সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ - ১৪:২৮
ইসলামী সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রসারে ইরানের অবদানের প্রশংসা করলেন আয়াতুল্লাহ সিস্তানির প্রতিনিধি

আয়াতুল্লাহ সিস্তানির প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ জাওয়াদ শাহরেস্তানি সমাজ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিকাফের সংস্কৃতি প্রসারে সুসংগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ইতিকাফ সদর দপ্তরের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তাকিয়েই আয়াতুল্লাহ সিস্তানির প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ জাওয়াদ শাহরেস্তানির সঙ্গে এক সাক্ষাতে জাতীয় ইতিকাফ সম্মেলন, আন্তর্জাতিক ইতিকাফ উৎসব এবং শহীদ ইমামের কৌশল ও পুনর্জাগরিত উম্মাহর দায়িত্বকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত বছরের স্লোগান সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

সাক্ষাতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন শাহরেস্তানি ইসলামী সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রসারে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ক্ষেত্রে ইরান বহু গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও কল্যাণকর অবদান রেখেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ইতিকাফ সদর দপ্তর বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ইতিকাফের সংস্কৃতি বিস্তার এবং সমাজে এর আধ্যাত্মিক প্রভাব সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আয়াতুল্লাহ সিস্তানির প্রতিনিধি ইতিকাফ অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনঅংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় ইতিকাফে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এটি প্রমাণ করে যে, এ আধ্যাত্মিক আন্দোলন সমাজে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের অনুসারীদের মধ্যে আহলে বাইত (আ.)-এর আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রভাবের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইসলামী শিক্ষার সঠিক পরিচিতি দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, আধ্যাত্মিকতা এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে এবং তাঁদের আহলে বাইত (আ.)-এর জ্ঞান ও শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বিভিন্ন দেশের কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ওই সাক্ষাতে একজন রাষ্ট্রদূত হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর পবিত্র মাজারে নিজের উপস্থিতি এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র মাটির মাধ্যমে তাবাররুক গ্রহণের আধ্যাত্মিক প্রভাব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে, আহলে বাইত (আ.)-এর মাযহাবের আধ্যাত্মিক শক্তি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পটভূমির মানুষের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি দোয়া ও আহলে বাইত (আ.)-এর জ্ঞানগত ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে সহিফায়ে সাজ্জাদিয়াকে ইসলামী বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিভিন্ন দেশের আলেম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ গ্রন্থের প্রভাবের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি এর শিক্ষাকে আরও ব্যাপকভাবে পরিচিত করার আহ্বান জানান।

শাহরেস্তানি বলেন, আহলে বাইত (আ.)-এর মাযহাবে আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সম্পদ রয়েছে। এসব শিক্ষা যথাযথ ও কার্যকর পদ্ধতিতে সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারলে বহু মানুষ তা দ্বারা প্রভাবিত হবেন। পার্শ্ববর্তী ও গৌণ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত না থেকে ইসলামের প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা এবং মৌলিক শিক্ষার পরিচিতি প্রসারে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিকাফের প্রসারের আহ্বান

সাক্ষাতের অন্য অংশে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিকাফের কার্যক্রম সম্প্রসারণকে জরুরি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইতিকাফের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও এ আধ্যাত্মিক আন্দোলন সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

তিনি ইরাক, লেবানন এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশের বিদ্যমান সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিকাফ বিস্তারের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আহলে বাইত (আ.) বিশ্বসংস্থা, ইসলামী মাজহাবসমূহের মধ্যে নৈকট্য প্রতিষ্ঠার বিশ্বসংস্থা, আল-মুস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র দরবারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

এ ছাড়া ইতিকাফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি এ আধ্যাত্মিক আন্দোলনের মৌখিক ইতিহাস সংকলনের আহ্বান জানান। বিগত কয়েক দশকে ইতিকাফের সংস্কৃতি প্রসারে যেসব ব্যক্তিত্ব ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

সাক্ষাতের শেষে কেন্দ্রীয় ইতিকাফ সদর দপ্তরের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে তিনি আধ্যাত্মিকতা এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার প্রচারে তাঁদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য সাফল্য কামনা করেন।

গত বছর ইতিকাফে অংশগ্রহণকারীদের ৭০ শতাংশই ছিল কিশোর ও তরুণ

সাক্ষাতে কেন্দ্রীয় ইতিকাফ সদর দপ্তরের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তাকিয়েই ইতিকাফ অনুষ্ঠানের মানোন্নয়নে গৃহীত বিষয়বস্তু ও কর্মসূচিভিত্তিক পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ আয়োজনে কিশোর ও তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে তাঁদের চিন্তাগত, জ্ঞানগত ও শিক্ষামূলক প্রয়োজনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

সাক্ষাতে উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ইতিকাফ অনুষ্ঠানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন কিশোর ও তরুণ।

এ সময় কেন্দ্রীয় ইতিকাফ সদর দপ্তরের উপপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক ইতিকাফ ফাউন্ডেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকের তাকিয়েই বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং ইতিকাফের সংস্কৃতি প্রচারে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রতিবেদন দেন।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ইতিকাফ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ইতিকাফের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ কর্মদল গঠন করা হয়েছে। চারটি মহাদেশের প্রায় ২৩টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এ কর্মদল কাজ করছে। এর মাধ্যমে প্রতিরোধ অক্ষভুক্ত দেশগুলো, ভারত, রাশিয়া এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

তিনি ইতিকাফকে বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা পরিচিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ইতিকাফ সদর দপ্তরের একাডেমিক বোর্ডের সদস্য হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন লুতফি নিয়াসের একাদশ জাতীয় ইতিকাফ সম্মেলনের পরিকল্পনা ও আয়োজনের মান সম্পর্কে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তিনি সম্মেলনে গঠিত বিভিন্ন কর্মদল এবং বাস্তবায়িত বৈজ্ঞানিক ও বিষয়বস্তুসংক্রান্ত কার্যক্রমের বিবরণ তুলে ধরেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha