বুধবার ১৪ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:১৮
নতুন ইসলামী সভ্যতা গঠনে নামাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামী সভ্যতা গঠনে নামাজের কেন্দ্রীয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ ফরিদ মাওয়ালি-জাদেহ বলেছেন, নামাজ আধ্যাত্মিকতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং ইসলামী জীবনধারাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নতুন ইসলামী সভ্যতা গড়ে তুলতে হলে সমাজের অগ্রগতিতে নামাজের ভূমিকার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বুধবার তেহরানে ‘আফতাবে শার্কি’ টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী উম্মাহ ও ইরানি জাতির অগ্রযাত্রায় সভ্যতা নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি এমন একটি বিষয়, যার ওপর ইমাম খোমেনি (রহ.) এবং শহীদ বিপ্লবী নেতা বিভিন্ন বক্তব্য ও বার্তায় গুরুত্বারোপ করেছেন।

ইসলামী সভ্যতা ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক

মাওয়ালি-জাদেহ বলেন, নতুন ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নামাজ। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা। আজকের বিশ্ব নানা সংকটের মুখোমুখি, যার অন্যতম কারণ হিসেবে আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হলো আধ্যাত্মিকতা ও নামাজ।

তিনি বলেন, সভ্যতা নির্মাণে নামাজের ভূমিকা যথাযথভাবে বোঝার জন্য সভ্যতার বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। শহীদ বিপ্লবী নেতা বিভিন্ন বক্তব্যে ইসলামী চিন্তাধারার আলোকে সভ্যতার প্রকৃতি ও উপাদান ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে উত্তর খোরাসান সফরকালে সেখানকার তরুণদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি সভ্যতার বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সভ্যতার বস্তুগত ও অবস্তুগত দুটি দিক

ধর্মীয় এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শহীদ বিপ্লবী নেতার বক্তব্য অনুযায়ী সভ্যতার দুটি দিক রয়েছে-বস্তুগত ও অবস্তুগত।

সভ্যতার বস্তুগত দিক বলতে বিজ্ঞান, জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বোঝায়। ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পিছিয়ে থাকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। দ্রুত সেই ব্যবধান কমানোর প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের অর্জিত অগ্রগতির বিষয়টি আজ দেশটির সমর্থক ও সমালোচক-উভয় পক্ষের কাছেই স্বীকৃত।

অন্যদিকে, সভ্যতার অবস্তুগত দিক মূলত জীবনধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি ইসলামী সমাজের জীবনধারা ইসলামী আদর্শ, ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। অর্থাৎ, সভ্যতা শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতির নাম নয়; মানুষের জীবনযাপন, আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি বলেন, সামাজিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আচরণ, কর্মক্ষেত্র এবং স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-সবই জীবনধারার অন্তর্ভুক্ত। এমনকি খাদ্যাভ্যাস, পোশাক এবং পরিবেশের সঙ্গে মানুষের আচরণও এর অংশ।

মহানবী (সা.) ও আহলে বাইত (আ.)-এর জীবনধারা অনুসরণ

মাওয়ালি-জাদেহ আশুরার জিয়ারতের এই বাক্যটি উল্লেখ করেন: ‘আল্লাহুম্মাজআল মাহইয়ায়া মাহইয়া মুহাম্মাদিন ওয়া আলে মুহাম্মাদ’-অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আমার জীবনকে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের জীবনের মতো করে দিন।’

তিনি বলেন, এই বাক্য মহানবী (সা.) ও আহলে বাইত (আ.)-এর জীবনপদ্ধতি অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরে। তাঁদের জীবনধারাকে মানুষের জন্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আদর্শ হতে হবে পূর্ণাঙ্গ, আর প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেই আদর্শের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করা।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বদৃষ্টি, জ্ঞান, চিন্তা ও মনন সভ্যতার বস্তুগত এবং অবস্তুগত-উভয় দিকের ভিত্তি তৈরি করে। ইসলামী শিক্ষায় নামাজ মানুষের জীবনধারাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নামাজের প্রভাব মানুষের অন্যান্য কাজ ও আচরণেও প্রতিফলিত হওয়ার কথা। তাই নামাজের গুণগত মান এবং ব্যক্তির জীবনযাপনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

নামাজের প্রভাব আচরণে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি

ধর্মীয় এই বিশেষজ্ঞ নামাজ যথাযথভাবে আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়লেও যদি তাঁর দৈনন্দিন জীবনে শৃঙ্খলা না থাকে, তাহলে তাঁর নামাজের মান ও আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে আত্মসমালোচনা করা উচিত।

তিনি বলেন, নামাজ যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এর প্রভাব মানুষের আচরণ, দায়িত্ববোধ ও জীবনযাপনের পদ্ধতিতে প্রকাশ পাওয়া উচিত।

ইসলামী-ইরানি উন্নয়ন মডেল ও অগ্রগতির চারটি ক্ষেত্র

মাওয়ালি-জাদেহ শহীদ বিপ্লবী নেতার ইসলামী-ইরানি উন্নয়ন মডেল প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ মডেল প্রণয়ন ছিল তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। ১৩৯০ ইরানি সনে (২০১১–২০১২ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর উপস্থিতিতে হাওযা ইলমিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল চিন্তাবিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা হয়।

তিনি গবেষক, শিক্ষাবিদ ও আগ্রহীদের উন্নয়নবিষয়ক এসব বৈঠকের বক্তব্য অধ্যয়ন এবং সংশ্লিষ্ট বক্তৃতার অডিও শোনার পরামর্শ দেন।

শহীদ বিপ্লবী নেতার বক্তব্যের আলোকে তিনি সমাজের অগ্রগতির চারটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেন:

১- চিন্তা ও মনন: সঠিক চিন্তা, গভীর উপলব্ধি এবং সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে চিন্তাভাবনার বিকাশ।

২- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: জ্ঞানচর্চা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন।

৩- মানবজীবন-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান: অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতিসহ মানুষের জীবন পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি।

৪- আধ্যাত্মিকতা: আত্মিক উন্নয়ন, পরকাল সম্পর্কে সচেতনতা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা।

চিন্তা ও আধ্যাত্মিকতা উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ

চিন্তার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে চিন্তা ও গভীর উপলব্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি রাতের ইবাদতসংক্রান্ত আলোচনাতেও আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বিশেষভাবে সুরা আলে ইমরানের শেষের দিকের আয়াতগুলোর কথা উল্লেখ করেন। সেখানে এমন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যাঁরা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করেন এবং সৃষ্টির নিদর্শন থেকে আল্লাহর মহত্ত্ব ও প্রজ্ঞা উপলব্ধি করেন।

তাঁর মতে, সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা ও গভীর উপলব্ধি মানুষের উন্নতি ও আত্মিক উৎকর্ষের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইবাদতকে চিন্তা, জ্ঞান ও উপলব্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

তিনি আরও বলেন, সমাজের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বস্তুগত ও প্রযুক্তিগত সূচকের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক উন্নয়নকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরকাল, কিয়ামত এবং মানুষের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতাও উন্নয়নের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মাওয়ালি-জাদেহ বলেন, নতুন ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে সমাজকে আধ্যাত্মিকতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, নামাজ মানুষের আধ্যাত্মিকতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ইসলামী জীবনধারাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং নতুন ইসলামী সভ্যতা গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha