শুক্রবার ২১ মার্চ ২০২৫ - ১২:৪৯
হযরত আলী (আ.)-এর জীবনের কিছু উজ্জ্বল দিক  

হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদত দিবস, তাঁর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও জীবনীকে গভীরভাবে বুঝার একটি উত্তম সুযোগ। তাঁর পরিচয়ের উৎস হলো কুরআন, রাসূলুল্লাহ (সা.), আহলে বাইত, সাহাবায়ে রাসূল এবং তাঁর নিজের জীবন ও চরিত্র।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর ব্যাপক ব্যক্তিত্ব শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য আদর্শ নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্যও আদর্শ। তাঁর মানবীয় পূর্ণতা, নৈতিক গুণাবলী এবং পবিত্র জীবন মানব ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়, যার সাক্ষী রয়েছে পবিত্র কুরআন, রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, মুহাদ্দিসিন এবং ঐতিহাসিকগণ। তাঁদের দৃষ্টিতে হযরত আলী (আ.)-এর গুণাবলী ও মর্যাদা সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থিত।

হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদত দিবস, তাঁর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও জীবনীকে গভীরভাবে বুঝার একটি উত্তম সুযোগ। তাঁর পরিচয়ের উৎস হলো কুরআন, রাসূলুল্লাহ (সা.), আহলে বাইত, সাহাবায়ে রাসূল এবং তাঁর নিজের জীবন ও চরিত্র।

আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্যের সমস্ত সময়ের ইতিহাস অধ্যায়ন করুন। শৈশবের সেই পরিবেশ, যেখানে ইসলামের নবী (সা.)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাঁর লালন-পালন ও শিক্ষা হচ্ছিল। কৈশোরের সময়কাল, মক্কায় নবুয়তের সূচনা এবং আল্লাহর দিকে আহ্বানের শুরুর সময়, যা কঠিনতা ও সমস্যায় পূর্ণ ছিল। যৌবনে মদিনায় ইসলামী সমাজের প্রতিষ্ঠা, ইসলামের প্রসার ও বিকাশ, যুদ্ধ ও সংগ্রাম এবং বিজয় ও সাফল্যে তিনি ছিলেন প্রথম সারির যোদ্ধা ও সেনাপতি।  

আরব উপদ্বীপে ইসলামের পতাকা দেখা দেয়, অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর রহমতের মেহমান হন। ইসলামের অস্তিত্ব ও মুসলমানদের কল্যাণের জন্য পরামর্শ ও পথনির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন। এরপর পাঁচ বছর খিলাফতের দায়িত্বে থেকে তিনি ন্যায়বিচার ও ইসলামী মূল্যবোধের একটি উৎকৃষ্ট নমুনা উপস্থাপন করেন। খ্রিস্টান গবেষক জর্জ জুরদাক তাঁর খিলাফতকে "সাওতুল আদালাতিল ইনসানিয়্যাহ" বা মানবতার ন্যায়বিচারের আহ্বান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।  

তাঁর জীবন সংগ্রাম, ইবাদত, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, রাসূলের আনুগত্য, ধর্মের সংরক্ষণ এবং ইসলামের প্রচারে পরিপূর্ণ। মসজিদে শাহাদতবরণের সময় "ফুজতু বিরাব্বিল কা'বা" (আমি কাবার প্রভুর কসম সফলতা অর্জন করেছি) বলে তিনি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তা হলো, এই সমস্ত অমর ও মহান সংগ্রাম ও ত্যাগের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সাথে শাহাদতের মাধ্যমে সাক্ষাৎ করা।  

ইমাম আলী (আ.)-এর জন্ম আল্লাহর ঘর কাবায় হয়েছিল এবং আল্লাহর ঘরেই তিনি শাহাদতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তাঁর জন্ম ও শাহাদতের মধ্যবর্তী জীবনও ছিল আল্লাহর ইবাদত, আনুগত্য ও তাঁর পথে নিবেদিত। অর্থাৎ, আলী (আ.) হলেন একজন পূর্ণ ও সফল মানুষের সর্বোচ্চ উদাহরণ।  

তাঁর দৃষ্টি বাহ্যিক সাফল্যের দিকে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, রাসূলের আনুগত্য এবং ধর্মের সংরক্ষণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি ঐশী ও মানবীয় মূল্যবোধ ও নীতিকে সামনে রেখে জীবনযাপন করেছেন।  

তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, নৈতিক ও সামাজিক জীবন সবই কুরআন ও রাসূলের জীবনীর একটি পূর্ণ ও বাস্তব নমুনা। কারণ, শৈশব থেকেই তিনি নবীর সান্নিধ্যে লালিত-পালিত হয়েছেন। কুরআন নাজিলের সময় থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত ওহীর আলোয় তাঁর অস্তিত্ব আলোকিত ও উদ্ভাসিত হয়েছে। তিনি সারাজীবন রাসূলের ছায়াসঙ্গী হিসেবে থেকেছেন। তাই তাঁর মর্যাদা, গুণাবলী, পূর্ণতা ও ত্যাগও সকলের চেয়ে উজ্জ্বল। নবীজির পর তিনি জ্ঞান, তাকওয়া, সাহস, দানশীলতা এবং অন্যান্য নৈতিক গুণাবলীতে উম্মতের মধ্যে একটি বিশেষ স্থান লাভ করেছেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক অঙ্গন।  

তিনি তাঁর খিলাফতকালে শাসনকার্যের এমন একটি ঐতিহাসিক নমুনা উপস্থাপন করেছিলেন যে, মালিক আশতারের নামে লেখা চিঠি (আইন-ই-শাসন) আন্তর্জাতিক সনদের অংশ হয়ে গেছে।  

বিশ্বে ক্ষমতার জন্য ইসলামী ও মানবীয় নীতি পদদলিত করা হয়। রাজনীতিতে কোনো ঐশী বা মানবীয় ও নৈতিক মানদণ্ড নেই। বিরোধিতায় সব সীমা অতিক্রম করা, মিথ্যা কথা বলা, অপবাদ দেওয়া, অপমান করা, কয়েকটি মুদ্রার বিনিময়ে বিবেক বিক্রি করা, কালোকে সাদা এবং সাদাকে কালো বানানো সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতা, সম্পদ ও খ্যাতির জন্য কোনো নৈতিক নীতির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় না।  

কিন্তু হযরত আলী (আ.)-এর জীবন, শাসননীতি, বন্ধু ও শত্রুর সাথে সম্পর্কের পদ্ধতি, ক্ষমতাকে লক্ষ্য না বরং মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা এবং সবকিছুতেই ন্যায়বিচারকে মানদণ্ড হিসেবে স্থাপন করা এসব নীতি ইসলামী সমাজ তাঁর কাছ থেকে শিখতে পারে।  

এই কারণেই তাঁকে "শহীদে আদালত" বা ন্যায়বিচারের শহীদ বলা হয়। তিনি ক্ষমতার জন্য ইসলামী ও শরয়ী নীতির বিনিময় করেননি, বরং সর্বদা নীতির উপর অটল থেকেছেন।  

তিনি উম্মতকে ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন। এজন্যই মুসলিম চিন্তাবিদগণ তাঁকে ঐক্যের জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে ইসলাম ও উম্মতের কল্যাণ ও স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। এবং যেকোনো ধরনের বিভেদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আলীর ঐক্যের শিক্ষা আজ

উম্মতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। এই ঐক্য শুধুমাত্র ইসলাম ও মুসলমানদের জন্যই ছিল। আমরাও তাঁর কাছ থেকে ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা নিয়ে ধর্মীয়, জাতিগত ও ভাষাগত বিভেদ দূর করে একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারি।  

আল্লাহ আমাদেরকে হযরত আলী (আ.)-এর জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন!

রিপোর্ট: হাসান রেজা

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha