিজদার স্বাভাবিক ও মূল স্থান। কারণ মাটি, পাথর, বালি, কঙ্কর ইত্যাদি ভূমির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেগুলোর ওপর ‘الأرض’ বা ‘ভূমি’-এর সংজ্ঞা প্রযোজ্য হয়।

তৃতীয়ত: ভূমির ওপর সিজদা একটি নববী নির্দেশনা:

ভূমি এবং তার অন্তর্ভুক্ত উপাদানের ওপর সিজদা করা ইসলামী শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও নববী নির্দেশনার সঙ্গে সম্পর্কিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্টভাবে বলেছেন:

«جُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا»

“পৃথিবীকে আমার জন্য সিজদার স্থান এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় করা হয়েছে।”

অতএব, সিজদার ক্ষেত্রে ভূমি একটি স্বীকৃত ও মূল ভিত্তি।

অন্যদিকে, ভূমি ছাড়া কার্পেট, লোহা, কাচ ইত্যাদির ওপর সিজদা করতে হলে তার পক্ষে পৃথক শরয়ি দলিল প্রয়োজন। কারণ ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের পক্ষ থেকে কোনো পদ্ধতি নির্ধারণ করা যায় না; বরং তা শরিয়তের প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল।

অনুবাদ: হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা গোলাম মুস্তাফা নাজাফী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha