শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ - ২১:৫৪
মহরমের প্রথম শুক্রবারে মুলুক গ্রামের ইমামবাড়ায় আন্তর্জাতিক আলী আসগর দিবস পালিত

বোলপুর সংলগ্ন মুলুক গ্রামের ইমামবাড়া আলী আসগর (আ.)-এ আজ মহরমের প্রথম শুক্রবার উপলক্ষে আন্তর্জাতিক আলী আসগর দিবস পালিত হয়েছে। কারবালার ৬ মাসের শহীদ শিশুর স্মরণে আয়োজিত এই শোক মজলিশে শতাধিক শিশু-কিশোর ও তাঁদের অভিভাবকরা অংশ নেন, যেখানে পীর এ তরিকত হজরত সৈয়দ রশাদাত আলী আল কাদরীর তত্ত্বাবধানে শিশুদের মাঝে প্রিয় খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনটির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বোলপুর, ১৯ জুন ২০২৬ (শুক্রবার): পবিত্র মহররম মাসের প্রথম শুক্রবার উপলক্ষে বোলপুর সংলগ্ন মুলুক গ্রামের ইমামবাড়া আলী আসগর (আ.), খানকাহ এ কাদেরিয়া, কারবালা নগর-এ এক বিশেষ শোকমজলিসের আয়োজন করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় এখানেও আন্তর্জাতিক আলী আসগর দিবস যথাযথ মর্যাদা, ভক্তি ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হলো।

শোকমজলিসের পরিবেশনা ও বক্তব্য:

উক্ত মজলিসে মুখ্য বক্তব্য রাখেন মাওলানা রাশাদাত আলী আল কাদেরী। তিনি তাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরেন কারবালার করুণ ইতিহাসের সেই হৃদয়বিদারক অধ্যায়-যেখানে মহান ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাত্র ৬ মাস বয়সী শিশু সন্তান হজরত আলী আসগর (আ.)-এর শাহাদাত কারবালার শোকগাথাকে চির অমর করে রেখেছে। তিনি বলেন, এই দিনটি শিশুদের সমাবেশ ও স্মরণসভার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়, যাতে আগামী প্রজন্ম সত্য ও ন্যায়ের পথে আত্মত্যাগের এই মহিমান্বিত শিক্ষা লাভ করতে পারে।

শিশুদের প্রতি করুণার বীজ বপন:

অনুষ্ঠানের এক অনন্য পর্বে উপস্থিত শিশুদের মাঝে তাদের পছন্দের খাবার ‘আলী আসগর (আ.)’-এর নামে বিতরণ করা হয়। এই আয়োজনটি শিশুদের কোমল মনে মহব্বত, মমতা ও করুণার বীজ বপন করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় অসংখ্য শিশু ও তাঁদের পরিবার এই মজলিসে অংশগ্রহণ করেন। মা-বাবারা সন্তানসহ উপস্থিত থেকে হজরত আলী আসগর (আ.)-এর রহমত ও বরকত কামনা করেন।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ ও ইয়াজিদের বিরুদ্ধে অবস্থান:

মাওলানা রাশাদাত আলী আল কাদেরী তাঁর বক্তব্যে ইসলামের মৌলিক নীতি ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ)-এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.) এই মহান আদর্শ শিক্ষা দিতেই আগমন করেছিলেন এবং মজলুমদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, কারণ ইয়াজিদ সঠিক ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বিকৃত ও বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

বাহিনীর সংখ্যার ঐতিহাসিক তুলনা:

তিনি আরও বলেন, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবার ও সাথীদের নিয়ে মাত্র ৭২ জন ছিলেন। অন্যদিকে, ইয়াজিদের বিশাল বাহিনী ছিল ৫০ হাজারেরও অধিক; কোনো কোনো বর্ণনায় সংখ্যাটি এক লক্ষ এবং অন্য রেওয়ায়েতে দুই লক্ষ পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ সংখ্যাবলের মধ্যেও ইমাম হুসাইন (আ.) সত্যের পথে অবিচল ছিলেন।

তিন দিনের অনাহার ও শিশুদের আর্তনাদ:

তিনি হৃদয় বিদারক ভাষায় স্মরণ করেন, ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবার কারবালার ময়দানে টানা তিনদিন অনাহারে ছিলেন। ক্ষুধায়-পিপাসায় ছোট ছোট শিশুরা ‘আল-আতাশ! আল-আতাশ!’ (পানি! পানি!) বলে চিৎকার করছিল; কিন্তু ইয়াজিদের নৃশংস বাহিনী তাদের এক ফোটা পানিও দেয়নি, বরং নিষ্পাপ শিশুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করেছিল।

পীর এ তরিকতের তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা:

সমগ্র শোকমজলিশটি পরিচালিত হয় পীর এ তরিকত হজরত সৈয়দ রশাদাত আলী আল কাদরী-এর তত্ত্বাবধানে। তাঁর দিকনির্দেশনায় মজলিসটি ছিল আধ্যাত্মিক আবেগ, ধর্মীয় মর্যাদা ও বাস্তব শিক্ষায় সমুজ্জ্বল।

শেষকথা: উল্লেখ্য, পবিত্র মহররমের প্রথম শুক্রবার বিশ্বব্যাপী ‘আলী আসগর দিবস’ হিসেবে সুপরিচিত। কারবালার সেই ঐতিহাসিক শোক ও আত্মত্যাগের মহাকাব্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে এই দিবসটি এক অনন্য আধ্যাত্মিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha