বৃহস্পতিবার ১৮ জুন ২০২৬ - ১৪:২৭
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আশুরার আন্দোলন (কিয়াম)-এর উদ্দেশ্য

সৎকাজের আদেশ প্রদান এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ (আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার), সুন্নাহ বা নবীজির আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিদআত ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, শাহাদাত লাভের প্রত্যাশা, একটি ইসলামী সরকার/রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আহলে বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়েতসমূহ এবং ঐতিহাসিক ও কালামি (ধর্মতাত্ত্বিক) বিশ্লেষণের ভিত্তিতে শিয়া আলেম ও গবেষকগণ আশুরার কিয়ামে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এমনকি এ বিষয়ে বহু গ্রন্থও রচিত হয়েছে।

এই লেখায় সংক্ষেপে দুইটি দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর উদ্দেশ্যসমূহ তুলে ধরা হবে:

১. ইমাম হুসাইন (আ.)-এর খুতবা (ভাষণ) এবং আহলে বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়েতসমূহের আলোকে তাঁর উদ্দেশ্যসমূহের বিশ্লেষণ।

২. আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর উদ্দেশ্যসমূহের বিশ্লেষণ।

প্রথম উদ্দেশ্য: সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা (আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার)

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ভাষণসমূহ থেকে যে উদ্দেশ্যটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার। এই বিষয়টি তাঁর ভাই সম্মানিত মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়ার কাছে লেখা চিঠি এবং তাঁর কয়েকটি ভাষণে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়ার প্রতি পত্র

হযরত আবা আব্দিল্লাহ ইমাম হুসাইন (আ.) একটি পত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর আন্দোলনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে যে ইমাম হুসাইন (আ.) কোন উদ্দেশ্যে এই মহান কিয়াম (আন্দোলন) শুরু করেছিলেন:

أَنِّي لَمْ أَخْرُجْ أَشِراً وَ لَا بَطِراً وَ لَا مُفْسِداً وَ لَا ظَالِماً وَ إِنَّمَا خَرَجْتُ لِطَلَبِ الْإِصْلَاحِ فِي أُمَّةِ جَدِّي ص أُرِيدُ أَنْ آمُرَ بِالْمَعْرُوفِ وَ أَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ وَ أَسِيرَ بِسِيرَةِ جَدِّي وَ أَبِي عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ عليه السلام.

(মজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৪, পৃ. ৩২৯; ইবনে আ'সাম, আল-ফুতূহ, খণ্ড ৫, পৃ. ২১; প্রকাশক: দারুল আযওয়া, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হিজরি)

আমি মদিনা থেকে বের হইনি বিদ্রোহ, শত্রুতা, ফাসাদ সৃষ্টি বা জুলুম করার জন্য। বরং আমি আমার নানার উম্মতের মধ্যে সংস্কার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। আমি সৎকাজের আদেশ (আমর বিল মারুফ) এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার (নাহি আনিল মুনকার) ইচ্ছা রাখি। আমি আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং আমার পিতা আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর আদর্শ ও জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করতে চাই।

এই বরকতময় পত্রে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে সব ধরনের ভ্রান্ত ধারণা ও ভুল কল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে তাঁর কিয়াম (আন্দোলন) ছিল কেবল সংস্কার, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার বাস্তবায়নের জন্য।

আল-বাইযা অঞ্চলে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ভাষণ

ইমাম হুসাইন (আ.) “আল-বাইযা” নামক স্থানে, যেখানে তাঁর সঙ্গে হুরের বাহিনীর সাক্ষাৎ হয়েছিল, একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেই ভাষণ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে তাঁর আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তিনি কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই মহান কিয়াম পরিচালনা করেছিলেন।

إنّ الحسين خطب أصحابه وأصحاب الحر بالبيضة فحمد الله وأثنى عليه ثم قال: ايها الناس ان رسول الله صلى‏الله‏عليه‏و‏آله وسلم قال :

مَنْ رَأى سُلْطانا جائِرا مُسْتَحِلاً لِحُرُمِ اللّهِ ناكِثا لِعَهْدِ اللّهِ، مُخالِفا لِسُنَّةِ رَسُولِ اللّهِ، يَعْمَلُ فى عِبادِاللّهِ بِالاِْثْمِ وَالْعُدْوانِ، فَلَمْ يُغَيِّرْ عَلَيْهِ بِفِعْلٍ وَ لا قَوْلٍ، كانَ حَقّا عَلَى اللّهِ اَنْ يُدْخِلَهُ مَدْخَلَهُ ... .

(তারীখ আত-তাবারী, খণ্ড ৪, পৃ. ৩০৪–৩০৫; আল-কামিল ফিত-তারীখ, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৮; আল-ফুতূহ, খণ্ড ৫, পৃ. ৮১)

ইমাম হুসাইন (আ.) “আল-বাইযা” নামক স্থানে তাঁর সঙ্গীসাথী এবং হুরের বাহিনীর উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর বলেন-

হে মানুষ! আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো অত্যাচারী শাসককে দেখতে পায়, যে আল্লাহর হারামকে হালাল করে, আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, রাসূলুল্লাহর সুন্নাহর বিরোধিতা করে এবং আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে পাপ ও অত্যাচারের মাধ্যমে শাসন করে; অথচ সে ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে কথা বা কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ না করে, তাহলে আল্লাহর ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে তাকে সেই পরিণতির স্থানে নিক্ষেপ করার, যেখানে সেই অত্যাচারী শাসককে নিক্ষেপ করা হবে।

এই পুরো ভাষণজুড়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মহান লক্ষ্য, অর্থাৎ আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা)-এর কথাই বর্ণিত হয়েছে। সামান্য চিন্তা-ভাবনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু নিজের উদ্দেশ্যই মানুষের সামনে তুলে ধরেননি, বরং অন্যদেরও এই গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছেন।

এছাড়াও তিনি এই ফরজ দায়িত্ব-আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার-পালনের ক্ষেত্রে উদাসীনতা ও শৈথিল্য প্রদর্শন থেকে সতর্ক করেছেন এবং এর পরিণতি ও কুফলও ব্যাখ্যা করেছেন।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তাঁর সাথীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ

যখন হযরত আবা আব্দিল্লাহ ইমাম হুসাইন (আ.) অভিশপ্ত উমর ইবনে সা'দের বাহিনীর মুখোমুখি হন, তখন তিনি একটি অত্যন্ত সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। সেই ভাষণে তিনি তাঁর এই কিয়াম (আন্দোলন)-এর মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন।

প্রখ্যাত ও মহান আহলে সুন্নাত আলেম তাবারানী লিখেছেন:

لَمَّا نَزَلَ الْقَوْمُ بِالْحُسَيْنِ وَ أَيْقَنَ أَنَّهُمْ قَاتِلُوهُ قَالَ لِأَصْحَابِهِ قَدْ نَزَلَ مَا تَرَوْنَ مِنَ الْأَمْرِ وَ إِنَّ الدُّنْيَا قَدْ تَغَيَّرَتْ وَ تَنَكَّرَتْ وَ أَدْبَرَ مَعْرُوفُهَا وَ اسْتَمَرَّتْ حَتَّى لَمْ يَبْقَ مِنْهَا إِلَّا كَصُبَابَةِ الْإِنَاءِ وَ إِلَّا خَسِيسُ عَيْشٍ كَالْمَرْعَى الْوَبِيلِ أَلَا تَرَوْنَ الْحَقَّ لَا يُعْمَلُ بِهِ وَ الْبَاطِلَ لَا يُتَنَاهَى عَنْهُ لِيَرْغَبَ الْمُؤْمِنُ فِي لِقَاءِ اللَّهِ ....

(আল-মু'জামুল কাবীর, খণ্ড ৩, পৃ. ১১৫; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৯, পৃ. ১৯২; তারীখ মাদিনা দামিশ্ক, খণ্ড ১৪, পৃ. ২১৭–২১৮; সাইরে আ'লামুন নুবালা, খণ্ড ৩, পৃ. ৩১০; তারীখুল ইসলাম, খণ্ড ৫, পৃ. ১২; আল-মানাকিব, খণ্ড ৪, পৃ. ৬৮; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৪, পৃ. ১৯২)

নিশ্চয়ই দুনিয়া তার রূপ বদলে ফেলেছে এবং অপরিচিত হয়ে গেছে। এর কল্যাণ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন এর মধ্যে অবশিষ্ট আছে কেবল পাত্রের তলানিতে থাকা সামান্য আর্দ্রতার মতো কিছু এবং এমন এক দুর্বিষহ জীবন, যা এমন এক চারণভূমির ন্যায়, যেখানে রোগসৃষ্টিকারী ও মূল্যহীন ঘাস ছাড়া আর কিছু জন্মায় না।

তোমরা কি দেখছ না যে সত্য অনুযায়ী আমল করা হচ্ছে না এবং মিথ্যা ও বাতিল থেকে বিরত থাকা হচ্ছে না? এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের জন্য মৃত্যুকে এবং আল্লাহর সাক্ষাৎকে আকাঙ্ক্ষা করা যথার্থ।

এই ভাষণেও ইমাম হুসাইন (আ.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর মহান উদ্দেশ্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করছেন যে তিনি কিয়াম করেছেন, কারণ সত্যের অনুসরণ করা হচ্ছে না। এখানে “সত্য” বলতে “মারুফ” বা কল্যাণকর ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়কেই বোঝানো হয়েছে। সুতরাং, এই ভাষণেও তিনি তাঁর আন্দোলনের লক্ষ্য-আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য: সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

সেই সময়ের সমাজকে যে ভয়াবহ বিপর্যয় গ্রাস করেছিল, তার অন্যতম ছিল ধর্মে বিদআতের প্রসার এবং নববী সুন্নাহর বিলুপ্তি। ইমাম হুসাইন (আ.), যিনি উম্মতের পথপ্রদর্শক ও নেতা ছিলেন, নিজের ওপর কর্তব্য মনে করেছিলেন যে তিনি বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। তাঁর বক্তব্য ও বাণীতে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ইমাম (আ.) বাসরার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে এভাবে বলেন:

وأنا أدعوكم إلى كتاب الله وسنة نبيه فإن السنة قد أميتت وإن البدعة قد أحييت وإن تسمعوا قولي وتطيعوا أمري أهدكم سبيل الرشاد.

(আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারী (মৃত্যু: ৩১০ হিজরি), তারীখ আত-তাবারী, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮০, প্রকাশক: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত; আনসাবুল আশরাফ, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৫)

আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহর দিকে আহ্বান করছি। কারণ সুন্নাহ বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে এবং বিদআত জীবিত ও প্রচলিত হয়ে উঠেছে। যদি তোমরা আমার কথা শোন এবং আমার নির্দেশ মেনে চল, তবে আমি তোমাদেরকে সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করব।

এই বক্তব্যে ইমাম হুসাইন (আ.) স্পষ্টভাবে তাঁর আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন, তা হলো নববী সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করা এবং বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা

ইমাম (আ.) হুরের বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সময়ও এই বিষয়টির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন এবং পুনরায় এ উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করেন।

ألا إَنَّ هَؤُلَاءِ الْقَوْمَ قَدْ لَزِمُوا طَاعَةَ الشَّيْطَانِ وَ تَركوا طَاعَةِ الرَّحْمَنِ وَ أَظْهَرُوا الْفَسَادَ وَ عَطَّلُوا الْحُدُودَ وَ اسْتَأْثَرُوا بِالْفَيْ‏ءِ وَ أَحَلُّوا حَرَامَ اللَّهِ وَ حَرَّمُوا حَلَالَهُ وأنا أحَقُّ مَنْ غَيَّر.

(তারিখ আল-তাবারি, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০৪-৩০৫; আল-কামিল ফি আল-তারিখ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৮; কিতাব আল-ফুতুহ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৮১)

জেনে রাখো, এরা শয়তানের আনুগত্যকে মেনে নিয়েছে এবং দয়াময় আল্লাহর আনুগত্য ত্যাগ করেছে। এরা প্রকাশ্যভাবে ফাসাদ (দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা) ছড়াচ্ছে, আল্লাহর সীমারেখা লংঘন করছে, ‘ফিয়’ (মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অংশবিশেষ) আত্মসাৎ করেছে, আল্লাহর হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম করে নিয়েছে। আর এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আমিই সবচেয়ে বেশি যোগ্য।

ইমাম হুসাইন (আ.) তার ভাই মুহাম্মাদ হানাফিয়্যার কাছে লেখা একটি চিঠিতে এই বিষয়টির ওপর স্পষ্ট আলোকপাত করেন:

وَ أَسِيرَ بِسِيرَةِ جَدِّي وَ أَبِي عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ عليه السلام.

(মাজলিসি, মুহাম্মাদ বাকির, বিহার আল-আনওয়ার, খণ্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩২৯; ইবনে আসাম, আল-ফুতুহ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১; প্রকাশনী: দার আল-আদওয়া, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হিজরি)

আমি আমার নানা রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং আমার পিতা আমিরুল মুমিনিন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর জীবনধারা (সিরাত) অনুযায়ী আমল করতে চাই।

যেমনটি দেখা যাচ্ছে, নবীজির সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ধর্মের শত্রুদের উদ্ভাবিত বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ছিল ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলনের মূল ভিত্তি বা লক্ষ্য। এই পথে ইমাম (আ.) কোনো কিছুরই পরোয়া করেননি (অর্থাৎ নিজের সবকিছু উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেননি)।

তৃতীয় লক্ষ্য: জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি তাঁর পুরো যাত্রাপথ ও আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন:

ইমাম (আ.) ওমর ইবনে সাদের (লা’নাহুল্লাহি আলাইহি) বাহিনীর সামনে স্পষ্টভাবে তাঁর এই লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেন এবং তাদের জুলুমের প্রতি তাদের সতর্ক করেন:

وَ إِنِّي لَا أَرَى الْمَوْتَ إِلَّا سَعَادَةً وَ الْحَيَاةَ مَعَ الظَّالِمِينَ إِلَّا بَرَماً.

(আল-মু‘জাম আল-কাবীর, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৫; মজমা‘উয্-যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৯২; তারিখে মাদিনা দামিশ্ক, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২১৭-২১৮; সাইরে আলামুন নুবালা’, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩১০; তারিখুল ইসলাম, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১২; আল-মানাকিব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৮; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ১৯২)

নিশ্চয়ই, আমি এমন মৃত্যুকে শুধু সৌভাগ্যই মনে করি; আর জালিমদের পাশে জীবনযাপনকে আমি শুধু ধ্বংস ও বিনাশই মনে করি।

ইমাম হুসাইন (আ.) কূফাবাসীদের উদ্দেশে লেখা এক পত্রে তাঁর আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে এই বিষয়টিই ব্যক্ত করেছেন:

ألا وإن الدعي ابن الدعي قد تركني بين السلة والذلة وهيهات له ذلك مني ! هيهات منا الذلة ! أبى الله ذلك لنا ورسوله والمؤمنون. وحجور طهرت وجدود طابت ، أن يؤثر طاعة اللئام على مصارع الكرام ، الأواني زاحف بهذه الأسرة على قلة العدد ، وكثرة العدو ، وخذلة الناصر.

(শায়খ তাবারসি, আল-ইহতিজাজ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪-২৫; তাহকিক: সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ বাকির আল-খারসান; প্রকাশক: দারুন নু‘মান লিত-তাবাআহ ওয়ান-নাসর, নাজাফে আশরাফ; প্রকাশের সাল: ১৩৮৬ হি. - ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ)

জেনে রাখো, এই জারজ সন্তান [ইবনে যিয়াদ], জারজ সন্তানের পুত্র, আমাকে দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করেছে: হয় খোলা তলোয়ার হাতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া, অথবা লাঞ্ছনার পোশাক পরিধান করে ইয়াযিদের কাছে বাইআত গ্রহণ করা। কিন্তু লাঞ্ছনা আমাদের থেকে অনেক দূরে! আল্লাহ, তাঁর রাসূল, মুমিনগণ এবং পবিত্র কোলে লালিত-পালিত ব্যক্তিবর্গ, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি এবং অকুতোভয় ও গায়রতসম্পন্ন মানুষেরা আমাদের এমন অনুমতি দেবেন না যে, আমরা সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করার পরিবর্তে হীন ও নিচ মানুষদের আনুগত্যের লাঞ্ছনাকে প্রাধান্য দেই। জেনে রাখো, আমার সাহায্যকারী কম হওয়া সত্ত্বেও আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি।

এই সকল বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছিল ইমাম (আ.)-এর আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এবং মৌলিক লক্ষ্য। তিনি এই আদর্শের খাতিরে নিজের এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।

লেখা: মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha