রবিবার ৩১ মে ২০২৬ - ১০:৫৬
মুনাযারা: দুই খোদায় বিশ্বাসী এক ব্যক্তির সঙ্গে ইমাম সাদিক (আ.)-এর বিতর্ক

দুই খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস ছিল এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে ইমাম সাদিক (আ.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ইসলামী চিন্তার ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি দ্বৈতবাদী বিশ্বাসের অসারতা তুলে ধরেন এবং আল্লাহর একত্বের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মুহাম্মদ মুহাম্মদী ইশতেহারদী রচিত ‘একশ একটি আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয় বিতর্ক’ গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

এক ব্যক্তি, যিনি দ্বৈতবাদে বিশ্বাস করতেন, ইমাম সাদিক (আ.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তার ধারণা ছিল, বিশ্বজগতের দুটি খোদা রয়েছে—একজন কল্যাণের খোদা এবং অন্যজন অকল্যাণের খোদা।

ইমাম সাদিক (আ.) এই বিশ্বাসের খণ্ডন করে বলেন, যদি তোমার দাবিমতো দুই খোদা থাকে, তাহলে বিষয়টি তিনটি অবস্থার বাইরে হতে পারে না—

১. উভয়েই শক্তিশালী ও অনাদি।

২. একজন শক্তিশালী এবং অন্যজন দুর্বল।

৩. উভয়েই দুর্বল।

প্রথম অবস্থা: উভয়েই শক্তিশালী ও অনাদি
যদি উভয়েই শক্তিশালী ও অনাদি হয়, তাহলে একজন কেন অন্যজনকে সরিয়ে দিয়ে এককভাবে বিশ্ব পরিচালনা করে না?

অন্যদিকে, বিশ্বজগতের সর্বত্র যে একক শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য বিদ্যমান, তা প্রমাণ করে যে সমগ্র সৃষ্টিজগতের পরিচালনাকারী একজনই। অতএব, খোদা এক এবং সর্বশক্তিমান।

দ্বিতীয় অবস্থা: একজন শক্তিশালী, অন্যজন দুর্বল
যদি একজন শক্তিশালী এবং অন্যজন দুর্বল হয়, তাহলে শক্তিশালী সত্তাটিই খোদা হওয়ার উপযুক্ত। আর দুর্বল সত্তা তার অক্ষমতার কারণে খোদা হতে পারে না।

সুতরাং এ অবস্থাতেও এক খোদার অস্তিত্বই প্রমাণিত হয়।

তৃতীয় অবস্থা: উভয়েই দুর্বল
আর যদি উভয়েই দুর্বল হয়, তাহলে তারা কেউই খোদা হওয়ার যোগ্য নয়।

এ ছাড়া যদি বলা হয়, তারা কিছু ক্ষেত্রে অভিন্ন এবং কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন, তাহলে অবশ্যই এমন একটি কারণ বা বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, যা তাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেছে।

সে ক্ষেত্রে সেই বৈশিষ্ট্যটিকেও একটি স্বতন্ত্র ও অনাদি সত্তা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। ফলে দুই খোদার পরিবর্তে তিন খোদা মেনে নিতে হবে।

একই যুক্তি অব্যাহত থাকলে তিন থেকে চার, চার থেকে পাঁচ—এভাবে খোদার সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত অসীম সংখ্যক খোদার অস্তিত্ব স্বীকার করতে হবে; যা যুক্তি ও বুদ্ধির বিচারে গ্রহণযোগ্য নয়।

হিশাম ইবনে হাকাম বর্ণনা করেন, বিতর্কের একপর্যায়ে সেই দ্বৈতবাদী ব্যক্তি আল্লাহর অস্তিত্বের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ইমাম সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞেস করল, “আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ কী?”

ইমাম (আ.) উত্তরে বললেন, “এত বিপুল সৃষ্টি ও সৃষ্ট বস্তুর অস্তিত্বই স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ। যেমন তুমি যখন একটি সুদৃঢ়, সুউচ্চ ও সুশৃঙ্খল ভবন দেখ, তখন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পার যে এর একজন নির্মাতা রয়েছে—যদিও তুমি তাকে দেখনি।”

লোকটি আবার প্রশ্ন করল:, “আল্লাহ কী?”

ইমাম সাদিক (আ.) বললেন, “আল্লাহ এমন এক সত্য, যিনি সমস্ত সৃষ্টির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর অস্তিত্ব স্বীকার করার অর্থ হলো এক বাস্তব ও বিদ্যমান সত্যকে স্বীকার করা। তবে তিনি কোনো দেহ নন এবং তাঁর কোনো আকৃতি নেই।

বাহ্যিক ইন্দ্রিয় তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না এবং চিন্তাশক্তি তাঁর সত্তার প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে সক্ষম নয়। সময়ের পরিবর্তন তাঁর ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না এবং পরিবর্তন বা অপূর্ণতা তাঁর সত্তায় কোনো স্থান পায় না।”

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha