বৃহস্পতিবার ২৮ আগস্ট ২০২৫ - ১১:০৮
চক্ষুর গুনাহ বর্জন: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ

চোখ মানুষের অন্তরের দরজা। অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিই অধিকাংশ সময়ে পাপ ও নৈতিক বিচ্যুতির সূচনা করে। কুরআন ও হাদিসে চোখকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জোরালো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং গুনাহ থেকে চোখকে বিরত রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে বহু বাণী পাওয়া যায়। এই প্রবন্ধে গুনাহ থেকে চোখকে বাঁচানোর প্রয়োজনীয়তা, ইসলামী উৎসসমূহের নির্দেশনা এবং নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মানুষের ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে চোখ সর্বাধিক প্রভাবশালী। চোখের দৃষ্টি দ্বারা অন্তরে চিন্তা জাগ্রত হয়, আর সেই চিন্তা থেকেই কাজের সূচনা হয়। তাই ইসলাম চোখকে নিয়ন্ত্রণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।  পবিত্র কুরআন শরীফে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:

“আর বলুন, তোমরা যা কর, শিগগিরই আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ তোমাদের কর্ম দেখতে পাবেন।” [সূরা তাওবা, ৯:১০৫]

এতে বোঝা যায়, মানুষের প্রতিটি কাজ আল্লাহ, রাসূল এবং ঈমানদারদের দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। সুতরাং দৃষ্টির পাপ এড়ানো শুধু ব্যক্তিগত আত্মসংযম নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দায়িত্বও।

কুরআনের দৃষ্টিতে চোখের গুনাহ বর্জন
মহান আল্লাহ  তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়ে বলেন:

“ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে... এবং ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।” [সূরা আন-নূর, ২৪:৩০]

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দৃষ্টি সংযম (غضّ البصر) হলো ঈমানদারের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং গুনাহ থেকে বাঁচার প্রথম ধাপ।

হাদিসসমূহে দৃষ্টি সংযম
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

“নামাহরামের দিকে তাকানো শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের একটি তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তা ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে এমন ঈমান দান করেন যার মাধুর্য সে নিজের অন্তরে অনুভব করে।” [মুস্তাদরাক আল-ওয়াসায়েল, খণ্ড ১৪, পৃ. ২৬৯]

অন্য এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন,

“তোমরা মানুষের নারীদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো, তবে তোমাদের নারীরাও সুরক্ষিত থাকবে।” [আল-কাফি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৫৪]

এই নির্দেশনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, দৃষ্টি সংযম কেবল ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক মর্যাদা রক্ষারও মাধ্যম।

সুফি ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাচীন আধ্যাত্মিক কবিরা দৃষ্টির পাপ সম্পর্কে হৃদয়গ্রাহীভাবে সতর্ক করেছেন। যেমন, বাবা তাহের বলেছেন,

“চোখ আর হৃদয়ের হাত থেকে হায়,
যা চোখ দেখে, মনে তারই ঠাঁই।
লোহার খঞ্জর বানাই যদি বিদ্ধ করার তরে,
তবে অন্তর মুক্তি পায় সেই বন্ধন ঘিরে।”

এখানে প্রতীকী ভাষায় তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, অসংযত দৃষ্টি হৃদয়কে বন্দী করে রাখে এবং আত্মিক মুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
চোখের গুনাহ শুধু ব্যক্তির আত্মাকে কলুষিত করে না, বরং সমাজে অশ্লীলতা, পরিবারে অশান্তি এবং সম্পর্কের ভাঙন সৃষ্টি করে। ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হয়েছে একটি মাত্র দৃষ্টির মাধ্যমে। তাই ইসলাম দৃষ্টি সংযমকে সামাজিক নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পরিসমাপ্তি: চোখের গুনাহ বর্জন ইসলামী শিক্ষায় একটি মৌলিক নৈতিক নির্দেশনা। কুরআন, হাদিস ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাসমূহে এর গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দৃষ্টি সংযমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি, পারিবারিক মর্যাদা রক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়। তাই আত্মগঠনের পথে প্রথম পদক্ষেপই হলো দৃষ্টি সংযম।

তথ্যসূত্র:

১. কুরআন শরীফ, সূরা তাওবা (৯:১০৫), সূরা আন-নূর (২৪:৩০)

২. মুস্তাদরাকুল ওয়াসায়েল, খণ্ড ১৪, পৃ. ২৬৯

৩. আল-কাফি, খণ্ড ৫, পৃ. ৫৫৪

৪. বাবা তাহের, আধ্যাত্মিক কবিতা

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha