শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ - ১৩:০৮
আজাদারি কেবল শোক নয়, ইমামদের আদর্শকে জীবন্ত রাখার মাধ্যম: মাওলানা আসগর আলী গাইন

আজাদারি হলো ইমাম হুসাইন (আ.) ও অন্যান্য মাসুম ইমামদের (আ.) সংগ্রাম, ত্যাগ এবং ইসলাম রক্ষার ঐতিহাসিক লড়াইকে যুগে যুগে স্মরণীয় ও প্রাসঙ্গিক করে তোলার পবিত্র মাধ্যম। ইমামগণের বাণী উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, শোকানুষ্ঠানের পাশাপাশি কারবালার ঘটনা ও ইমামদের জীবনী সঠিকভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং সেই আদর্শকে নিজের কর্মে প্রতিফলিত করাই হচ্ছে আজাদারির আসল উদ্দেশ্য, যা সমাজে ইনসাফ ও সত্য প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আমরুলগাছা চকপাটলি, হাসনাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত: মাওলানা আসগার আলী সাহেব গত রাতের মজলিসে বলেন, আজাদারি নিছক একটি আনুষ্ঠানিক শোকানুষ্ঠান নয়-এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়কে চিরসজীবী রাখার দর্শন। 

আজাদারির প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব

‘আজাদারি’ শব্দের অর্থ ‘শোক পালন’ হলেও ইসলামী পরিভাষায় এটি মূলত কারবালার শোকসভা (মজলিসে আযা) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের স্মরণানুষ্ঠানকে বোঝায়। তবে এর গুরুত্ব শোকের চেয়েও অনেক বেশি গভীর।

তিনি বলেন, আজাদারির মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মের প্রতীকসমূহকে সম্মানিত ও চিরসজীবী করা এবং ইমাম হুসাইন (আ.), তার সঙ্গীদের দুর্ভোগ ও ইসলাম রক্ষার জন্য তার সংগ্রামকে স্মরণ করা।

মাওলানা আরও বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.) যখন ইয়াজিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন সমগ্র উম্মত নিষ্ক্রিয় ছিল। ইসলাম পূর্ববর্তী যুগের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। যদি ইমাম (আ.) নীরব থাকতেন, তবে ইসলামের ভিত্তিই নড়ে যেত। তিনি সমগ্র উম্মতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন এবং সবচেয়ে মহান লক্ষ্য-ইসলামের রক্ষার জন্য-নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

মাওলানা আসগার আলী বলেন, আজাদারি হলো কারবালার বিপ্লবকে যুগে যুগে ধারণকারী এক গতিশীল শক্তি। এটি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখে এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

ইমামগণ কীভাবে আজাদারি করতে বলেছেন

মাওলানা আসগার আলী বলেন, ইমামগণ (আ.) আজাদারিকে কেবল অনুমতি দেননি, বরং এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন।

এটি একটি সওয়াবের কাজ: ইমাম হুসাইন (আ.) ও অন্যান্য মাসুম ইমামদের (আ.) জন্য শোক করা ‘মোস্তাহাব’ (সওয়াবের কাজ) এবং যারা তাদের স্মৃতি ও শাহাদাতকে আন্তরিকভাবে স্মরণ করে, আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করবেন।

শোকের পদ্ধতি: ইমামগণ শোকের বিভিন্ন পদ্ধতিকে বৈধতা দিয়েছেন। ইমামদের জন্য জোরে কান্নাকাটি, মাথা ও মুখে আঘাত করায় কোনো সমস্যা নেই।

প্রতিবাদের প্রকাশ: আজাদারি কেবল দুঃখ প্রকাশ নয়, বরং ইয়াজিদের অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য প্রতিষ্ঠারও একটি মাধ্যম।

কীভাবে আজাদারি করা উচিত (সঠিক পদ্ধতি)

মাওলানা আসগর আলী গাইনের বক্তব্য অনুযায়ী, সঠিক আজাদারির বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

শোক ও বিলাপের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা: শুধু কান্নাকাটি নয়, বরং মজলিসে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ, তার সংগ্রামের কারণ ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

ইতিহাসকে জীবন্ত রাখা: ইমামদের (আ.) জীবনী, তাদের সংগ্রাম ও কারবালার প্রতিটি ঘটনা সঠিকভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া।

কর্মে প্রতিফলন: আজাদারি কেবল মুখেই সীমাবদ্ধ নয়-আমাদের আচরণ ও কর্মে ইমামদের (আ.) আদর্শকে প্রতিফলিত করতে হবে। যেমন-সত্য প্রতিষ্ঠা, মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ইনসাফ ও মানবতার সেবা।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট রাখা: আজাদারি এমনভাবে করতে হবে যাতে অন্যদের নিকটও এই মহান লক্ষ্যগুলো পৌঁছায় এবং তারা অনুপ্রাণিত হয়।

আজাদারি থেকে আমরা কী শিখি?

মাওলানা আসগার আলী গাইন বলেন, কারবালার শোকসভা আমাদের ‘ইলম’ (জ্ঞান) ও ‘আমল’ (কর্ম)-এই দুইয়ের শিক্ষা দেয়। আজাদারি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং মানবিক গুণাবলী-সাহস, দয়া, ধৈর্য ও সহনশীলতা-অর্জনের এক অনন্য পথ। এছাড়াও তিনি বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার সঙ্গীদের আচরণ আজাদারির রীতিনীতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের জীবনেও অনুরূপ গুণাবলী বিকাশের চ্যালেঞ্জ দেয়।

আজাদারি হলো ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ত্যাগ ও সংগ্রামকে স্মরণ রাখার একটি পবিত্র রীতি। এটি শোকের মাধ্যমে প্রতিবাদ, ভালোবাসার মাধ্যমে অনুপ্রেরণা, এবং স্মৃতির মাধ্যমে কর্মের পথ দেখায়। ইমামগণ (আ.) নিজেরা এটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক করেছেন। সঠিক আজাদারি হলো-যেখানে শোক আছে, আছে জ্ঞান, আছে প্রতিবাদ, এবং সবশেষে আছে ইমামদের (আ.) আদর্শকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের সংকল্প।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha