হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
মজিদুল ইসলাম শাহ
২৯ তম রমযানের দোওয়া
اَللّـهُمَّ غَشِّني فيهِ بِالرَّحْمَةِ، وَارْزُقْني فيهِ التَّوْفيقَ وَالْعِصْمَةَ، وَطَهِّرْ قَلْبي مِنْ غَياهِبِ التُّهْمَةِ، يا رَحيماً بِعِبادِهِ الْمُؤْمِنينَ.
হে আল্লাহ! আজ আমাকে তোমার রহমত দিয়ে ঢেকে দাও। গুনাহ থেকে মুক্তিসহ আমাকে সাফল্য দান কর। আমার অন্তরকে মুক্ত কর অভিযোগ ও সন্দেহের কালিমা থেকে। হে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি দয়াবান।
গুরুত্বপূর্ণ দিক
১) করুণার ছায়ায়; ২) আশীর্বাদ এবং সুরক্ষা; ৩) অপবাদের অন্ধকার থেকে মুক্তি।
দুআর বিশেষ বাক্য গুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ
১- "أَللّـهُمَّ غَشِّنى فـيهِ بِالرَّحْـمَةِ"
(হে আল্লাহ! আমাকে আপনার রহমতে আবৃত করে নিন।)
আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে তাঁর রহমত প্রকাশের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর রহমত "সমস্ত কিছুকে পরিবেষ্টন করে" (দোয়ায়ে কুমাইলের উক্তি)। তবে এই রহমতের প্রকাশ মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা ও সঠিক ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ চান যে বান্দারা তাঁর নিয়ামত, অনুগ্রহ ও দয়ার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে জীবনযাপন করবে এবং সর্বাবস্থায় সৎপথে অবিচল থাকবে। এর বিনিময়ে তিনি বান্দাদের দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর অনুগ্রহের যোগ্য করে তোলেন।
আল্লাহ এমন লোকদের জন্য পবিত্র জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে দেন। তিনি তাদের পরীক্ষায় ধৈর্য ও দৃঢ়তা দেন, যাতে তারা সত্যের পথে অটল থাকে। কষ্ট ও বিপদের মাধ্যমে তিনি তাদের ঈমানকে শক্তিশালী করেন, তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন। তারা সমস্যার মধ্যেও শান্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে এবং আল্লাহর উপর তাদের বিশ্বাস দৃঢ় হয়।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে উপেক্ষা করে এবং শয়তানের পথে চলে, তাকে অবিলম্বে শাস্তি দেওয়া হয় না। বরং আল্লাহ তাকে সময় দেন, যাতে সে তওবা করে সংশোধিত হতে পারে। কিন্তু যদি সে এই সুযোগ কাজে না লাগায় এবং পাপের পথেই রয়ে যায়, তবে সে আল্লাহর ক্রোধের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যায়। হতে পারে, দুনিয়াতেই তার শাস্তি আসে অথবা আল্লাহ তাঁর হিকমত অনুযায়ী দুনিয়াতে শাস্তি দেন না, কিন্তু এটা তার জন্য আরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। সে ভুল করে মনে করে যে, আল্লাহ তার পাপকে সমর্থন করছেন, ফলে তার হৃদয় কঠিন হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জাহান্নামের শাস্তির মুখোমুখি হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
আল্লাহ তাআলার একশত রহমত রয়েছে। এর মধ্যে একটি রহমত তিনি পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, যা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে বণ্টিত হয়েছে। মানুষ যে দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখায়, তা এই রহমতেরই প্রতিফলন। আর বাকি নিরানব্বইটি রহমত তিনি নিজের কাছে রেখেছেন, যা কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদেরকে দান করবেন। (মাজমাউল বায়ান খণ্ড ১, তাফসিরে সাফি খণ্ড ১ পৃষ্ট ৮২)
২- "وَ ارْزُقْنى فيهِ التَّوْفيقَ وَ الْعِصْمَةَ"
(হে আল্লাহ! আমাকে এই মাসে তাওফিক ও ইসমত দান করুন।)
(ক) তাওফিক হলো আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা ছাড়া কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের উচিত সর্বদা আল্লাহর কাছে নেক কাজের তাওফিক চাওয়া।
মাওলানা রুমির শিক্ষণীয় ঘটনা:
একজন ধনী মনিব ও তার গোলাম মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। নামাজের সময় হলে গোলাম মনিবের কাছে নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলেন। মনিব, যিনি পার্থিব সম্পদে মত্ত হয়ে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিলেন, অনিচ্ছায় তাকে অনুমতি দিলেন। গোলাম নামাজে মগ্ন হয়ে গেলেন, নামাজের মধুর স্বাদে এতটাই মগ্ন যে সময়ের কথা ভুলে গেলেন।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর মনিব রেগে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, "ওরে নিকৃষ্ট! সবাই চলে গেছে, তুমি এখনও কী করছ? কে তোমাকে ধরে রেখেছে?"
