হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ মুজতাহেদি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন মীরহাশেম হুসাইনি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সামতে খোদা’-তে কুরআনিক পরিবারের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, পরিবার প্রতিষ্ঠা ও তার উৎকর্ষ সাধনের জন্য এক ধরনের ‘শান্তির স্থাপত্য’ অনুসরণ করা জরুরি। কারণ একটি পরিবার গঠন করে তাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো একটি ভবন নির্মাণের মতো; এর জন্য যথাযথ সতর্কতা, ধৈর্য, যত্ন এবং মূলনীতিগুলো মেনে চলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কুরআনিক পরিবারের প্রথম মানদণ্ড হলো শান্তির স্থাপত্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। এরপর পরিবারে ভালোবাসা ও রহমতের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। যে পরিবার পারস্পরিক ভালোবাসা ও রহমতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তা তার সদস্যদের বিকাশের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশে পরিণত হতে পারে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন হুসাইনি “هُنَّ لِباسٌ لَکُم وَ أَنتُم لِباسٌ لَهُنَّ”-এই আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য পোশাকের মতো হওয়া উচিত; অর্থাৎ একে অপরের ত্রুটি আড়াল করবেন এবং পরস্পরের সম্মান ও মর্যাদার রক্ষক হবেন। গোপনীয়তা রক্ষা, সম্মান বজায় রাখা এবং ঘর ও পরিবারের গোপনীয়তা সংরক্ষণ-পরিবারের সদস্যদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তানদের পারস্পরিক সম্পর্কেও এই সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখতে হবে।
তিনি “الطَّیِّباتُ لِلطَّیِّبینَ وَالطَّیِّبونَ لِلطَّیِّباتِ” এবং “الخَبیثاتُ لِلقَبیثینَ وَالخَبیثونَ لِلقَبیثاتِ”-এই আয়াতগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, পরিবার গঠনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা। একজন মানুষকে জীবনের শুরুতেই নিজের মানদণ্ডগুলো সঠিকভাবে চিনতে হবে এবং যথাসম্ভব নৈতিক ও কুরআনিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্বাচন করার চেষ্টা করতে হবে।
আয়াতুল্লাহ মুজতাহেদি মাদরাসার প্রধান আরও বলেন, কেউ হয়তো বলতে পারেন, আমি একজন ধর্মপরায়ণ ও নীতিবান মানুষ ছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে আমার জীবনসঙ্গীর আচরণ পরিবর্তিত হয়ে ভুল পথে চলে গেছে।
মানুষকে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ও সঠিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তবে পরবর্তী জীবনে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে এমনটা ভাবা উচিত নয় যে, সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বরং সঠিক পথ অব্যাহত রাখতে হবে এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করতে হবে।
এরপর তিনি হযরত আসিয়া (সা.) ও ফেরাউনের ঘটনা উল্লেখ করে এটিকে মানুষের অন্তরের পবিত্রতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ফেরাউন যখন শিশুদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন হযরত আসিয়া (সা.) সেই শিশুটির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছিলেন, যাকে হত্যা করার কথা ছিল।
তিনি ফেরাউনকে শিশুটিকে হত্যা না করে তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। যেমন কুরআনে তাঁর বক্তব্য এসেছে: “قُرَّتُ عَینٍ لی وَلَکَ”-“সে আমার ও তোমার চোখের শীতলতা (প্রশান্তির কারণ)।” একটি শিশুর প্রতি এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও রহমত দেখায় যে, মানুষের ভাষা ও নিয়ত তার জীবনের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন হুসাইনি সন্তান গ্রহণ ও সন্তান প্রতিপালনের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সন্তানের আগমনকে মানুষের শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত এবং শুরু থেকেই সন্তানকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়।
একইভাবে, অভিভাবকহীন ও দুর্বল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের সহায়তা ও অভিভাবকত্ব গ্রহণও এই মহৎ দৃষ্টিভঙ্গির একটি উদাহরণ হতে পারে। ইতিহাসে বহু মহান ব্যক্তি ও আল্লাহওয়ালা আলেম অভিভাবকহীন শিশুদের নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে তাদের লালন-পালন ও শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, হযরত আসিয়া (সা.) এমন একটি শিশুর প্রতিও কল্যাণকামী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছিলেন, যে তাঁর নিজের সন্তান ছিল না। তাঁর এই ভালোবাসা ও পবিত্রতার মানসিকতাই তাঁকে মহান মর্যাদায় উন্নীত করেছিল। পবিত্র কুরআন তাঁকে ঈমানদারদের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং ইসলামী ও ঈমানের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নারীদের সঙ্গে তাঁর নাম অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ মুজতাহেদি মাদরাসার প্রধান সমাজে নেককার মানুষের প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাওযা, শহর, মহল্লা ও পেশাজীবী সমাজে এমন কিছু পবিত্র ও নিষ্ঠাবান মানুষ রয়েছেন, যারা হয়তো পরিচিত নন; কিন্তু তাঁদের পবিত্র নিয়ত ও সাধনা সমাজে বরকতের উৎস হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা এই পবিত্র হৃদয়ের মানুষ ও নেককারদের সাধনার বরকতে সমাজের ওপর তাঁর রহমত নাজিল করেন।
পরিবারেও ভালোবাসা ও রহমতের একই প্রভাব রয়েছে। যখন পিতা-মাতা সন্তানদের ভালোবাসা ও রহমতের সঙ্গে দেখেন এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শন করেন, তখন বহু ধরনের ক্ষতি ও বিপদ কমে আসে। একটি সুস্থ পরিবার মানুষের জন্য আশা, প্রশান্তি ও বিকাশের উৎস হতে পারে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন হুসাইনি মানুষের সাফল্যের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, কোনো ব্যক্তি জীবনের কোনো ক্ষেত্রে সফল হলে তার পরিবার, জীবনসঙ্গী, পিতা-মাতা ও সন্তানদের ধন্যবাদ জানানো উচিত।
কারণ মানুষের মানসিকতা ও সাফল্যের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যদি নিজের ঘরে শান্তি ও সুস্থ মানসিক পরিবেশ না পান, তাহলে তিনি সমাজে আশার সঞ্চার করতে এবং অন্যদের কর্মচঞ্চলতা ও প্রচেষ্টার দিকে আহ্বান জানাতে পারবেন না।
সন্তান প্রতিপালন যেন জবরদস্তিমূলক না হয়-এ বিষয়ে তিনি বলেন, পিতা-মাতার উচিত সন্তানের প্রতিভা, আগ্রহ ও সামর্থ্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। সন্তান যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, হাওযায় ধর্মীয় শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো পথে যেতে আগ্রহী হয়, তাহলে পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সঠিক পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তার বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং নিজেদের ইচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
সমাজ ও পরিবেশ মানুষের আচরণ পরিবর্তনে যে ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, শয়তান কখনো কখনো পরিবেশ, পরিস্থিতি ও চারপাশের আবহের মাধ্যমে মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। কোনো কিশোর বা তরুণের শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সঠিক ও সচেতনতামূলক কথাবার্তাও হয়তো প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে না। তাই মানুষ অনুপযুক্ত পরিবেশে প্রবেশ করার আগেই তার সঠিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কখনো মানুষ “পরে সংশোধন করে নেব” অথবা “এক রাত তো হাজার রাত নয়”-এই ধরনের চিন্তা করে কোনো কাজ পিছিয়ে দেয়। কিন্তু এই সামান্য বিলম্বই কখনো কখনো ভুল পথে যাত্রার সূচনা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষের নিজেকে পতন থেকে নিরাপদ মনে করা উচিত নয় এবং এমন ধারণাও করা উচিত নয় যে, আজ সে সঠিক পথে রয়েছে বলেই ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবে সব ধরনের ক্ষতি ও বিপদ থেকে নিরাপদ থাকবে।
আয়াতুল্লাহ মুজতাহেদি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নৈতিকতাবিদ আলেমদের জীবনধারার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, মহান ব্যক্তিত্বদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল নিজেদের প্রতি অব্যাহত আত্মসচেতনতা ও আত্মসংযম।
মানুষের কখনোই এমন ধারণা করা উচিত নয় যে, সে এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে আর আত্মপর্যবেক্ষণের প্রয়োজন নেই। এমনকি তাকওয়া ও পরহেজগারিতার অধিকারী মহান ব্যক্তিরাও বিপুল ইবাদত ও সাধনা সত্ত্বেও সর্বদা নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক ও সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন হুসাইনি বলেন, সবচেয়ে বড় বিপদ হলো নিজেকে নিরাপদ ও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করা। কারও এমন ধারণা করা উচিত নয় যে, তার আর বিচ্যুত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
কারণ শয়তান বিভিন্ন পথের মাধ্যমে মানুষকে বিপথগামী করতে পারে এবং কখনো কখনো আপাতদৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক ও ভালো কাজের মাধ্যমেও মানুষকে প্রতারিত করতে পারে। তাই নিজের আচরণ ও নিয়তের প্রতি সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও মনোযোগ অপরিহার্য।
আয়াতুল্লাহ মুজতাহেদি মাদরাসার প্রধান এরপর জীবনসঙ্গী নির্বাচনের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি হলো জীবনসঙ্গী নির্বাচন। যদি একটি পরিবারকে শান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে শুরু থেকেই এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও মূল্যবোধগুলো বিবেচনায় নিতে হবে; তবে একই সঙ্গে অতিরিক্ত পরিপূর্ণতাবাদে (পারফেকশনিজমে) আক্রান্ত হওয়া যাবে না। কিছু মানুষ প্রত্যাশা করেন যে, অপর পক্ষের মধ্যে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সব বৈশিষ্ট্য একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে বিদ্যমান থাকবে; বাস্তবে এ ধরনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
জীবনসঙ্গী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আত্মমুগ্ধতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, কখনো কোনো ব্যক্তি নিজের পছন্দ ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। আর কোনো একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর ইচ্ছানুযায়ী না হলে তিনি অপর ব্যক্তির সব ভালো গুণকেই উপেক্ষা করেন। অথচ জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথমে অগ্রাধিকার ও মৌলিক মানদণ্ডগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সেগুলোর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন একজন মানুষ খোঁজা উদ্দেশ্য নয়, যার মধ্যে সম্ভাব্য সব ভালো বৈশিষ্ট্য সর্বোচ্চ মাত্রায় বিদ্যমান থাকবে। বরং মানুষের একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড ও মূল্যায়নের মাপকাঠি থাকা উচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক, ঈমানি, ব্যক্তিত্বগত ও পারিবারিক নীতির ভিত্তিতে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা উচিত।
সবশেষে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন হুসাইনি বলেন, মানুষ যদি জীবনের পথে আত্মসচেতন ও সতর্ক থাকে, নিজের নিয়ত সংশোধন করে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে এবং সংকটময় মুহূর্তে গড়িমসি না করে, তাহলে আল্লাহও তাকে নেক ও পবিত্র মানুষের সঙ্গে পথ চলার সুযোগ করে দেন।
আর যে পরিবার ভালোবাসা, রহমত, গোপনীয়তা রক্ষা, সম্মান-মর্যাদা সংরক্ষণ এবং সঠিক নির্বাচন-এর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই পরিবার একটি কুরআনিক ও প্রশান্তিদায়ক পরিবারে পরিণত হতে পারে।
আপনার কমেন্ট