হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক বিষয় বিশ্লেষকদের স্বীকারোক্তি মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলা আক্রমণ এবং ঐ দেশের আইনসম্মত রাষ্ট্রপতির অপহরণ কেবল একটি আঞ্চলিক ঘটনা নয়, বরং এর চেয়েও বেশি, এটি বিশ্ব রাজনীতিতে সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও নির্লজ্জ শক্তির প্রত্যাবর্তনের চিহ্ন এবং এর বাস্তব রূপায়ণ যে জঙ্গলের আইন পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন কেবল নাম ও আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তি প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, এমনকি এটি সম্ভব যে এই বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণকে ছাড়িয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি নিয়মে পরিণত হবে।
যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিনিরা একটি বিজয়ী শক্তি হিসেবে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম তৈরি করে বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে, তখন এই দেশের কিছু চিন্তাবিদ এই মৌলিক বিষয়টির উপর জোর দিতেন যে এর মূল উদ্দেশ্য হলো নৈতিক ও আইনী নীতিমালার একটি সমষ্টি তৈরি করা যা শেষ পর্যন্ত শক্তির স্বেচ্ছাচারী ব্যবহার রোধ করবে। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কার্যক্রম, বিশেষত ভেনিজুয়েলা সম্পর্কিত পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত করে যে বিশ্বের উদ্ধত শক্তিসমূহ এবং তাদের অগ্রগামী বড় শয়তানের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) জন্য কেবল নিজস্ব স্বার্থ অর্জনই গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহসেন জালিলভন্দের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কার্যত একটি নতুন বিশ্ব অরাজকতার মধ্যে প্রবেশ করেছি। এর আগে শিক্ষা ও গবেষণা মহল এবং কখনও কখনও বিশেষায়িত সভায় বলা হত যে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের নীতি, শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা, দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বিশ্বব্যবস্থার স্তম্ভ। যদিও এই নীতিগুলো সর্বদা সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগ হয়নি, তবুও অন্ততপক্ষে রাষ্ট্রগুলোর আচরণের জন্য একটি বৈধতা প্রদানকারী বা সীমাবদ্ধকারী কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে এবং বিশ্বকে এই উপসংহারে পৌঁছে দিয়েছে যে সম্ভবত এই আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধ ও রক্তপাত এবং নিরঙ্কুশ শক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে রোধ করতে না পারলেও সময়ের সাথে এর তীব্রতা ও বিস্তার কমাতে পারে।
তবে গত কয়েক বছরে, বিশেষভাবে ইহুদিবাদী সরকারের গাজায় নিষ্ঠুর ও বর্বর আক্রমণ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণ ও সিরিয়ায় ক্ষমতা দখলের জন্য সন্ত্রাসীদের সহায়তার কারণে এই আশা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ হতাশা ও নিরাশায় পরিণত হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক আইনি নিয়মের কার্যকারিতার সমাপ্তির সতর্কবার্তা বহুদিন ধরে জ্বলছে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো কার্যত বিশ্বব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উপহাস করার সমতুল্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনিজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ, বিশেষত এর ধরন অনুযায়ী, অর্থাৎ সরাসরি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এক রাষ্ট্রপতির আশ্চর্যজনক অপহরণ, এই কাঠামোকে এবার অভূতপূর্বভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। এই ঘটনা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে নিয়মাবলী বিদ্যমান কিন্তু আর বাধ্যতামূলক নয়, নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দাম্ভিকতায় বিশ্বের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যাতে সে সকল নিয়ম ও আইন থেকে মুক্ত থাকে।
অন্যদিকে, এটি লক্ষণীয় যে যদি কোন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য শক্তি প্রয়োগ একটি বৈধ অপশন হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তাহলে পুরো আইনী নিরোধক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং তখন নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘনেরও প্রয়োজন থাকবে না। কারণ একটি বড় ও প্রভাবশালী শক্তি যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটাই যথেষ্ট হবে যে সে নিরাপত্তা হুমকি বা ন্যায়বিচারের নামে তার পছন্দসই ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইচ্ছামতো পদক্ষেপ নিয়ে বেড়াবে।
আপনার কমেন্ট