মঙ্গলবার ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১০:১৫
কুরআনের শিক্ষা | সালাতে খুশু অর্জনের চাবিকাঠি: কী করা উচিত?

মানুষের প্রকৃত সৌভাগ্য অর্জন এবং তাকে একজন সত্যিকারের মুমিনের গুণাবলিতে অলংকৃত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো সালাতে খুশু ও বিনয় অর্জন। এখানে ‘খুশু’ বলতে কেবল সালাতের বাহ্যিক স্থিরতা বোঝানো হয়নি; বরং তা অন্তরের গভীর মনোনিবেশ ও আত্মসমর্পণ পর্যন্ত বিস্তৃত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র কুরআন মুমিনদের একটি বিশুদ্ধ গুণের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন—

 قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ؛ الَّذِینَ هُمْ فِی صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ.

“নিশ্চয়ই মুমিনগণ সফলকাম; যারা তাদের সালাতে খুশু অবলম্বন করে।” [সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩: ১–২]

খুশুর তাৎপর্য
সালাত আদায়ের সময় খুশু একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই গুণই তার সাফল্য ও কল্যাণের চাবিকাঠি। অতএব, যদি আমরা প্রকৃত সুখ ও নাজাত অর্জন করতে চাই, তবে আমাদের সালাতে খুশু সৃষ্টি ও তা দৃঢ় করতে হবে। এজন্য খুশুর প্রকৃত স্বরূপ এবং তা অর্জনের উপায় জানা জরুরি।

খুশু কেবল বাহ্যিক আচরণ—যেমন ধীরস্থিরতা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সংযম এবং দৃষ্টি নত রাখা—এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এতে অন্তরের উপস্থিতি এবং একমাত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ মনোনিবেশ অন্তর্ভুক্ত।

এ প্রসঙ্গে জাফর আস-সাদিক (আ.) বলেছেন—

 اَلْخُشُوعُ غَضُّ اَلْبَصَرِ فِی اَلصَّلاَةِ

“সালাতে দৃষ্টি নত রাখাই খুশু।”

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

اَلْخُشُوعُ فِی اَلْقَلْبِ.

“খুশু অন্তরের মধ্যে।”

অতএব, আল্লাহ তাআলার সামনে—বিশেষত সালাতে দাঁড়িয়ে—খুশু ও বিনয়ের প্রকৃত অর্থ কেবল বাহ্যিক ভঙ্গিমায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা অন্তরের গভীর অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

খুশুর পূর্ণাঙ্গ রূপ
মুহাম্মদ আল-বাকির (আ.) এক বর্ণনায় জুরারাহকে রুকুর পদ্ধতি শিক্ষা দিতে গিয়ে এমন একটি জিকির শিক্ষা দেন, যাতে মানুষের সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সত্তার খুশু আল্লাহর প্রতি নিবেদিত হয়—

 ... وَ أَنْتَ رَبِّی خَشَعَ لَکَ قَلْبِی وَ سَمْعِی وَ بَصَرِی وَ شَعْرِی وَ بَشَرِی وَ لَحْمِی وَ دَمِی وَ مُخِّی وَ عِظَامِی وَ عَصَبِی ...

“হে আমার প্রতিপালক! আমার হৃদয়, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টি, চুল, ত্বক, মাংস, রক্ত, মস্তিষ্ক, অস্থিসমূহ ও স্নায়ু—সবই আপনার সামনে খুশু অবলম্বন করেছে।”

এভাবে বোঝা যায়, সালাতে খুশুর প্রকৃত অর্থ হলো ইনকিতাআ ইলাল্লাহ—অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে হৃদয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল তাঁর সঙ্গেই সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হওয়া।

এ কারণেই ইমান জয়নুল আবেদীন (আ.) মুনাজাতে শাবানিয়ায় প্রার্থনা করেন—

 إِلَهِی هَبْ لِی کَمَالَ اَلاِنْقِطَاعِ إِلَیْکَ

“হে আমার উপাস্য! আমাকে আপনার প্রতি পূর্ণাঙ্গভাবে নিবিষ্ট হওয়ার তাওফিক দান করুন।”

খুশু অর্জনের পথ
তাহলে প্রশ্ন—কীভাবে এই খুশু অর্জন করা সম্ভব?
এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা যায়। তবে সারকথা হলো—সবকিছুর সূচনা ‘আল্লাহু আকবার’-এর গভীর উপলব্ধি থেকে; যে বাক্যটি সালাতের সূচনা ঘোষণা করে। মানুষ তখনই বিনয়ী ও খুশুসম্পন্ন হয়, যখন সে আল্লাহর অসীম মহত্ত্ব হৃদয়ে ধারণ করে।

আল্লাহর মহানতার এই সচেতন উপলব্ধিই মানুষের অন্তর থেকে অহংকার, আত্মগরিমা ও ঔদ্ধত্যের শিকড় উপড়ে দেয় এবং তাকে অসীম প্রতিপালকের সামনে এক অনুগত ও বিনম্র বান্দায় পরিণত করে।

সূত্র:

১. সূরা আল-মু’মিনূন [২৩]: ১–২।

২. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৮১, পৃষ্ঠা ২৬৪।

৩. মুস্তাদরাকুল ওয়াসায়েল, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫।

৪. আল-কাফি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩১৯।

৫. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৯১, পৃষ্ঠা ৯৬।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha