হাওজা নিউজ এজেন্সি: অনেক মুমিনই অধিক জিকিরকারীদের মর্যাদা অর্জন করতে এবং আল্লাহর স্মরণের বরকত লাভ করতে চান। আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষায় দেখা যায়, অধিক জিকিরের তাৎপর্য শুধু জিকিরের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিয়মিত আল্লাহকে স্মরণ করা, অন্তরের একাগ্রতা ও ইখলাসও এর গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্রশ্ন: হাদিসের আলোকে অধিক জিকিরের দৃষ্টান্ত কী কী? কখন এই জিকির করা উচিত?
উত্তর: পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের অধিক পরিমাণে তাঁকে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আহলে বাইত (আ.)-এর হাদিসে অধিক জিকিরের কয়েকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এসব বর্ণনায় জিকিরের সংখ্যা, নিয়মিততা এবং আন্তরিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১. হজরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)-এর তাসবিহ পাঠ: অধিক জিকিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হলো হজরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)-এর প্রসিদ্ধ তাসবিহ। এর নিয়ম হলো:
• ৩৪ বার আল্লাহু আকবার (الله أكبر)
• ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ (الحمد لله)
• ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ (سبحان الله)
সব মিলিয়ে মোট ১০০ বার জিকির।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “হজরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)-এর তাসবিহ সেই অধিক জিকিরের অন্তর্ভুক্ত, যার কথা মহান আল্লাহ বলেছেন—‘তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’”
অন্য একটি বর্ণনায় ইমাম সাদিক (আ.) থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, কেউ যদি দিন ও রাতে একবার এই তাসবিহ পাঠ করেন, তবে তাঁকে অধিক জিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়।
এই বর্ণনার অর্থ এই নয় যে, হজরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)-এর তাসবিহ কেবল দিন ও রাতে একবার পাঠ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বরং এতে এমন একটি আমলের কথা বলা হয়েছে, যা নিয়মিত পালন করলে অধিক জিকিরের মর্যাদা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
তাই ফরজ নামাজের পর, ঘুমানোর আগে কিংবা দিনের অন্য যেকোনো সময়ে মনোযোগ ও একাগ্রতার সঙ্গে এই তাসবিহ পাঠ করা যেতে পারে।
২. ফরজ নামাজের পর ৩০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা: অন্য একটি হাদিসে ফরজ নামাজের পর ৩০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করাকেও অধিক জিকিরের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে অধিক জিকিরের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “ফরজ নামাজের পর ৩০ বার সুবহানাল্লাহ বলা।”
এখানে ফরজ নামাজের পরের সময়কে বোঝানো হয়েছে। সে অনুযায়ী, প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করা অধিক জিকিরের একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
দিনে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর এই আমল করলে মোট ১৫০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করা হয়।
৩. প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার আল্লাহকে স্মরণ করা: কিছু হাদিসে প্রতিদিন ১০০ বার আল্লাহকে স্মরণ করাকে অধিক জিকির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন, “কোনো বান্দা যদি দিনে ১০০ বার তার প্রতিপালককে স্মরণ করে, তবে তা অধিক জিকির হিসেবে গণ্য হয়।”
এই বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিদিন ১০০ বার আল্লাহকে স্মরণ করা অধিক জিকিরের অন্তর্ভুক্ত। তবে হাদিসটিতে এই স্মরণের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট শব্দের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
তাই ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ইস্তিগফার, দরুদসহ বিভিন্ন শরিয়তসম্মত জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করা যেতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনে এই আমল সহজ করতে জিকিরের সংখ্যা বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে নেওয়া যায়। যেমন, কিছু জিকির ফজরের নামাজের পর, কিছু যাতায়াতের সময়, কিছু অন্যান্য নামাজের পর এবং কিছু রাতে করা যেতে পারে। এতে দিনের বিভিন্ন সময়ে আল্লাহকে স্মরণ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
৪. নির্জনে ও ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করা: অধিক জিকিরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হলো লোকচক্ষুর আড়ালে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা।
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি গোপনে মহান আল্লাহকে স্মরণ করে, সে অধিক জিকির করেছে। কারণ, মুনাফিকরা প্রকাশ্যে আল্লাহকে স্মরণ করত, কিন্তু গোপনে তাঁকে স্মরণ করত না। এ প্রসঙ্গেই মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা লোকদের দেখানোর জন্য কাজ করে এবং আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।’”
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, জিকিরের গুরুত্ব শুধু এর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং এর উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ যদি মানুষের প্রশংসা বা দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে জিকির করেন, তবে বাহ্যিকভাবে তাঁর জিকিরের পরিমাণ বেশি হলেও তা প্রকৃত ইখলাসের প্রতিফলন নাও হতে পারে। অন্যদিকে, লোকদেখানো মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করা আন্তরিকতার পরিচায়ক।
আহলে বাইত (আ.)-এর হাদিসে অধিক জিকিরের বিভিন্ন পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। হজরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)-এর তাসবিহ পাঠ, ফরজ নামাজের পর জিকির এবং প্রতিদিন নিয়মিত আল্লাহকে স্মরণ করা—এসব আমল দৈনন্দিন জীবনে জিকিরের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়ক।
পাশাপাশি, জিকিরে ইখলাস ও অন্তরের একাগ্রতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জিকিরের উদ্দেশ্য শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করা নয়; বরং আন্তরিকতার সঙ্গে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা এবং জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রতি মনোযোগী থাকা।
অতএব, অধিক জিকিরের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আমল নিয়মিত পালন করার পাশাপাশি জিকিরের অর্থ উপলব্ধি করা এবং লোকদেখানো মনোভাব পরিহার করাও জরুরি।
আপনার কমেন্ট