বৃহস্পতিবার ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১১:৩৫
কীভাবে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর হৃদয় আনন্দিত করা যায়?

আমাদের আনুগত্য ও দাসত্ব ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–কে আনন্দিত করে এবং অবাধ্যতা ও গুনাহ তাঁকে কষ্ট দেয়। তিনি আমাদের অবস্থা সম্পর্কে আমাদের আগেই অবগত হন—আমরা আনন্দিত হলে তিনি আমাদের আগেই আনন্দিত হন এবং আমরা দুঃখিত হলে তিনি আমাদের আগেই দুঃখ অনুভব করেন। কারণ, আমাদের সকল আমল তাঁর নিকট উপস্থাপিত হয়। তিনি আল্লাহ তাআলার ফয়েযের মাধ্যম এবং আমাদের কাজকর্মের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: সত্যিকার অপেক্ষাকারীদের (মুনতাজিরদের) অন্যতম প্রধান চিন্তা হলো—আমরা কীভাবে আমাদের ইমাম যামানার (আ.ফা.) সন্তুষ্টি ও আনন্দ অর্জন করতে পারি। এ জন্য কি বিশেষ বা অলৌকিক কোনো আমল প্রয়োজন, নাকি সাধারণ ও দৈনন্দিন জীবনেই তা অর্জন করা সম্ভব?

এই প্রশ্নের দলিলভিত্তিক ও দ্বীনসম্মত উত্তর জানার জন্য নৈতিকতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ফারাজি–এর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। নিচে সেই আলাপের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরা হলো:

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ফারাজির বক্তব্য
পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার হুজ্জাত হিসেবে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে সর্বাধিক নিকটবর্তী মানব এবং তাঁর দায়িত্ব নবী ও আল্লাহর ওলিদের রিসালতের ধারাবাহিকতা—অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে আহ্বান করা, তাদের সরল পথে পরিচালিত করা এবং হেদায়েতের পথে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

সুতরাং, যে ব্যক্তি এই ঐশী আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ইমাম মাহদী (আ.) নির্ধারিত পথে অগ্রসর হয়, সে নিজের সামর্থ্য ও প্রস্তুতির পরিমাণ অনুযায়ী তাঁর পবিত্র হৃদয়কে আনন্দিত করে।

বাস্তবতা হলো, ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আমাদের দাসত্ব, আনুগত্য ও ইবাদতের মাত্রা অনুযায়ী সন্তুষ্ট হন। আমরা যত বেশি আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করি এবং ইবাদতে আত্মনিয়োগ করি, তত বেশি তাঁর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। আর যখন—আল্লাহ না করুন—আমরা এই দাসত্বের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নফসের প্রবৃত্তি ও শয়তানের কুমন্ত্রণার অনুসরণ করি, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা তাঁর পবিত্র হৃদয়কে ব্যথিত করি এবং তাঁকে অসন্তুষ্ট করি।

অতএব, যদি এই প্রশ্নের উত্তর এক বাক্যে দিতে হয়, তবে তা হবে— “আমাদের আনুগত্য ও দাসত্ব ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–কে আনন্দিত করে, আর গুনাহ ও অবাধ্যতা তাঁকে কষ্ট দেয়।”

এই অর্থই বিভিন্ন হাদীস ও রেওয়ায়েতে গুরুত্বসহকারে বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্ণিত আছে—একদিন আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) জুমার নামাজ আদায়ের পর এক ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টি দিলেন, যিনি জামাতে উপস্থিত ছিলেন। নামাজ শেষে তিনি তাঁকে ডাকলেন। ঐ ব্যক্তি ইমামের নিকট উপস্থিত হলে তিনি বললেন, “আমি লক্ষ্য করেছি, নামাজের সময় তুমি বিষণ্ন ও মনখারাপ অবস্থায় ছিলে।”

ব্যক্তি বললেন, “জ্বি, হে আমিরুল মু’মিনীন! আজ আমি মনখারাপ নিয়েই জুমার নামাজে এসেছি, যেন আপনার উপস্থিতিতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয়। কিন্তু আপনি কীভাবে জানতে পারলেন যে আমি বিষণ্ন ছিলাম?”

আমিরুল মু’মিনিন (আ.) উত্তরে বললেন, “জেনে রাখো, তোমাদের এমন কোনো কষ্ট নেই, যা তোমাদের আগে আমরা অনুভব করি না। আর তোমাদের এমন কোনো আনন্দ নেই, যার আনন্দে আমরা তোমাদের আগে আনন্দিত হই না। তোমরা অসুস্থ হওয়ার আগেই আমরা সেই অসুস্থতা অনুভব করি।”

এই মহান বাণী এক গভীর ও বিস্ময়কর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আহলে বাইত (আ.) আল্লাহ তাআলার ফয়েযের মাধ্যম। গায়েবের জগত থেকে মানুষের কাছে যে কোনো নিয়ামত ও অনুগ্রহ পৌঁছায়, তা অবশ্যই এই পবিত্র মাধ্যম দিয়েই অতিক্রম করে আসে। অনুরূপভাবে, মানুষের যে কোনো আমল, ইবাদত ও সৎকর্ম যখন মালাকুতের জগতে ঊর্ধ্বগামী হয়ে আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে, তাও এই ফয়েযের মাধ্যম দিয়েই গমন করে।

রেওয়ায়েতে আরও বর্ণিত হয়েছে যে আমাদের আমল প্রতিদিন অথবা কিছু বর্ণনা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে—বিশেষ করে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার—আহলে বাইত (আ.)–এর সামনে উপস্থাপিত হয়। এটি তাঁদের ফয়েযের মাধ্যম ও সুপারিশকারী হওয়ার মহান সত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

অতএব, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)–এর হৃদয় আনন্দিত করা মূলত আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরতের পথে চলা এবং সেই ধারাবাহিক ফয়েযের স্রোতে নিজেকে সম্পৃক্ত করা, যা তাঁর বরকতময় অস্তিত্বের মাধ্যমে সমগ্র সৃষ্টিজগতে প্রবাহিত হয়।

নিশ্চয়ই, ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আল্লাহ তাআলার ফয়েযের সর্বোচ্চ মাধ্যম। আমাদের সকল কাজ, কথা, আচরণ ও চিন্তা তাঁর পবিত্র দরবারে উপস্থিত হয় এবং তিনি সবকিছুর উপর অবহিত ও সাক্ষী।

আমাদের কোনো গুনাহ যখন তাঁর সামনে সংঘটিত হয়, তখন তা তাঁর পবিত্র হৃদয়কে ব্যথিত ও দুঃখিত করে। অপরদিকে, আমরা যখন সৎকর্ম ও নেক আমল সম্পাদন করি, তখন তা তাঁর পবিত্র হৃদয়ে আনন্দ ও সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে এবং তিনি আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করেন—যেন আল্লাহ আমাদের তাওফিক বৃদ্ধি করেন এবং এই সৎ পথে অবিচল থাকার শক্তি দান করেন।

এমনকি আমাদের গুনাহ ও ত্রুটির ক্ষেত্রেও তিনি আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করেন— যেন আমরা নফসের কুমন্ত্রণার ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকি।

সুতরাং, ইমামে যামানা (আ.ফা.)–এর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমাদের অবশ্যই সৎকর্মে সচেষ্ট হতে হবে, নিজেদের চরিত্র ও আচরণ সংশোধন করতে হবে এবং সব ধরনের গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকতে হবে।

পরিশেষে, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করি—তিনি যেন আমাদের সবাইকে এই মহান তাওফিক দান করেন, যাতে আমরা তাঁর উত্তম বান্দা হতে পারি, ইমামে যামানা (আ.ফা.)–এর প্রকৃত সহায়ক হতে পারি এবং আমাদের আমল, কথা ও চিন্তার মাধ্যমে তাঁর পবিত্র হৃদয়কে আনন্দিত ও সন্তুষ্ট করতে পারি।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha