হাওজা নিউজ এজেন্সি: সোমবার বিকেলে (১৩ বাহমান ১৪০৪ হিজরি শামসি) পবিত্র জামকারান মসজিদের বাকি‘আ শাবিস্তানে অনুষ্ঠিত ২১তম আন্তর্জাতিক মাহদাভিয়াত সম্মেলনে আয়াতুল্লাহ আরাকি এসব কথা বলেন।
তিনি তাঁর আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক সুন্নাতসমূহ তুলে ধরেন এবং বলেন, এসব ঐশী সুন্নাতের চূড়ান্ত পরিণতি হলো ইমাম যামান (আ.)-এর নেতৃত্বে বৈশ্বিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
ইতিহাস, সমাজ ও ঐশী সুন্নাত
ইরানের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সর্বোচ্চ পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আরাকি বলেন, পবিত্র কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনায় সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া, সমাজ পরিচালনার বিধান, সামাজিক রূপান্তর এবং মানবজাতির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত কাঠামো বিদ্যমান।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ঐশী সামাজিক বিধানসমূহ অপরিবর্তনীয় ও তত্ত্বগত (তাকভিনি); বৃহৎ সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রবাহ এসব সুন্নাতের ভিত্তিতেই অগ্রসর হয়।
তিনি আরও বলেন, মানুষ ব্যক্তি আচরণের ক্ষেত্রে স্বাধীন হলেও সমাজ ও ইতিহাসের সামগ্রিক গতিপথ অবশ্যম্ভাবী এবং শেষ পর্যন্ত তা আল্লাহ নির্ধারিত লক্ষ্যেই উপনীত হবে।
ঐশী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী
এই বিশিষ্ট আলেম হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন,
যদি দুনিয়ার আয়ু থেকে মাত্র এক দিনও অবশিষ্ট থাকে, তবুও আল্লাহ সেই দিনকে দীর্ঘায়িত করবেন, যাতে ন্যায়ভিত্তিক শাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়।
‘নিয়ামত রূপান্তর’—ইতিহাসের এক মৌলিক বিধান
আয়াতুল্লাহ আরাকি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হিসেবে ‘নিয়ামত রূপান্তর’ (তাবদিলুন নি‘মাহ)-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, যখন কোনো উম্মাহ আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে, তখন তারা পতনের শিকার হয়।
তিনি বলেন, কুরআনে দুই ধরনের নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে—
১. সাধারণ নিয়ামত, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য;
২. পরিপূর্ণ নিয়ামত (নিয়ামতে তাম্মাহ), যা মানুষকে পূর্ণতা ও উৎকর্ষের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেয়।
তার মতে, এই পরিপূর্ণ নিয়ামত সরাসরি ইমামতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুরআনে গাদীরের আয়াত এবং হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধরদের প্রসঙ্গে নাজিলকৃত আয়াতসমূহে নিয়ামত পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
উম্মাহর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এই নিয়ামতে তাম্মাহ গ্রহণ এবং ইমামের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
উম্মাহ ও ইমামের সঙ্গে দুই মৌলিক অঙ্গীকার
ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আরাকি বলেন, উম্মাহ ও ইমামের মধ্যে দুটি মৌলিক অঙ্গীকার বিদ্যমান—
• আনুগত্যের অঙ্গীকার,
• সহায়তা ও নুসরতের অঙ্গীকার।
এই দুই অঙ্গীকারই ঈমানভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি। তিনি বলেন, যে উম্মাহ নিয়ামতে তাম্মাহর অধিকারী, তার ওপর প্রধান দায়িত্ব হলো পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
অঙ্গীকার ভঙ্গের পরিণতি
আয়াতুল্লাহ আরাকি সতর্ক করে বলেন, যখন কোনো উম্মাহ অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন নিয়ামত রূপান্তরের সুন্নাত কার্যকর হয় এবং এর পরিণতিতে নেমে আসে লাঞ্ছনা, আল্লাহর গজব ও হৃদয়ের কঠোরতা।
তিনি কুরআনের আলোকে ইহুদিদের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তারা হেদায়েতের বাহক হওয়ার পরিবর্তে ইতিহাসে দুর্নীতি ও সংকট সৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত হয়।
চুক্তিভঙ্গকারী উম্মাহ নিজস্ব মর্যাদা হারিয়ে ঐশী হেদায়েতের প্রধান অন্তরায়ে পরিণত হয়।
‘ইস্তিবদাল’—ইতিহাসের আরেকটি অবশ্যম্ভাবী সুন্নাত
তিনি ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হিসেবে ‘ইস্তিবদাল’ (প্রতিস্থাপন)-এর কথা উল্লেখ করে বলেন,
নিয়ামত রূপান্তরের পর আল্লাহ অন্য একটি উম্মাহকে চুক্তিভঙ্গকারী উম্মাহর স্থলাভিষিক্ত করেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আল্লাহর লক্ষ্য কখনো ব্যাহত হয় না এবং কোনো জাতিই ঐশী সুন্নাত বাস্তবায়নের পথে স্থায়ী বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।
তার ভাষায়, এই সুন্নাত ইসলামি উম্মাহর ইতিহাসেও কার্যকর হয়েছে এবং কারবালার ঘটনা হলো নিয়ামত রূপান্তর ও চুক্তিভঙ্গের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, কুরআন ইসলামি উম্মাহর ভেতরে দুটি প্রবাহের কথা উল্লেখ করে— একটি প্রবাহ চুক্তিভঙ্গ করে, আর অন্যটি সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকে।
বিশ্বস্ত উম্মাহ ও চলমান ঐতিহাসিক সংগ্রাম
আয়াতুল্লাহ আরাকি উপসংহারে বলেন, বিশ্বস্ত উম্মাহই সেই নবীন উম্মাহ, যাদের প্রতি কুরআনে বিশেষ সম্বোধন রয়েছে এবং যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক অভিযাত্রার বাহক।
তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আজও চুক্তিভঙ্গকারী ধারা ও বিশ্বস্ত উম্মাহর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং এই ঐতিহাসিক সংগ্রাম ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর জুহুর পর্যন্ত চলতে থাকবে।
আপনার কমেন্ট