গোলাম জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, আমার প্রভু! তিনিই আমাকে ধরে রেখেছেন, যিনি আপনাকে ভিতরে আসতে দেননি!"
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, একজনের জন্য আল্লাহ নামাজের মধুর স্বাদ দান করেছেন, অন্যজনকে তাওফিক দেননি। তাই তাওফিকের জন্য দোয়া করা অপরিহার্য।
(খ) ইসমত (গুনাহ থেকে পবিত্রতা):
ভাষাগত অর্থ: "ইসমত" (عصمة) শব্দটির মূল অর্থ হলো সুরক্ষা, পবিত্রতা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং নিষ্পাপ থাকার মাধ্যম।
দুআর প্রেক্ষাপটে অর্থ:
এখানে এটি সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, নবী-রাসূল বা ইমামগণের বিশেষ গুণ হিসেবে নয়। আমরা দোয়া করি, "হে আল্লাহ! আমাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখুন।"
ইমাম সাদিক (আ.) এর বাণী:
وَ إِنَّ اَللَّهَ عَزَّ ذِكْرُهُ يَعْصِمُ مَنْ أَطَاعَهُ وَ لاَ يَعْتَصِمُ بِهِ مَنْ عَصَاهُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার আনুগত্যকারীকে গুনাহ থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু যারা তাঁর অবাধ্যতা করে, তারা তাঁর সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।" (আল কাফী খণ্ড ৮ পৃষ্ট ৮১)
৩- وَ طَهِّرْ قَلْبى مِنْ غَياهِبِ التُّهَمَةِ:
আর আমার হৃদয়কে অপবাদের অন্ধকার থেকে পবিত্র করুন:
ইসলাম ধর্ম সর্বদা তার অনুসারীদেরকে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছে, ভালো কাজের নির্দেশ দিয়েছে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছে। মানুষকে পাপ থেকে দূরে থাকতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহাপাপগুলোর মধ্যে একটি গুরুতর পাপ হলো "অপবাদ"। এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যদি কেউ অন্য কাউকে অপবাদ দেয়, তবে সে অন্যের ক্ষতির পাশাপাশি নিজেরও ক্ষতি করে এবং নিজের আত্মাকে পাপের দ্বারা কলুষিত করে। রাসূলের সন্তান ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন, নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি অপবাদ দেওয়া বিশাল পর্বতের চেয়েও ভারী।
এখন প্রশ্ন উঠে, অপবাদ আসলে কী? অপবাদের অর্থ হলো, কোনো মানুষের মধ্যে এমন দোষ আরোপ করা যা তার মধ্যে নেই। অপবাদ মহাপাপগুলোর মধ্যে একটি, আর পবিত্র কুরআন এটির তীব্র নিন্দা করে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করেছে। বস্তুতপক্ষে, অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ মিথ্যার সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ। যদি এই মিথ্যা অভিযোগ কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে লাগানো হয়, তবে তা গিবত (পরনিন্দা) হিসেবে গণ্য হয়। এমন ক্ষেত্রে ব্যক্তি দুটি পাপে জড়ায়: একটি মিথ্যা বলা, অন্যটি গিবত করা।
একদিন ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একজন সঙ্গী তার সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। তার দাসরা এগিয়ে গিয়েছিল। সে দাসদের ডাকল, কিন্তু তারা সাড়া দিল না। তিনবার ডাকার পরও যখন কোনো উত্তর পেল না, তখন সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে দাসকে গালি দিল—যা প্রকৃতপক্ষে তার মায়ের প্রতি অপবাদ ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, ইমাম (আ.) যখন এই অশালীন ভাষা শুনলেন, তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং তাকে এই অভদ্র কথার প্রতি মনোযোগ দিতে বললেন। কিন্তু ব্যক্তিটি ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে প্রমাণ দিতে শুরু করল। ইমাম (আ.) দেখলেন সে তার ভুলে অনুতপ্ত নয়, তখন তিনি বললেন, তোমার আর আমার সাথে থাকার অধিকার নেই।
অপবাদ সমাজের শান্তিকে দ্রুত বা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সামাজিক ন্যায়বিচারকে ধ্বংস করে, সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে। অপবাদ মানুষকে কোনো অপরাধ ছাড়াই অপরাধী বানিয়ে তার সম্মান ও মর্যাদাকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। যদি সমাজে অপবাদের প্রথা ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ অপবাদকে গ্রহণ করে বিশ্বাস করে, তবে সত্য মিথ্যার পোশাক পরিধান করবে, আর মিথ্যা সত্যের পোশাকে দেখা দেবে। যে সমাজে অপবাদ প্রথাগত হয়, সেখানে সুধারণাকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ভেঙে যাবে, এবং সমাজ ধ্বংসের প্রান্তে পৌঁছাবে। তখন প্রত্যেকের মধ্যেই এই স্পর্ধা জন্মাবে যে, সে কারো বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা বলে যাবে, মিথ্যা, অপবাদ ও অভিযোগ আরোপ করবে। (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড ৬৮ পৃষ্ট ১৪২)
৪– হে তাঁর ঈমানদার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু:
হে পরওয়ারদিগার! এই মাসে আমাকে তোমার রহমতের চাদরে আবৃত করো, আমাকে এতে তাওফিক ও নিরাপত্তা দান করো, এবং আমার হৃদয়কে অপবাদের কালিমা থেকে পবিত্র করে দাও।
ফলাফল
দোয়ার বার্তা:
১. আল্লাহর রহমত প্রার্থনা; ২. গুনাহ ত্যাগ করার তাওফিক চাওয়া; ৩. অপবাদের অন্ধকার থেকে হৃদয় পবিত্র হওয়ার দোয়া; ৪. মুমিনদের উপর আল্লাহর বিশেষ রহমতের অন্তর্ভুক্তি।
নির্বাচিত বার্তা:
যে অপবাদগুলো অন্ধকার ও কালিমা বয়ে আনে, তা দুই প্রকার:
১) আল্লাহর উপর অপবাদ
অপবাদের অন্ধকার ও কালিমা কখনো ـ নাউজুবিল্লাহ ـ আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপের মাধ্যমে সৃষ্টি হতে পারে। এটি মূলত আল্লাহর তাকদির ও ইচ্ছার প্রতি অসন্তুষ্টির ফল।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ মূসা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেন: আমার সর্বশ্রেষ্ঠ শত্রু সে, যে আমার উপর অপবাদ আরোপ করে! হযরত মূসা (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন: হে প্রভু! কে সেই যে আপনাকে অপবাদ দেয়? আল্লাহ উত্তরে বললেন: সে ব্যক্তি যে মনে করে, আমি কোনো বিশেষ হিকমতের ভিত্তিতে যা নির্ধারণ করেছি, তা থেকে সে অসন্তুষ্ট। আর এ চিন্তা করে যে, এটি না হলে ভালো হতো। অর্থাৎ, সে আমার তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট নয়।
২) মানুষের উপর অপবাদ
হৃদয়ের অন্ধকার ও কালিমা কখনো মানুষের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলেও সৃষ্টি হয়, যা বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। (মিজানুল হিকমা খণ্ড ১ পৃষ্ট ৫৩৮)
আপনার কমেন্ট