সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ - ১৬:১৫
মিসরীয় লেখকের দৃষ্টিতে আরব জনমতের সঙ্গে ইরানের উল্লেখযোগ্য ঐকমত্যের কারণ

মিসরীয় লেখকের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, আরব ও ইসলামী বিশ্বের জনগণ ইরানের পাশে অবস্থান নিয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং এর ফলে অঞ্চল ও বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আরাবি২১’ মিসরের বিশিষ্ট লেখক ও বিশ্লেষক এবং দৈনিক আল-আহরামের সাবেক প্রধান সম্পাদক আবদুন নাসের সালামার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। ওই নিবন্ধে আরব ও মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক জনমতের ইরানের প্রতি সমর্থনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী শত্রুর সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরান সামগ্রিকভাবে ইসলামী জনমত এবং বিশেষ করে আরব জনমতকে নিজের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছে-এ বিষয়টি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

আঞ্চলিক যুদ্ধে আরব জনগণের ইরানের প্রতি ব্যাপক সমর্থন

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের সরাসরি যুদ্ধের সময়ই শুধু নয়, বরং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধেও আরব ও মুসলিম জনগণের জনমতে ইরানের প্রতি সমর্থন স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এ বিষয়টি সমর্থনের কারণ নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের বিরুদ্ধে ইরানের অবস্থানের প্রতি আরব ও ইসলামী জনগণের ঝোঁক স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। এর কারণগুলোও পরিচিত ও যুক্তিসংগত। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন।

ইরানবিরোধী জনমত গঠনে উপসাগরীয় শাসকদের প্রচারব্যবস্থার ব্যর্থতা

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আরব দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচারমাধ্যম কিংবা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোসহ অন্যান্য আরব দেশের রাজধানী থেকে প্রকাশিত সরকারি বিবৃতি ও ঘোষণাগুলো আরব ও মুসলিম জনগণের ইরানপন্থী অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেনি। বিভিন্ন মাধ্যমে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণ এ সমর্থন প্রকাশ করছে।

এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে আসে। শত শত আরবি সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, ওয়েবসাইট, সরকারি কমিটি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও আরব জনগণের মধ্যে ইরানের প্রতি যে সমর্থন তৈরি হয়েছে, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আরব দেশগুলোর গণমাধ্যমব্যবস্থা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে, আরব জনমত কীভাবে ইরানের পক্ষ নিয়েছে-ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের হামলার ক্ষেত্রেও এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে হামলার ক্ষেত্রেও।

লেখকের মতে, আরব বিশ্বজুড়ে ইরান যে জনসমর্থন অর্জন করেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অথচ শত শত আরবি সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইরান এবং এ অঞ্চলের প্রতিরোধ অক্ষের মিত্রদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

আরব জনমতের সঙ্গে ইরানের ঐকমত্যের উল্লেখযোগ্য কারণ

নিবন্ধে আরব জনমতের ইরানের প্রতি সমর্থনের কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে:

প্রথমত: ইহুদিবাদী শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের অবস্থান ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন।

লেখকের মতে, অপারেশন ‘তুফান আল-আকসা’র আগে এবং গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের কয়েক বছরব্যাপী গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময়-উভয় ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতি ইরানের সমর্থন আরব জনগণের জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

তেল আবিব এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনের অন্যান্য শহর, বিমানবন্দর ও ইসরাইলি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ব্যাপক হামলার পর এ সমর্থন আরও জোরদার হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, আরব দেশগুলোতে গণমাধ্যম ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিন বিষয়ে জনগণের বিশ্বাস পরিবর্তনের ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো হলেও ফিলিস্তিন ইস্যু এখনো আরব নাগরিকদের কাছে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।

দ্বিতীয়ত: আরব দেশগুলোতে মার্কিন ও পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির বিরোধিতা।

আরব দেশগুলোর নাগরিকরা সাধারণত নিজেদের দেশে মার্কিন ও পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির বিরোধিতা করেন। বিশেষ করে এমন অকাট্য প্রমাণ থাকার কারণে তাঁদের বিরোধিতা আরও জোরালো হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায়, এসব ঘাঁটি ইহুদিবাদী শত্রুর স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ ছাড়া এসব সামরিক ঘাঁটির যাবতীয় ব্যয় উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারি কোষাগার ও সম্পদ থেকে বহন করা হয়। অথচ মার্কিন চাপের কারণে ফিলিস্তিন ইস্যুতে এসব দেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তৃতীয়ত: ইহুদিবাদী শত্রুর সঙ্গে আরব শাসকদের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ।

আরব শাসকদের, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসকদের সঙ্গে ইহুদিবাদী শত্রুর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া আরব জনগণের মধ্যে এসব শাসকের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

ফলে যে দেশই ইহুদিবাদীদের বিপরীত অবস্থানে দাঁড়ায়, আরব জনমতে সে দেশ আগাম সমর্থন অর্জন করে এবং জনগণের কাছে নায়কের মর্যাদা পায়।

চতুর্থত: মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের উপস্থিতিকে অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে দেখা।

লেখকের মতে, সব সূচকই ইঙ্গিত করে যে, পশ্চিমা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে এ অঞ্চলে অবৈধ ও দখলদার ইহুদিবাদী সত্তার অব্যাহত উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ।

তাই ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে যেকোনো যুদ্ধে আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনগণ ইরানের পাশে অবস্থান নেয়।

পঞ্চমত: সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী হিসাব-নিকাশভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা।

লেখকের মতে, আরব জনগণ সাধারণভাবে ভ্রাতৃপ্রতিম জাতিগুলোর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত বিভাজন কিংবা বর্ণবাদী হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে গৃহীত রাজনৈতিক অবস্থান মেনে নেয় না।

এ কারণে ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন কিংবা অন্য কোথাও সামরিক হস্তক্ষেপকে জনগণ অবিবেচনাপ্রসূত ও অজনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখে; যেন আগুন নিয়ে খেলা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে শাসকদের তৈরি করা কৃত্রিম সংকটের ব্যাপারে আরব জনগণ উদাসীন। এমনকি পবিত্র মক্কা ও মদিনার নাম ব্যবহার করা হলেও তারা এ ধরনের যুদ্ধ সমর্থন করে না।

ষষ্ঠত: সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ।

লেখক মনে করেন, আরব ও মুসলিম জনগণের মধ্যে সৌদি আরবের প্রতি যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রধান কারণ উপেক্ষা করা উচিত নয়।

তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে তথাকথিত সংস্কার কার্যক্রমের নামে দুর্নীতি ও উচ্ছৃঙ্খলতার বিস্তার এবং পশ্চিমা বিতর্কিত সংগীতশিল্পীদের উপস্থিতি এ ক্ষোভের কারণ। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র দুই স্থান-মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববির মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী।

উপসংহারে লেখক মনে করেন, এসব কারণেই সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আরব ও মুসলিম জনমতকে নিজের অবস্থানের সঙ্গে ব্যাপকভাবে একাত্ম করতে সক্ষম হয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha