হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইমাম আলী(আঃ) বলেন:
فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ
কাবার রবের কসম! আমি সফল হয়েছি।
ভূমিকা:
ইসলামের ইতিহাসে ইমাম আলী (আ.)-এর খেলাফত একটি অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে ন্যায়বিচার, সমতা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতি তার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থকে ইসলামের কল্যাণের ওপরে স্থান দেননি। তার খেলাফতি সময়কাল মুসলিম উম্মাহর জন্য ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ:
খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাহাদাতের পর জনগণের দাবির মুখে ৩৫ হিজরিতে ইমাম আলী (আ.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু এই দায়িত্ব তিনি কোনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকে নেননি বরং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও ইসলামি মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেন।
তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সময় বলেন:
"তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও এবং অন্য কাউকে খুঁজে নাও, কারণ আমরা এমন এক সময়ে পড়েছি যখন পরিস্থিতি উত্তাল এবং হৃদয় ব্যথিত।"
ন্যায়বিচার ও সমতার নীতি:
ইমাম আলী (আ.)-এর শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। তিনি ধনী-গরিব, আত্মীয়-পর, মুসলিম-অমুসলিম সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করেছেন।
একবার তার খেলাফতের সময় এক ইহুদি ব্যক্তির সাথে ইমাম আলী (আ.)-এর একটি বিতর্ক হয়। বিচারক ইমাম আলী (আ.)-কে তার উপাধি "আমিরুল মু’মিনিন" বলে সম্বোধন করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, "বিচারকের সামনে বিচারপ্রার্থীদের সমান হওয়া উচিত।"
শাসক ও জনগণের সমান অধিকার।
কুফায় থাকাকালীন একদিন ইমাম আলী (আঃ) দেখলেন, এক বৃদ্ধ ভিক্ষা করছে। তিনি জানতে চান, এমন কী হলো যে, এই বৃদ্ধকে ভিক্ষা করতে হচ্ছে? পরে জানা যায়, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত খ্রিস্টান কর্মী। ইমাম আলী (আঃ) নির্দেশ দিলেন: যতদিন সে কাজ করতে সক্ষম ছিল, তাকে কাজে লাগানো হয়েছে। এখন সে অক্ষম হয়ে পড়েছে, তাই তার জীবনযাত্রার ব্যয় সরকার বহন করবে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান:
ইমাম আলী (আ.) কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। তার শাসনামলে সংঘটিত জামাল, সিফফিন ও নাহরওয়ান যুদ্ধ ছিল তার ন্যায়বিচারের দৃঢ় অবস্থানের প্রমাণ।
তিনি বলেন: আমি যে পর্যন্ত দিন রাত আসে এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।
সরল জীবনযাপন:
শাসক হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আলী (আ.)-এর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সহজ ও বিনয়পূর্ণ। তিনি নিজ হাতে কাজ করতেন, কষ্টার্জিত অর্থ দ্বারা জীবন নির্বাহ করতেন। জনগণের কষ্ট লাঘব করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
তিনি বলেন: আল্লাহ আমাকে এই খেলাফতের মাধ্যমে পরীক্ষা নিচ্ছেন, আমি যেন মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারি এবং জালিমের হাত রুখে দিতে পারি।
ইমাম (আঃ) এর জীবনী থেকে আমাদের জন্য খুবই বড়ো ও উত্তম শিক্ষা হচ্ছে ,আমাদের সমাজে যারা সেবক ও শাসক তাদের উচিত এমন ভাবে সহজ সরল জীবনযাপন করা ও জনগণের কষ্ট লাঘব করা।
ইমাম আলী (আ.)-এর উইল: আদর্শ শাসকের উপদেশ
ইমাম আলী (আ.) যখন ইবনে মুলজিমের আঘাতে আহত হলেন, তখন তিনি তার সন্তান ইমাম হাসান (আঃ)-এর প্রতি শেষ উপদেশসমূহ:
১. হে আমার পুত্র! চারটি বিষয়ে যত্নবান হও, এগুলোর প্রতি আমল করলে কখনো ক্ষতির সম্মুখীন হবে না:
(ক) বুদ্ধিমত্তা সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ।
(খ) মূর্খতা সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য।
(গ) অহংকার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গতা।
(ঘ) মহানুভবতা ও উত্তম চরিত্র সর্বোত্তম মর্যাদা।
২. উপরোক্ত চারটি বিষয়ের ছায়ায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোও মেনে চলবে:
(ক) মূর্খ ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব কোরো না, কারণ সে তোমার উপকার করতে চাইলেও তোমার ক্ষতি করবে।
(খ) মিথ্যাবাদীর সঙ্গে সখ্যতা থেকো না, কারণ সে দূরকে তোমার কাছে এবং কাছে থাকা জিনিসকে দূরবর্তী করে উপস্থাপন করবে।
(গ) কৃপণ ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব কোরো না, কারণ যখন তোমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে, তখন সে তোমাকে বঞ্চিত করবে।
(ঘ) পাপীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকো না, কারণ সে তোমাকে সামান্য বিনিময়ে বিক্রি করে দেবে।
৩. আমি তোমাদেরকে আল্লাহর তাকওয়া (ভয় ও পরহেজগারি) অবলম্বন করার وصিয়ত করছি এবং দুনিয়ার পেছনে ছুটো না, যদিও দুনিয়া তোমার দিকে ধাবিত হয়।
৪. দুনিয়া থেকে যা হারিয়ে যায়, তার জন্য দুঃখিত হয়ো না।
৫. সর্বদা সত্য কথা বলো এবং আখিরাতের পুরস্কারের জন্য কাজ করো।
৬. জালিমের শত্রু ও মজলুমের সাহায্যকারী হও।
৭. এতিমদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো, যেন তারা অভুক্ত না থাকে এবং তোমাদের উপস্থিতিতে তারা ধ্বংস না হয়।
৮. কুরআনের প্রতি যত্নবান হও, যেন অন্যরা আমলে তোমাদের থেকে অগ্রগামী না হয়।
৯. নামাজের ব্যাপারে সতর্ক থাকো, কারণ এটি তোমাদের দ্বিনের স্তম্ভ।
১০. আল্লাহর ঘর (কাবা) সম্পর্কে যত্নবান হও, যতদিন বেঁচে থাকো, এটিকে খালি রেখো না। যদি কাবা পরিত্যক্ত হয়, তবে তোমাদের কোনো অবকাশ দেওয়া হবে না।
১১. প্রতিবেশীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো, কারণ এটি তোমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) উপদেশ। তিনি এত বেশি প্রতিবেশীর ব্যাপারে উপদেশ দিয়েছেন যে আমরা ধারণা করেছিলাম, তিনি তাদের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।
১২. সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা পরিত্যাগ কোরো না। অন্যথায়, তোমাদের মধ্যে মন্দ লোকেরা তোমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে এবং তখন তোমরা দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল হবে না।
উপসংহার:
ইমাম আলী (আ.)-এর খেলাফত ইসলামি ইতিহাসে ন্যায়বিচার, সমতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার জীবন ও খেলাফতি দর্শন কেবল মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং সকল শাসকের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। আজকের বিশ্বে যদি তার শাসননীতিকে অনুসরণ করা হয়, তবে সমাজে শান্তি, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
লেখক: কবির আলী তরফদার কুম্মী।
তারিখ: ২১/০৩/২০২৫
আপনার কমেন্ট