হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
ভূমিকা
বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান এমন একটি দেশ, যার সম্পর্ক আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বরাবরই জটিল ও বিতর্কিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে এর সম্পর্ক সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ থেকেছে। এর ফলে ইরানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শুধু সমালোচনার মুখেই পড়তে হয়নি, বরং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারও সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এই সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান তার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সতর্ক কৌশল গ্রহণ করেছে, যাকে “জিও অর জিনে দো” (নিজে বাঁচো, অন্যকেও বাঁচতে দাও) দর্শনের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। এই কৌশলের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে ইরান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তির ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
কিন্তু পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ইসলামবিদ্বেষী সব শক্তিই ইরানের পেছনে লেগে আছে। তবুও এই বাস্তবতা ও ইতিহাস জানলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায় যে ইসলাম ও কুফরের সংঘাত নতুন কিছু নয়; এটি চৌদ্দশো বছরের পুরোনো ইতিহাস। বদর, উহুদ, খায়বার ও খন্দকের যুদ্ধে পরাজিত শত্রুরা কীভাবে ইসলামের বিরোধিতা থেকে সরে আসতে পারে?
আরব উপদ্বীপে ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। তাই অতীতে যেমন ইসলামবিরোধীরা ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি আজও তারা পরাজয়ের দিকেই ধাবিত হবে। কারণ—
“الإسلام یعلو ولا یعلىٰ علیہ”
ইসলাম ধ্বংস হওয়ার জন্য নয়, বরং চিরস্থায়ী হওয়ার জন্য এসেছে।
এটি এমন এক সুসংবাদ, যা সব হতাশা দূর করে দেয় এবং সংকটে পড়া প্রতিটি মুসলমান দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে-
তাওহিদের আমানত বুকে বহন করি আমরা,
সহজ নয় মুছে ফেলা আমাদের নাম-নিশান।
“জিও আর জিনে দো” নীতির কৌশল
“জিও অর জিনে দো” দর্শন বিশ্বের সব দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে। এই নীতির উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থকে সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ইরানের জন্য এই কৌশল শুধু অভ্যন্তরীণ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই জরুরি ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ইরান বরাবরই চেষ্টা করেছে, সংঘাতে না গিয়ে আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে।
এই নীতির ফলে ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন শক্তি সঞ্চার হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মতো শক্তিধর দেশগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানায় এবং স্পষ্ট করে দেয়-
“আমাদের সঙ্গে সংঘাতে গেলে জয় নিশ্চিত নয়।”
ইরানের পররাষ্ট্রনীতির পটভূমি
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের পররাষ্ট্রনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক চরমভাবে অবনতি ঘটে। বিপ্লব-পরবর্তী ইসলামী ব্যবস্থা বিশ্বকে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে, এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে-যার অনেকটাই তাদের নিজেদের তৈরি।
২০১৫ সালে ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি) মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয় এবং বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে ইরানকে তার কৌশল নতুন করে সাজাতে হয়।
ইরান ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক
ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে এক দ্বিমুখী ধারা দেখা যায়। একদিকে সে বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে আলোচনায় বসে চুক্তি করেছে, অন্যদিকে নিজের প্রতিরক্ষা স্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করেনি। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক সমালোচনা-কোনো কিছুর সামনেই ইরান মাথা নত করেনি।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ক্রমশ দৃঢ় হয়েছে। এই দুই দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে একঘরে হওয়া থেকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে ইরান ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনার পথ খোলা রেখেছে।
২০২৬ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি ও কর্তৃত্ববাদী পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে ইরান এমন অবস্থান নেয় যে আমেরিকা বিস্মিত হয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বড় ধরনের ইউ-টার্ন নিয়ে বলেন যে তেহরান আলোচনায় ও সম্ভাব্য চুক্তিতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তবে ইরান তার নিজস্ব সিদ্ধান্তে অটল থাকে এবং আমেরিকার সামরিক শক্তিও কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।
তাই বলা যায়-
জপমালা জয়ী হলো, তলোয়ার থেমে গেল,
এক ফকিহের পদতলে শক্তি নত হয়ে গেল
সতর্ক কৌশলের সফল উদাহরণ
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ইরানের কৌশলের একটি বড় উদাহরণ। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান দেখিয়ে দেয়, শক্ত প্রতিরক্ষা বজায় রেখেও আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে বাস্তববাদী ও সতর্ক নীতি গ্রহণ করা সম্ভব।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইরান বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নিলেও আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি। এর ফলে ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগ্রাসী নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়।
প্রযুক্তিতে ইরানের অগ্রগতি ও আমেরিকার ভ্রান্ত ধারণার অবসান
কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান তার প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে ইরান আজ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র।
ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল ও প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বকে বিস্মিত করে। এই যুদ্ধে ইরান প্রমাণ করে দেয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক কৌশল থাকলে যেকোনো শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।
ইরানের বার্তা
এই সংঘাতের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে-
“যে আমাদের উসকাবে, সে নিজেই ধ্বংস হবে।”
এই বার্তা শুধু ইসরাইল নয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব বৈশ্বিক শক্তির জন্যও প্রযোজ্য। ইরান প্রমাণ করেছে, তাকে আর দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যাবে না।
আমেরিকার শক্তির মিথ ভেঙে পড়া
যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সবসময় বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি বলে দাবি করে এসেছে। কিন্তু ইরানের এই সাফল্য সেই ভ্রান্ত ধারণাকে চূর্ণ করেছে। আজ ইরান এমন এক শক্তি, যার সঙ্গে সংঘাত যে কারও জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
ভবিষ্যতে “জিও অর জিনে দো” নীতির প্রাসঙ্গিকতা
ইরানকে ভবিষ্যতেও এই নীতিতেই অটল থাকতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপ, আমেরিকা ও তাদের মিত্রদেরও উচিত-অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, বাধা সৃষ্টি না করা এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ না করা।
ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, শক্তি ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখে একই সঙ্গে শান্তির বার্তাবাহক হওয়াই হলো টেকসই কূটনীতি।
উপসংহার
ইরানের এই সফল কৌশল প্রমাণ করে-যখন একটি রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হয়, তখন সে শুধু নিজের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং বিশ্বশক্তিগুলোকেও তার শক্তি স্বীকার করতে বাধ্য করে।
নীতিতে আঘাত এলে সংঘর্ষ অনিবার্য,
যে বেঁচে আছে, তাকে বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতেই হবে।
আপনার কমেন্ট