শনিবার ৩ জানুয়ারী ২০২৬ - ০৭:৪৭
হজরত আলী (আ.)-এর রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন: যুগে যুগে আদর্শ শাসনের প্রতীক

ইসলামের ইতিহাসে খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগ রাষ্ট্রনৈতিক ন্যায়বিচার ও মানবিক শাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর মধ্যে হজরত আলী (আ.)-এর শাসনামল ন্যায়, জ্ঞান ও সাহসিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। তাঁর জীবন ও রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন বর্তমান বিশ্বেও প্রাসঙ্গিক। আজ আমরা মাওলানা রুহুল আমিনের সাথে আলোচনা করব ইমাম আলী (আ.)-এর আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক চরিত্র নিয়ে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম। আজ আমাদের সাথে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। প্রথম প্রশ্নই যাক মূল প্রসঙ্গে—হজরত আলী (আ.)-কে আপনি কীভাবে "আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্রনায়ক" হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন?

মাওলানা রুহুল আমিন: ওয়ালাইকুম আসসালাম। ধন্যবাদ আমাকে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য। হজরত আলী (আ.) কেবল একজন শাসক নন; তিনি ছিলেন ন্যায়ভিত্তিক শাসনের জীবন্ত শিক্ষাক্রম। তাঁর শাসনকালে রাষ্ট্রের মূল দর্শন ছিল:
১. আল্লাহভীতির ভিত্তিতে নেতৃত্ব – তিনি বলতেন, "যার নেতৃত্ব, তার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি গভীর তাকওয়া।"
২. জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা – তিনি নিজে বাজারে ঘুরে দাম নিয়ন্ত্রণ করতেন, প্রজাদের কষ্ট শুনতেন।
৩. কর্তব্যপরায়ণতা – তিনি বলেছেন, "দুর্বল ব্যক্তির কান্না শোনার আগেই রাষ্ট্রনায়কের পদত্যাগ করা উচিত।"

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তাঁর শাসনব্যবস্থায় ন্যায়বিচার কতটা প্রাধান্য পেত?

মাওলানা রুহুল আমিন: ন্যায়বিচার ছিল তাঁর শাসনের মেরুদণ্ড। ঐতিহাসিক "মালিক আল-আশতারকে লেখা পত্র" তার প্রমাণ—সেখানে তিনি শাসককে নির্দেশ দিয়েছেন: "যে ব্যাপারে তোমার জ্ঞান নেই, তা থেকে বিরত থাকো।" তিনি নিজের শত্রুর বিরুদ্ধেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। একটি বিখ্যাত ঘটনা: তাঁর বর্ম চুরি যাওয়ার পর তা এক ইহুদির দোকানে দেখতে পান। বিচারকের সামনে তিনি প্রমাণ করতে পারেননি, কিন্তু বিচারক (যিনি নিজেই তাঁর নিয়োগকর্তা) ইহুদির পক্ষে রায় দিলে তিনি তা মেনে নেন। এটিই ছিল ন্যায়ের শাসন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: অর্থনৈতিক নীতি ও সামাজিক ভারসাম্য তিনি কীভাবে রক্ষা করতেন?

মাওলানা রুহুল আমিন: তিনি বলতেন, "রাষ্ট্রের সম্পদ আল্লাহর আমানত।" বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে সমবন্টনের নীতি চালু করেন। এমনকি নিজের ভাইয়ের জন্য ও একই নীতি ছিল। একবার তাঁর ভাই বেশি ভাতা চাইলে তিনি বলেছিলেন, "তুমি কি চাও যে আমি জনগণের অধিকার নষ্ট করি?" তিনি প্রান্তিক মানুষ, এতিম ও বিধবাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: বর্তমান বিশ্বে, বিশেষত মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রনৈতিক সংকটে তাঁর শিক্ষা কতটা প্রাসঙ্গিক?

মাওলানা রুহুল আমিন: অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক! আজ যদি রাষ্ট্রপ্রধানরা তাঁর "শাসননীতির আদেশপত্র" পড়েন, তাহলে দুর্নীতি, স্বৈরাচার, অসমতা কমে যাবে। তিনি বলেছেন:

· "শাসক যদি স্বৈরাচারী হয়, রাষ্ট্র ধ্বংস হবে।"
· "জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, তাহলে তোমার পতন নিশ্চিত।"
  আজকের নেতাদের জন্য এটি সার্বজনীন বার্তা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

মাওলানা রুহুল আমিন: তিনটি গুণ: জ্ঞান, ন্যায় এবং নির্ভীকতা। তিনি ছিলেন 'বাবুল ইলম' (জ্ঞানের দরজা)। রাষ্ট্র পরিচালনায় জ্ঞানের প্রয়োগ, সাহসিকতার সাথে অন্যায়ের প্রতিরোধ—এগুলো আজকের নেতৃত্বের বড় অভাব। সিফফিনের যুদ্ধে তিনি যখন দেখলেন সেনাবাহিনী পানি দখল করে ফেলেছে এবং শত্রুপক্ষ তৃষ্ণার্ত, তখন তিনি বললেন, "পানি সবার অধিকার।" এটাই মহানুভবতা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শেষ প্রশ্ন—নতুন প্রজন্ম কীভাবে তাঁর জীবন থেকে প্রেরণা নিতে পারে?

মাওলানা রুহুল আমিন: তরুণরা তাঁর লেখা নাহজুল বালাগা পড়ুক—বিশ্বের সর্বোচ্চ সাহিত্যিক ও দার্শনিক গ্রন্থগুলোর একটি। তিনি ছিলেন "যুবকদের বন্ধু"; তরুণদের মেধা ও শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। তাঁর জীবন থেকে শেখা যায়:
১. নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব, আরাম নয়।
২. জ্ঞান ছাড়া শক্তি ভয়ানক বিপদ।
৩. সবচেয়ে বড় জিহাদ হল স্বৈরাচারের মুখে সত্য বলা।

সমাপ্তি:
মাওলানা রুহুল আমিনের আলোচনা থেকে স্পষ্ট, হজরত আলী (আ.)-এর আদর্শ কেবল ইতিহাস নয়; বর্তমান বিশ্বের জন্য এক জরুরি রাষ্ট্রনৈতিক দিকনির্দেশনা। তাঁর জীবনাচরণ প্রমাণ করে, ইসলামি শাসনব্যবস্থা মানবিকতা, ন্যায় ও প্রজ্ঞার সমন্বয়েই সুশাসনের মডেল হতে পারে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha