হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি আজ পূর্বাহ্নে ২৭তম হাওজা বর্ষসেরা গ্রন্থ সম্মেলন ও ৯ম হাওজা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উৎসবে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি ইমাম মুসা কাজিম (আ.) মাদরাসার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি শাবান মাস, হযরত বাকিয়াতুল্লাহিল আযম (আ.জ.)-এর পবিত্র জন্মবার্ষিকী এবং মোবারক ফজরের দশক (দাহে ফজর)-এর দিনগুলোর স্মরণে শুভেচ্ছা জানান এবং এই সম্মেলনে উপস্থিত আলেম, শিক্ষক, গবেষক ও হাওজার জ্ঞানীদের উপস্থিতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আয়াতুল্লাহুল উযমা জাওয়াদি আমুলির বার্তা ও বক্তব্যের জন্যও কৃতজ্ঞতা জানান এবং গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও থিসিস বিভাগে নির্বাচিতদের অভিনন্দন জানান। পাশাপাশি শীর্ষস্থান অর্জনকারী প্রকাশক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান, আয়োজক, বিচারক ও হাওজা বর্ষসেরা গ্রন্থ সম্মেলনের সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান।
ইসলামী নব-সভ্যতার রূপরেখা প্রণয়ন; হাওজার কৌশলগত দায়িত্ব
হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক “অগ্রণী ও শ্রেষ্ঠ হাওজা” শীর্ষক ঘোষণাপত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এই নথির পঞ্চম অক্ষ হলো “ইসলামের বিশ্ববার্তার কাঠামোর মধ্যে সভ্যতাগত উদ্ভাবন”। তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল নথিতে ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা হাওজার প্রতি এটিকেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি ১৯৬৩ সালে পাহলভি শাসকদের হামলার পর ফায়যিয়্যা মাদরাসায় ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতার ঐতিহাসিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন: সে সময় ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠার কথা বলা কারও কারও কাছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনে হতে পারে, কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে—ঈমান ও অবিচলতা প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে এবং আল্লাহর বিধান শত্রুর ষড়যন্ত্রের ওপর বিজয়ী হয়।
তিনি যোগ করেন: ইসলামী নব-সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ পার্থিব লক্ষ্য, আর এ পথে হাওজা ইলমিয়ার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুতর। প্রথমে এই সভ্যতার কাঠামো নকশা করতে হবে, তারপর তার ব্যাখ্যা, প্রচার ও সংস্কৃতিরূপ দিতে হবে। এই দায়িত্ব “বালাগে মুবীন”-এর সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন: ইসলামী দর্শনকে তার মৌলিক বিষয়গুলোর সামাজিক বিস্তার নির্ধারণ করতে হবে এবং ফিকহকেও দৃষ্টিসীমা প্রসারিত করে ও নতুন উদ্ভূত বিষয়ে ইজতিহাদি উদ্ভাবনের মাধ্যমে সভ্যতাগত বিধান ও কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
শহীদ সাদর; সমকালীন ইসলামী চিন্তার স্থপতি
হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ মুহাম্মদ বাকির সাদরের বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী অবস্থান ব্যাখ্যা করে তাকে সমকালীন ইসলামী চিন্তার অন্যতম মহান স্থপতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
তিনি বলেন, শহীদ সাদর ৪৭ বা ৪৮ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন। তার প্রতিভা ও জ্ঞানগভীরতা এমন ছিল যে আজ ফিকহ, উসূল, কালাম ও তাফসিরের পাঠে তার নবতর মতামত শক্ত উপস্থিতি রাখছে।
আয়াতুল্লাহ আরাফি শহীদ সাদরের “ফালসাফাতুনা” ও “ইকতিসাদুনা”-সহ স্থায়ী গ্রন্থসমূহের প্রসঙ্গ তুলে বলেন: যখন উদারবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তার করছিল, তখন এই গ্রন্থগুলো চিন্তার সমীকরণ বদলে দেয় এবং ইসলামী ধারাকে নতুন জ্ঞানগত শক্তি প্রদান করে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন: শহীদ সাদর প্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তাধারাকে গভীর ও মৌলিকভাবে জানতেন, সেগুলো ন্যায়সঙ্গত ও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন, তারপর সুদৃঢ় ও পদ্ধতিগত সমালোচনার মাধ্যমে জবাব দিতেন। তিনি কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ছিলেন না; বরং বিকল্প ও সুশৃঙ্খল ইসলামী তত্ত্ব উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
সংবিধান রক্ষাকর্তা পরিষদের ফকিহ সদস্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবাহ সম্পর্কে অবহিত থাকা, গভীর ইজতিহাদি ক্ষমতা, প্রভাবশালী লেখনী ও বক্তৃতাশৈলী, এবং দর্শন, অর্থনীতি, ইনডাক্টিভ লজিক ও কুরআন তাফসিরে নতুন পদ্ধতি উপস্থাপন—এসবই শহীদ সাদরের অনন্য বৈশিষ্ট্য। তিনি বিপ্লবী বক্তব্য থেকে দূরে সরে যেতে পারতেন, কিন্তু ইমাম ও ইসলামী বিপ্লবের সমর্থনে নিজের সমগ্র সত্তা ও ভবিষ্যৎ উৎসর্গ করেছিলেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন: গত একশ বছরে ইসলামী চিন্তার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের তালিকা করলে ইমাম খোমেইনি ও আল্লামা তাবাতাবাঈর পর শহীদ সাদর উজ্জ্বল সূর্যের মতো দীপ্তিমান।
আয়াতুল্লাহ ফাইয়াজীর সম্মাননা ও হাওজা বর্ষসেরা গ্রন্থের অবস্থান
এই অনুষ্ঠানে আয়াতুল্লাহ ফাইয়াজীর বৈজ্ঞানিক মর্যাদাকেও সম্মাননা জানানো হয়। আয়াতুল্লাহ আরাফি এই বিশিষ্ট শিক্ষকের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের বৈজ্ঞানিক সাধনার কথা উল্লেখ করে তাকে হাওজা ইলমিয়ার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হিসেবে অভিহিত করেন।
হাওজা বর্ষসেরা গ্রন্থ উৎসব সম্পর্কে হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক বলেন: হাওজা বর্ষসেরা গ্রন্থ হলো হাওজাভিত্তিক গবেষণার প্রতিচ্ছবি, যদিও এটি এখনো হাওজার সব গবেষণা-সামর্থ্যকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত করে না। আমাদের বৈজ্ঞানিক অর্জন উপস্থাপনায় নিষ্ক্রিয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং এই আয়োজনকে ভবিষ্যৎ হাওযা গবেষণাকে দিকনির্দেশনার একটি কৌশলগত উপকরণে রূপান্তর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন: হাওজা বর্ষসেরা গ্রন্থকে ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হতে হবে এবং জ্ঞান-নেতৃত্ব ও চিন্তা-উৎপাদনের পথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
হাওজা ইলমিয়ায় নতুন পরিবর্তনসমূহ
আয়াতুল্লাহ আরাফি হাওজা ইলমিয়ায় সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১) সমকালীন ফিকহের সম্প্রসারণ
২) “ফিকহে নিযামাত” ও দার্শনিক চিন্তার মতো ক্ষেত্রে জ্ঞান-নেতৃত্বকারী কমিটি গঠন
৩) ছয়টি জ্ঞানক্ষেত্রে উচ্চতর গবেষণামূলক পাঠক্রম চালু
৪) দারসে খারিজের দ্বিতীয় স্তরকে আরও গভীরতর করা
৫) প্রাচীন ও শিকড়সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী পাঠ্য ও পাঠক্রমকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান
৬) হাওযার শতবর্ষীয় কর্মসম্পাদন নিয়ে বহু-খণ্ডের গ্রন্থ প্রকাশ
৭) প্রদেশগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে দারসে খারিজ ও শিক্ষাবিভাগ সম্প্রসারণ
৮) গবেষক-তথ্যব্যবস্থা প্রণয়ন, র্যাংকিং ও লক্ষ্যভিত্তিক গবেষণা কাঠামো তৈরি
৯) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তনসমূহ এবং ইসলামী জ্ঞানের সাথে তার সম্পর্কের প্রতি বিশেষ মনোযোগ
শেষে হাওজা ইলমিয়ার পরিচালক ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষক ও তরুণ তালিবে ইলমদের ভূমিকায় জোর দিয়ে বলেন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে জ্ঞানগত পরিবর্তন ও নতুন উদ্ভূত প্রশ্নের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এসব মোকাবিলায় হাওজার তরুণ প্রজন্মের দ্বিগুণ প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতাগত অঙ্গনে সক্রিয় ও প্রভাবশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারি।
আপনার কমেন্ট