সোমবার ১৭ মার্চ ২০২৫ - ২০:৫০
ইমাম হাসান(আঃ) ও মুয়াবিয়ার সন্ধি:উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য

ইমাম হাসান (আঃ) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় ইমাম। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা: আ)-এর বড় নাতি এবং আমিরুল মু'মিনিন ইমাম আলী (আঃ) ও ফাতিমাতুয যাহরা (আঃ)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

ইমাম হাসান (আঃ)-এর বংশ পরিচয়:

ইমাম হাসান (আঃ) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় ইমাম। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা: আ)-এর বড় নাতি এবং আমিরুল মু'মিনিন ইমাম আলী (আঃ) ও ফাতিমাতুয যাহরা (আঃ)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র।

নাম: হাসান ইবনে আলী ইবনে আবু তালিব
কুনিয়া (উপনাম): আবু মুহাম্মদ
উপাধি: আস-সিবত (নবীজির দৌহিত্র), আল-মুজতাবা (মনোনীত)
জন্ম: ১৫ রমজান, ৩ হিজরি (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) – মদিনা
শহাদাত: ২৮ সফর, ৫০ হিজরি (৬৭০ খ্রিস্টাব্দ) – মদিনা (স্ত্রী  বিষ প্রয়োগ করেন বলে বর্ণিত)

ইমাম হাসান (আঃ)-এর শাসনভার গ্রহণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
৪০ হিজরিতে ইমাম আলী (আঃ)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হাসান (আঃ) মুসলমানদের খলিফা হিসেবে বাইআত গ্রহণ করেন। কিন্তু সে সময় মুসলিম সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বিভাজন তৈরি হয়েছিল। সিরিয়ার শাসক মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ইসলামী রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য ইমাম হাসান (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

ইমাম হাসান (আঃ) কেন মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন?

ইমাম হাসান (আঃ) মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইলেও তার অনুসারীরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—কিছু সংখ্যক বিশ্বস্ত, আবার অনেকে কেবল পার্থিব স্বার্থের কারণে তার পাশে ছিল। অনেকেই লোভ ও ভয় থেকে মুয়াবিয়ার পক্ষে চলে গিয়েছিল। এ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে গেলে মুসলিম সমাজে ব্যাপক রক্তপাত এবং ইসলামি ঐক্যের ক্ষতি হতো। ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এবং উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি এড়াতে ইমাম হাসান (আঃ) মুয়াবিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হন।

ঐতিহাসিক উৎসগুলির মধ্যে শান্তি চুক্তির বিধিগুলির সারাংশ এইভাবে উপস্থাপিত:

১. খেলাফত মাওয়িয়ার হাতে হস্তান্তর করা হবে, এই শর্তে যে তিনি আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ এবং সৎ খলিফাদের পন্থা অনুসরণ করবেন।
২. মাওয়িয়া তার জন্য কোনো উত্তরাধিকারী নির্বাচন করতে পারবেন না এবং তার পরবর্তী খেলাফত হাসান এবং পরে হোসেনকে প্রদান করা উচিত।
৩. সব মানুষ, যে কোনো বর্ণ বা জাতি থেকে আসুক, পূর্ণ নিরাপত্তা পাবে।
৪. মাওয়িয়া নিজেকে আমিরুল মুমিনিন (বিশ্বস্ত নেতা) হিসেবে অভিহিত করতে পারবেন না।
৫. মাওয়িয়ার উপস্থিতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না।
৬. মাওয়িয়া আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-কে গালিগালাজ করবেন না।
৭. যেকোনো অধিকারী ব্যক্তির অধিকার তাকে পৌঁছে দেওয়া হবে।
৮. আলী (আ.)-এর শিয়া অনুসারীরা যেখানেই থাকুক, তারা নিরাপদ থাকবে এবং মাওয়িয়া তাদের প্রতি আক্রমণ করবে না।
৯. যেসব ব্যক্তি পূর্বতন যুদ্ধগুলো(যেমন, জামাল ও সিফিন)তে আলী (আ.)-এর সৈন্য ছিলেন এবং নিহত হয়েছেন, তাদের সন্তানদের মধ্যে এক মিলিয়ন দিরহাম বিতরণ করবে।
১০. কুফার (অথবা ইরাকের) সরকারি কোষাগারের অর্থসম্পদ হাসান বিন আলীকে প্রদান করবে এবং প্রতি বছর ১০০,০০০ দিরহাম (বা কিছু মত অনুযায়ী এক মিলিয়ন দিরহাম) তাকে দেবে।
১১. মাওয়িয়া কখনও হাসান, হোসেন এবং রাসূলের পরিবারের কোনো সদস্যের প্রতি প্রকাশ্যে বা গোপনে অবিচার করবে না এবং তাদের নিরাপত্তার কোনো রকম বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না।

 ইমাম হাসান (আঃ)-এর সন্ধির শিক্ষা ও তাৎপর্য:

১. ইসলাম রক্ষার জন্য ত্যাগ:
ইমাম হাসান (আঃ) প্রমাণ করেন, ক্ষমতার চেয়ে ইসলামি মূল্যবোধ ও উম্মাহর ঐক্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

২. শান্তি ও সংহতির বার্তা:
এই চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম সমাজে কিছু সময়ের জন্য হলেও রক্তপাত বন্ধ হয়েছিল এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

৩. আহলে বাইতের (আঃ) মর্যাদা প্রতিষ্ঠা:
ইমাম হাসান (আঃ) দেখিয়ে দেন, তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভে নন, বরং ইসলামের স্বার্থে কাজ করেন।

৪. ন্যায় ও সত্যের পথ:
যদিও মুয়াবিয়া পরে চুক্তি ভঙ্গ করে, তবুও ইমাম হাসান (আঃ) ইসলামের সত্য-ন্যায়ের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

উপসংহার:

ইমাম হাসান (আঃ)-এর মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি ছিল মূলত ইসলামী উম্মাহকে রক্ষা করার জন্য এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো কখনো আপাত দৃষ্টিতে পিছু হটাও বড় বিজয় হতে পারে। তার এই ত্যাগ ও বিচক্ষণতা মুসলিম বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং তাঁর উদারতা ও বিচক্ষণতা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে ই চিরকাল রয়ে যাবে।

লেখক: কবির আলী তরফদার কুম্মী।
তারিখ: ১৭/০৩/২০২৫

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha