বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২৬ - ১৪:৪৩
বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপরই শক্তিশালী ইরান প্রতিষ্ঠিত

সর্বোচ্চ নেতা:

বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপরই শক্তিশালী ইরান প্রতিষ্ঠিত

দেশের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণ

বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একটি দেশের শক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কৌশলগত ভূমিকা পালন করে। এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে সর্বোচ্চ নেতা প্রতিভাবান ব্যক্তিদের সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধান, মৌলিক বিজ্ঞানের উন্নয়ন, উদ্ভাবন সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পখাতের সম্পর্ক জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপরই একটি শক্তিশালী ইরান প্রতিষ্ঠিত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হুসাইনি খামেনেয়ী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রতিভাবান ব্যক্তি, পদকজয়ী এবং তরুণদের উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়েছেন।

বার্তায় তিনি বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে কিশোর ও তরুণ প্রতিভাবানদের অনন্য অবদান এবং দেশের মধ্যে আশা, অগ্রগতি ও প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টিতে তাঁদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইরানকে আরও শক্তিশালী করার অন্যতম চাবিকাঠি হলো প্রতিভাবান ব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিক সীমা অতিক্রম করে নতুন সাফল্য অর্জন।

‘জ্ঞানই ক্ষমতা’-এই মৌলিক কৌশলগত নীতির আলোকে দেশের অগ্রগতির জন্য গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণ অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিভাবান ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা এবং সম্মিলিত মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।

সর্বোচ্চ নেতার বার্তার প্রধান বিষয়গুলো

১- বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর ইরানের শক্তি নির্ভরশীল।

২- গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণের প্রয়োজনীয়তা।

৩- দেশের অগ্রগতি ও শক্তি বৃদ্ধিতে প্রতিভাবানদের ভূমিকা।

৪- বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে পদকজয়ীদের সম্মাননা।

৫- বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার বিকাশ ও স্বীকৃতি।

৬- প্রতিভার নিয়ামতের প্রতি বাস্তব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

৭- দেশের সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগ।

৮- মৌলিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিজ্ঞানের উন্নয়ন।

৯- বৈজ্ঞানিক সীমা অতিক্রম এবং অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান।

১০- সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের পৃষ্ঠপোষকতা।

১১- বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা জোরদার করা।

১২- বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্প ও বাজারের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা।

১৩- জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি ও নতুন উদ্যোগের বিকাশ।

১৪- পানি, মাটি, খাদ্য ও জ্বালানির মতো কৌশলগত বিষয়ে গুরুত্বারোপ।

১৫- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তির বিকাশ।

১৬- নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিভাবানদের অংশগ্রহণ।

১৭- প্রতিভাবানদের হতাশ করা ও তাঁদের সক্ষমতা দুর্বল করার প্রচেষ্টার মোকাবিলা।

১৮- ইরানকে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা।

১৯- ফারসি ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক ভাষায় পরিণত করা।

২০- নতুন ইসলামী-ইরানি সভ্যতা প্রতিষ্ঠা।

সর্বোচ্চ নেতার পূর্ণ বার্তা

বিশ্বের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পদকজয়ীদের সম্মাননা জানাতে আয়োজিত ‘দেশপ্রেমিক পদকজয়ী’ অনুষ্ঠানে আজ রাতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হাজি আলী আকবারি সর্বোচ্চ নেতার যে বার্তাটি পাঠ করেছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো।

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।

কয়েকটি বর্ণনা অনুসারে, এই দিনগুলো জান্নাতের নারীদের নেত্রী, পবিত্র ও নিষ্পাপ মহীয়সী হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাতের দিনগুলোর সঙ্গে মিলে গেছে।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর শাহাদাতের সময়কাল আজও অজ্ঞাত রয়ে গেছে। একইভাবে, এই নূরানী সত্তার পবিত্র সমাধিস্থলের অবস্থানও গোপন রয়েছে। এমনকি তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও মহত্ত্বও মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে।

তিনি ছিলেন ইবাদত, আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে এক অনন্য আদর্শ। মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে বিশেষ ও সর্বাত্মক সহযোগিতা, আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর বেলায়াতের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ও নির্ভীক প্রতিরক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাদান, সময়ের দাবি উপলব্ধি, সত্যের পক্ষে সংগ্রাম, অবিচলতা এবং সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

ধৈর্য, আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ সেবা, সহমর্মিতা এবং সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির আদর্শ। স্ত্রী ও মা হিসেবে তাঁর ভূমিকা, সন্তানদের লালন-পালন এবং মানবজাতির পথপ্রদর্শক পবিত্র ইমামদের বংশধারা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনুকরণীয়।

প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, সংগ্রাম, পবিত্রতা, সৌন্দর্যবোধ, তাকওয়া, নূরানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। এক কথায়, তিনি ছিলেন সব ঈমানদার নারী ও পুরুষের জন্য আদর্শ।

ফাতিমি সমাজের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো, এটি ইরানের বিপ্লবী ও মুসলিম জনগণের সামনে বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন, সংগ্রাম ও জিহাদের ময়দানে উপস্থিতি, গণআন্দোলন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষা এবং বিনিময়হীন ও বিনয়পূর্ণ সেবার পথনির্দেশ তুলে ধরে।

ইরানের অগ্রগতিতে প্রতিভাবান ও তরুণদের ভূমিকা

আমাদের প্রিয় ইরান বর্তমান সময়ে ইচ্ছাশক্তি ও আশার এক বিশেষ প্রতীক। দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার পথে ইরানি প্রতিভাবান, মেধাবী ও সক্ষম তরুণদের ভূমিকা অনন্য।

তবে প্রতিভার পরিধি শুধু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, খেলাধুলা কিংবা বিভিন্ন দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিবাচক ও কাম্য যেকোনো ক্ষেত্রে অসাধারণ যোগ্যতা একজন মানুষকে প্রতিভাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

এই দিনগুলোতে আমরা আমাদের দেশের এমন কিছু শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতিভার প্রকাশ প্রত্যক্ষ করছি, যাঁরা বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্বদেশের পবিত্র পতাকাকে সমুন্নত রাখার জন্য সংগ্রাম করছেন। তাঁরা প্রজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব।

আমরা রিজআলি খাজভি ও আলি লান্দির মতো ব্যক্তিদেরও প্রতিভাবান হিসেবে বিবেচনা করি। তাঁদের নাম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশদ্বারে লেখা থাকা উচিত। এ ধরনের অনন্য ব্যক্তিত্বের মধ্যে রয়েছেন শহীদ ও আত্মত্যাগীরা, যাঁরা নিজেদের জীবন ও সুস্থতা বিসর্জন দিয়ে ইসলামী ইরান এবং এর প্রিয় জনগণের ভাগ্য গঠনে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। তাঁরা একমাত্র উপাস্য আল্লাহর কাছ থেকে আনুগত্যের পদক অর্জন করেছেন।

প্রথমেই এই সুযোগে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, ভূবিজ্ঞান, ভূগোল, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানবিক বিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে অর্জিত পদক, সম্মাননা ও সাফল্যের জন্য দেশের সকল প্রিয় নাগরিক এবং প্রত্যেক কৃতিত্ব অর্জনকারীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

একই সঙ্গে দেশের গৌরব, আশা ও অগ্রগতির অগ্রদূতদের প্রতি-কিশোর ও তরুণ প্রতিভাবান থেকে শুরু করে প্রশিক্ষক, শিক্ষক ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের-আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

দেশের পরিবর্তন ও অগ্রগতির জন্য প্রতিভাবানদের প্রেরণা ও আশা এমন এক উজ্জ্বল শিখা, যা আমি গত বহু বছর ধরে প্রত্যক্ষ করে আসছি। দেশের বিজ্ঞানচর্চা ও প্রতিভাবানদের বিশাল, আশাব্যঞ্জক অগ্রযাত্রা এবং বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁদের বারবার সাফল্য সমগ্র ইরানি জাতির জন্য গর্ব ও সম্মানের বিষয়।

সাম্প্রতিক দিন ও মাসগুলোতে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের অসাধারণ অবস্থান এবং নতুন রেকর্ড স্থাপন তাঁদের প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, ইচ্ছাশক্তি ও ঈমানের পরিচয় বহন করে।

যেসব খেলোয়াড় শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, নৈতিকতা, ঈমান ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে সব জাতির সামনে প্রিয় ইরানের শক্তি বৃদ্ধি করছেন এবং বিশ্বকে ইরানের সাহসী জাতির প্রাণচাঞ্চল্য দেখিয়ে দিচ্ছেন-তাঁরা প্রশংসার দাবিদার।

ইরানি নারীদের পোশাক ও শালীনতার গৌরবময় পরিচয় যেসব নারী খেলোয়াড় বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করে তুলছেন, যেসব পদকজয়ী ইরানি জনগণের হৃদয়ে আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করছেন এবং ইসলামী ইরানের গর্বিত পতাকাকে সম্মানিত করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি শক্তিশালী ইরান গঠনে অবদান রাখছেন।

প্রতিভা আল্লাহর নিয়ামত, এর যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য

বর্তমান সময় বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞান, গবেষণা এবং প্রাণচাঞ্চল্যের সময়। তাই জ্ঞানপিপাসু, দেশের প্রতিভাবান নাগরিক এবং ইরানের জ্ঞানী ব্যক্তিদের উদ্দেশে এ বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলা সমীচীন মনে করছি।

প্রতিভা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত এক নিয়ামত ও বিশেষ অনুগ্রহ। এর প্রধান ভিত্তি হলো মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা। ইরানের জনগণ, বিশেষ করে এ দেশের তরুণেরা, আল্লাহর দেওয়া এই বিশাল সম্পদের অধিকারী।

বিবেক ও আল্লাহর দাসত্বের দাবি হলো, মানুষ যেন আল্লাহর নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অন্তর, মুখের কথা এবং কাজ-কৃতজ্ঞতার এই তিনটি স্তর যথাযথভাবে পূরণ করা গেলে সেই নিয়ামতের পূর্ণতা অর্জনের পথ সুগম হয়।

প্রতিভার নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই করতে হবে। এরপর বাবা-মা, পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রব্যবস্থারও দায়িত্ব রয়েছে এই প্রতিভার বিকাশ ঘটানো এবং তা সঠিকভাবে কাজে লাগানোর পরিবেশ সৃষ্টি করা।

এই কারণে, প্রতিভাবান ব্যক্তিদের ওপর এই নিয়ামতের বাস্তব কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়িত্ব আরও বেশি। নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি দেশের ও সমাজের সমস্যার সমাধানে নিজেদের মেধাকে সর্বোত্তম উপায়ে কাজে লাগানো তাঁদের কর্তব্য।

শুধু উল্লেখযোগ্য মেধা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হওয়ার কারণে কেউ অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ক্ষণস্থায়ী ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে তাঁকে প্রকৃত অর্থে প্রতিভাবান বলা যায় না।

প্রকৃত প্রতিভাবান ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি নিজের মেধার বিকাশ নিয়ে চিন্তা করেন, সমাজে নিজের কার্যকর ভূমিকা নির্ধারণ করেন এবং একই সঙ্গে নিজের ও সমাজের উন্নতির জন্য তাঁর প্রতিভা ও সক্ষমতা কাজে লাগান।

দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানের প্রয়োগ

ইরানি প্রতিভাবানরা প্রমাণ করেছেন, জ্ঞান ও মেধাকে জনগণ এবং দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানের হাতিয়ারে পরিণত করা সম্ভব।

স্টেম সেল, ন্যানোপ্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে মহাকাশ ও বিমান প্রযুক্তি, শিল্প, খনি, চিকিৎসা, কৃষি, পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অবকাঠামো-বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁরা বিজ্ঞান, জ্ঞান ও নিজেদের প্রতিভাকে ব্যবহারিক কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। এই অগ্রগতির বাস্তব প্রভাব আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও দেখতে পাচ্ছি।

ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি টারবাইনের সাহায্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন, দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোতে জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করা, উত্তরাঞ্চলের কৃষিজমি, বাগান ও ধানখেতে কৃষিকাজের দক্ষতা বাড়াতে কৃষি ড্রোনের ব্যবহার, উন্নত রয়ান প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের সমস্যায় আক্রান্ত পরিবারে সন্তানের জন্ম, রেডিওফার্মাসিউটিক্যালসের সাহায্যে জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণমূলক উপগ্রহের মাধ্যমে ভূমি, পানি ও কৃষিপণ্যের নজরদারি এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি-এসবই এই বিশাল ও কল্যাণময় অগ্রযাত্রার কয়েকটি উদাহরণ।

এ ছাড়াও প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের বৈজ্ঞানিক সাফল্য বহুবার বিশ্বকে বিস্মিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

শক্তিশালী ইরানের ভিত্তি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা

শক্তিশালী ইরান বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সমীকরণে ইরানের ভূমিকা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এই সক্ষমতা।

অতএব, ইরানকে আরও শক্তিশালী করার চাবিকাঠি হচ্ছে দেশের বৈজ্ঞানিক সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রতিভাবানদের প্রচলিত সীমা অতিক্রম করা এবং নতুন পথ উন্মোচন করা।

ইসলামী ইরানের শত্রুরা যখন দেশটির বিজ্ঞানী ও প্রতিভাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়, তখন তা দেশের শক্তি বৃদ্ধিতে তাঁদের কার্যকর ভূমিকারই প্রমাণ বহন করে।

যে শত্রু দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় এবং তার বহু বছর আগেও আমাদের সমাজের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভাবানদের তাঁদের কর্মক্ষেত্র কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশে হত্যা করেছে, সে ইরানের অগ্রগতি ও শক্তি সহ্য করতে পারে না।

ইরানের প্রতিভাবানদের দুর্বল করার জন্য তারা হতাশা ছড়ানো থেকে শুরু করে তাঁদের চিন্তা ও মনোজগৎ দখল করা, নব্য উপনিবেশবাদের গ্রাসে তাঁদের বন্দি করা এবং পশ্চিমা লুণ্ঠন ও পুঁজিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার যন্ত্রের অংশে পরিণত করার মতো নানা উপায় ব্যবহার করে।

কিন্তু তারা ভুলে যায়, এই জাতির শহীদ বিজ্ঞানী, শিক্ষক, অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রক্তের প্রতিটি বিন্দু ইরানের অগ্রগতি ও ইচ্ছাশক্তির এক প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

ইরানি জাতি তার প্রাচীন সভ্যতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে অর্জিত গৌরব এবং বিশ্বের খ্যাতনামা জ্ঞানী ব্যক্তিদের কথা স্মরণ করে। একই সঙ্গে কাজার ও পাহলভি শাসনামলের প্রায় দুই শতাব্দীর গভীর পশ্চাৎপদতা ও ঐতিহাসিক নিষ্ক্রিয়তার কথাও তাদের মনে রয়েছে।

এই জাতি ‘আল-ইলমু সুলতান’-অর্থাৎ জ্ঞানই ক্ষমতা-এই বিজয়ী মৌলিক কৌশলগত নীতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে। পশ্চিমের বৈজ্ঞানিক আধিপত্য প্রত্যাখ্যান এবং গত তিন দশকে দেশের প্রতিভাবানদের দ্রুত বৈজ্ঞানিক ও গবেষণাগত অগ্রগতির ফলাফলও তারা জানে। এই অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমাদের মহান শহীদ নেতা-আল্লাহ তাঁর পবিত্র আত্মার মর্যাদা উন্নীত করুন-এর বিশেষ পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার ফল।

গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণ অপরিহার্য

বর্তমান সময় এবং তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের আগপর্যন্ত নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণের আহ্বান প্রতিভাবানদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় পরামর্শ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, এই নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণকে আরও গভীর ও দ্রুতগতির হতে হবে।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈজ্ঞানিক, গবেষণা ও প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইরানের প্রত্যেক প্রতিভাবান ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে ইসলামী ইরানের গৌরবময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য নিজেদের প্রধান দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হতে হবে।

এ ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

প্রথমত: মৌলিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিজ্ঞানের উন্নয়ন

দেশে মৌলিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিজ্ঞানের বিকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট, বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পরিকল্পনা থাকতে হবে।

পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতের মতো মৌলিক বিজ্ঞানের উন্নয়ন অন্যান্য বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক প্রযুক্তির ভিত্তি। এগুলো দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি।

যেসব জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে, তারা মৌলিক বিজ্ঞানের মাধ্যমেই সেখানে পৌঁছেছে। এসব বিজ্ঞানের উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে থাকা থেকে মুক্ত হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত: অজানা বিষয় অনুসন্ধান ও অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান

অনাবিষ্কৃত সত্য অনুসন্ধান, মৌলিক বিজ্ঞানের প্রচলিত সীমা অতিক্রম এবং এসব ক্ষেত্রে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাকে একটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে গণিতের মতো বিষয়ের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর প্রতি ধারাবাহিক মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

তৃতীয়ত: সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের বিকাশ

বৈজ্ঞানিক জাগরণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন।

সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক কল্পনাশক্তির বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এগুলো সব বা অধিকাংশ বিজ্ঞানক্ষেত্রে অগ্রগতি ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করার প্রধান উপাদান।

নতুন ধারণা উদ্ভাবন, নতুন কিছু সৃষ্টি ও আবিষ্কার এবং আগে কখনো চেষ্টা করা হয়নি এমন পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক সাহস ও ব্যক্তিগত এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে হবে।

যাঁরা কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্ভাবন করতে পারবেন, তাঁদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

চতুর্থত: বৈজ্ঞানিক স্বনির্ভরতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো

বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে স্বনির্ভরতা অর্জন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে, যাতে দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক পরিসরেও কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়।

অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ভিত্তি শক্তিশালী করার মাধ্যমে বিশ্বপরিসরে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করা সম্ভব।

পঞ্চমত: বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা

প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক বিষয়ের প্রতিভাবানদের সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পখাতের সংযোগ তৈরি করা এবং জ্ঞানভিত্তিক ব্যবসা ও উদ্যোগ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া সহজ করা জ্ঞানচর্চা ও প্রতিভার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে একই লক্ষ্যে পরিচালিত করা এবং প্রতিভাবান ব্যক্তি, বৈজ্ঞানিক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নতুন উদ্যোগের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, জ্ঞান উৎপাদন থেকে শুরু করে তার ব্যবহার ও ভোগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় সরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা থাকতে হবে।

পানি, মাটি, খাদ্য ও জ্বালানির মতো বর্তমান ও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের সমন্বয় জরুরি। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের পরীক্ষাগারে অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজ সরাসরি কর্মশালা ও কারখানার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

দ্রুত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন অর্থনৈতিক সুবিধা এবং পণ্য ও সেবা বাণিজ্যিকীকরণের বাজারব্যবস্থা প্রতিভাবানদের প্রেরণা ও ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে যুক্ত হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পখাত এবং ভোক্তাবাজারের স্থায়ী ও ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

ষষ্ঠত: নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিভাবানদের অংশগ্রহণ

বিশ্ববিদ্যালয় ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক শাখার প্রতিভাবানদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের পর্যায়ে সরাসরি এবং কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। এটি দেশের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিভাবানদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি এবং সম্মিলিত প্রজ্ঞাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানো।

ইরানকে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা

যদি এই পথ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়, তাহলে বিশেষ করে মৌলিক বিজ্ঞানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ও প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে ইরানে স্থানান্তরিত হবে।

অদূর ভবিষ্যতে ইরান বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রজ্ঞাবান ও শহীদ নেতা-আল্লাহ তাঁর মর্যাদা সমুন্নত করুন-এর পূর্বোক্ত লক্ষ্যও বাস্তবায়িত হবে: ফারসি ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক ভাষায় পরিণত করা।

ইনশাআল্লাহ, প্রতিভাবানদের মধ্য থেকে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের রক্তের বরকত এবং আমাদের নেতা ও মাওলা হযরত ইমাম মাহদি (আ.)-এর পবিত্র দোয়ার কল্যাণে দেশের প্রতিভাবান ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণ বাস্তবায়িত হবে।

এর মাধ্যমে ইরান ক্রমাগত আরও শক্তিশালী হয়ে সর্বাঙ্গীণ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে এবং নতুন ইসলামী-ইরানি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

সাইয়্যেদ মোজতবা হুসাইনি খামেনেয়ী

তারিখ: ৪ আবান ১৪০৫ হিজরি শামসি (২৬ অক্টোবর ২০২৬)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha