মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:১১
ফাদাক: মহানবী (সা.)-এর সম্পত্তি, হযরত ফাতিমা (সা.)-এর অধিকার ও আবু বকরের পদক্ষেপ

কোরআনের আয়াত ও ‘ফায়’ সংক্রান্ত বিধানের আলোকে ফাদাক কেন মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়েছিল এবং পরে হযরত ফাতিমা (সা.)-কে দান করা হয়েছিল? প্রথম খলিফা কোন যুক্তিতে তা তাঁর কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন?

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

উত্তর

ভূমিকা

ফাদাক ছিল মদিনার উত্তরে অবস্থিত একটি সমৃদ্ধ ও উর্বর গ্রাম। হিজরি সপ্তম সালে কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়াই মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে এই ভূখণ্ড। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বের কারণে ফাদাক সব সময়ই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট বিধান অনুসারে, যেসব ভূখণ্ড সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াই মুসলমানদের অধিকারে আসে, সেগুলোকে ‘ফায়’ (فَیء) বলা হয়। এ ধরনের সম্পত্তি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এখতিয়ারভুক্ত ছিল এবং তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তা পরিচালনা ও ব্যবহার করতে পারতেন।

সূরা হাশরে আল্লাহ তাআলা এ বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন:

«وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ... مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ»

“আর আল্লাহ তাদের কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা কিছু ফায় হিসেবে দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়া কিংবা উট ছোটাওনি… আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা কিছু ফায় হিসেবে দিয়েছেন, তা আল্লাহ, রাসুল, নিকটাত্মীয়, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের জন্য…”[১]

এই বিধানের ভিত্তিতে ফাদাক ফায় হিসেবে মহানবী (সা.)-এর এখতিয়ারে আসে। ফলে তিনি আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী এ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন করার অধিকারী ছিলেন।

হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-কে ফাদাক দান

“আর আত্মীয়স্বজনকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দাও”-এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর [২] মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নির্দেশে ফাদাক হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-কে দান করেন।

রেওয়ায়েত অনুযায়ী, এ দানের সময় একটি লিখিত দলিলও প্রস্তুত করা হয়েছিল। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) এবং উম্মে আইমান ওই দলিলের সাক্ষী ছিলেন।

এরপর থেকে মহানবী (সা.)-এর ওফাতের তিন বছর আগ পর্যন্ত ফাদাক হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর দখলে ছিল এবং বনু হাশিমের সদস্যরা এর উৎপাদিত সম্পদ থেকে উপকৃত হতেন।[৩]

এই দান কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল না; বরং সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েত অনুযায়ী, তা আল্লাহর নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল মহানবী (সা.)-এর পরিবারের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা।

আবু বকরের খেলাফতকালে ফাদাক দখল

মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর প্রথম খলিফা আবু বকর হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর নিযুক্ত প্রতিনিধিকে ফাদাক থেকে বহিষ্কার করেন এবং ভূখণ্ডটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

এ পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে আবু বকর একটি হাদিসের ওপর নির্ভর করেন। হাদিসটির বক্তব্য হলো, নবীগণ উত্তরাধিকার রেখে যান না; বরং তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের সম্পদ মুসলমানদের সাধারণ তহবিল বা বায়তুল মালে অন্তর্ভুক্ত হয়।

হাদিসটির আরবি বক্তব্য:

«نَحْنُ مَعَاشِرَ الْأَنْبِيَاءِ لَا نُوَرِّثُ»

অর্থ: আমরা নবীগোষ্ঠী উত্তরাধিকার রেখে যাই না। [৪]

অন্যদিকে, হযরত ফাতিমা (সা.আ.) কোরআনের আয়াত ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর ভিত্তিতে ফাদাকের ওপর নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তিনি নিজের দাবির সমর্থনে সাক্ষ্য-প্রমাণও উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু প্রথম খলিফা তাঁর দাবি গ্রহণ করেননি এবং ফাদাক ফিরিয়ে দেননি।[৫]

আবু বকরের যুক্তির পর্যালোচনা

কোরআনের আয়াত ও ফায়-সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, ফাদাক মহানবী (সা.)-এর এখতিয়ারভুক্ত সম্পত্তি ছিল। শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, তিনি জীবদ্দশায়ই তা হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-কে দান করেছিলেন।

অতএব, এই যুক্তি অনুযায়ী, ফাদাক মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ছিল না; বরং দান বা হিবা হিসেবে তা আগেই হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর মালিকানায় চলে এসেছিল।

অন্যদিকে, প্রথম খলিফা কর্তৃক উপস্থাপিত “আমরা নবীগোষ্ঠী উত্তরাধিকার রেখে যাই না”-এই হাদিসটির বক্তব্য কোরআনে নবীদের উত্তরাধিকার সম্পর্কে বর্ণিত আয়াতগুলোর সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়।

কোরআনে নবীদের উত্তরাধিকার লাভের কথা উল্লেখ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সূরা নামলের ১৬ নম্বর আয়াতে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর পিতা হযরত দাউদ (আ.)-এর উত্তরাধিকারী হওয়ার কথা বলা হয়েছে:

«وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ»

অর্থ: আর সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হলেন। [৬]

একইভাবে, সূরা মারইয়ামের ৫–৬ নম্বর আয়াতে হযরত জাকারিয়া (আ.) আল্লাহর কাছে এমন একজন উত্তরাধিকারী সন্তান প্রার্থনা করেন, যে তাঁর এবং ইয়াকুবের বংশের উত্তরাধিকারী হবে। [৭]

এসব আয়াতের ভিত্তিতে লেখক যুক্তি দিয়েছেন যে, নবীগণ কোনো ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যান না-এমন সাধারণ বক্তব্য কোরআনের আয়াতগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, আবু বকরের যুক্তি নবীদের জীবনাচরণ ও সুন্নাহর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। [৮]

উপসংহার

এই আলোচনার ভিত্তিতে শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ফাদাক ফায় হিসেবে মহানবী (সা.)-এর এখতিয়ারভুক্ত সম্পত্তি ছিল এবং তিনি আল্লাহর নির্দেশে তা হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-কে দান করেছিলেন।

এই ব্যাখ্যা অনুসারে, প্রথম খলিফা কর্তৃক ফাদাক ফিরিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এমন একটি যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যার যথার্থতা নিয়ে কোরআনের আয়াতের আলোকে আপত্তি উত্থাপন করা হয়। লেখকের মূল্যায়নে, এ পদক্ষেপের পেছনে আহলুল বাইত (আ.)-এর আর্থিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করার উদ্দেশ্যও ছিল।

এভাবে ফাদাকের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) ও আহলে বাইতের (আ.) প্রতি সংঘটিত অবিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে বলে শিয়া ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় বিবেচিত হয়। এ ঘটনার প্রভাব পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও মুসলিম সমাজের ইতিহাস ও চিন্তাধারায় প্রতিফলিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

১- পবিত্র কোরআন, সূরা আল-হাশর, আয়াত ৬–৭।

২- পবিত্র কোরআন, সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৬।

৩- মাজলিসি, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৯, পৃষ্ঠা ১২৩; মুহাদ্দিসি, জাওয়াদ, ফারহাঙ্গে গাদির, পৃষ্ঠা ৪৫৫।

৪- তাবারসি, আল-ইহতিজাজ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০; আল-ইখতিসাস, পৃষ্ঠা ১৮৩–১৮৫।

৫- ফারহাঙ্গে শিয়া, পৃষ্ঠা ৩৫৭।

৬- পবিত্র কোরআন, সূরা আন-নামল, আয়াত ১৬।

৭- পবিত্র কোরআন, সূরা মারইয়াম, আয়াত ৫–৬।

৮- উস্তাদি, রেজা, “ফাদাক” প্রবন্ধ, দানেশ নামে ইমাম আলী, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৮৬।

মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha