হাওজা নিউজ এজেন্সি: কিশোরকাল মানবজীবনের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গঠনমূলক পর্যায়। এই সময়ে যদি কিশোরদের সংস্কৃতি ও আদর্শের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, তবে তারা সহজেই পরিচয় সংকটে আক্রান্ত হয়।
মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসন প্রথম পরিচয় সংকটের ধারণা উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, সমাজ যে ভূমিকা একজন কিশোরের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে তা গ্রহণ ও আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হলে সে পরিচয় সংকটে পড়ে। অন্যদিকে, কিছু মনোবিজ্ঞানীর মতে, শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা কিংবা বর্তমান অনুকূলহীন সামাজিক পরিবেশের কারণে কিশোররা যখন নিজস্ব পরিচয় গঠনে সফল হতে পারে না, তখনও পরিচয় সংকট দেখা দেয়। পরিচয়ের বিভিন্ন ধরন থাকলেও সাংস্কৃতিক পরিচয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী।
পরিচয় সংকটের প্রধান কারণসমূহ
১. সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা: যখন কিশোর বা তরুণ নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে দৃঢ় ও সচেতন সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তখন হতাশা ও শূন্যতার কারণে সে সহজেই ভিন বা পরদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
২. প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব: অভিভাবক ও সন্তান—এই দুই প্রজন্মের মধ্যে চিন্তাধারা, মূল্যবোধ ও জীবনদৃষ্টির পার্থক্য সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে। এই দূরত্ব অনেক সময় পারস্পরিক বোঝাপড়াহীনতা, দ্বন্দ্ব ও বিরোধে রূপ নেয়, যা পরিচয় সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
৩. দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন: দ্রুত সামাজিক রূপান্তরের ফলে কিশোররা অনেক সময় সামাজিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের সক্ষমতা হারায়। এতে তারা নিজস্ব সংস্কৃতির উপাদানগুলো যথাযথভাবে চেনা, গ্রহণ ও আত্মস্থ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
৪. সামাজিক শূন্যতা: মানুষ তার লক্ষ্য ও আদর্শ থেকেই জীবনীশক্তি, উদ্দীপনা ও গতিশীলতা লাভ করে। লক্ষ্য ও আদর্শের অভাব ব্যক্তি ও সমাজে স্থবিরতা, অনুৎসাহ, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়।
পরিচয় সংকট মোকাবিলার কার্যকর উপায়
• সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা: কিশোর ও তরুণদের নিজেদের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ নতুন করে পর্যালোচনা করতে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের সংস্কৃতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকে বহুমুখী ও ইতিবাচক সাংস্কৃতিক শিক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
• প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব নিরসন: দুই প্রজন্মের মধ্যে চিন্তাগত, আবেগগত ও বিশ্বাসগত মিল খুঁজে বের করে তা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কার্যকর ও গঠনমূলক সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
• দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের মোকাবিলা: তরুণদের পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা সামাজিক পরিবর্তন ও ঘটনাবলি নিয়ে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং সঠিকভাবে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারে।
• সামাজিক শূন্যতা পূরণ: জীবন, স্রষ্টা, অস্তিত্ব এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর প্রদান করে তরুণদের সামনে স্থায়ী, মূল্যবোধসমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী আদর্শ উপস্থাপন করতে হবে।
সূত্র: জিন্দেগি দার সায়ে-সারে ফারহাঙ্গে পুয়া, পৃষ্ঠা ১৫৫
আপনার কমেন্ট