মঙ্গলবার ২৩ জুন ২০২৬ - ০৭:৫৯
প্রতিরোধ-ক্ষমতাই আমেরিকার অঙ্গীকারভঙ্গের বিরুদ্ধে একমাত্র কার্যকর নিশ্চয়তা

দেশের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, মার্কিন রাজনৈতিক অভিধানে “প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন” অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিলম্ব এবং আংশিক বাস্তবায়নের আড়ালে ভিন্ন অর্থ ধারণ করে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে আপাতদৃষ্টিতে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সমঝোতা কতটা নির্ভরযোগ্য এবং এর বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা কোথায়?

প্রকাশিত ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের সঙ্গে সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো বলে মনে হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি দেখিয়েছে যে, ওয়াশিংটন প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রতিশ্রুতির চেয়ে তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মার্কিন প্রশাসনের স্বাক্ষর বা আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার সবসময় তাদের নীতিগত অবস্থানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না। ফলে কেবল আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নের ক্রমধারা। সমঝোতা অনুযায়ী, উভয় পক্ষের প্রাথমিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পরই চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোবে। এটি ইতিবাচক দিক, কারণ ইরান বরাবরই ‘যাচাই-বাছাইয়ের নীতি’ অনুসরণ করে এসেছে এবং একতরফাভাবে বড় ধরনের ছাড় দিতে অনাগ্রহী।

তবে এখানেও সতর্কতা অপরিহার্য। কারণ মার্কিন রাজনৈতিক আচরণের ইতিহাস দেখায়, “বাস্তবায়ন” শব্দটি অনেক সময় ভিন্ন ব্যাখ্যা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিলম্বের মাধ্যমে কার্যত অর্থহীন করে ফেলা হয়। পরমাণু চুক্তি (বারজাম)-এর অভিজ্ঞতা তার স্পষ্ট উদাহরণ। কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও, যদি ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি না হয়, তাহলে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কার্যকর ফল জনগণ পায় না।

সবশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অঙ্গীকারভঙ্গ ঠেকানোর প্রধান নিশ্চয়তা কোনো লিখিত ধারা বা আন্তর্জাতিক নথিতে নয়; বরং ইরানের নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতা ও কৌশলগত শক্তিতে নিহিত। শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানির আত্মত্যাগের পর যে প্রতিরোধশক্তি ও সামরিক সক্ষমতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, সেটিই প্রতিপক্ষকে ইরানের শক্তি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

এই বাস্তবতায় প্রকৃত নিরাপত্তা নিহিত রয়েছে সেই প্রতিরোধ কাঠামো সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার মধ্যে। যদি যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করে যে চুক্তিভঙ্গ বা বৈরী নীতিতে প্রত্যাবর্তনের মূল্য সম্ভাব্য লাভের তুলনায় অনেক বেশি, তবে তার পক্ষে প্রতিশ্রুতি অমান্য করা সহজ হবে না।

অতএব, এই সমঝোতা স্মারককে নিছক আস্থার দলিল হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে মূল্যায়ন করা অধিক যুক্তিযুক্ত। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, কোনো আইনি ধারা কখনোই জাতীয় ঐক্য, কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং মাঠপর্যায়ের শক্তির বিকল্প হতে পারে না।

ইতিহাস বলে, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তখনই তার প্রতিশ্রুতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে, যখন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মূল্য তা রক্ষা করার চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায়। তাই দূরদর্শী নেতৃত্ব, জাতীয় সংহতি এবং প্রতিপক্ষের কৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট উপলব্ধিই দেশের অর্জন ও স্বার্থ রক্ষার মূল চাবিকাঠি—যে অর্জনগুলো বহু আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে।

— এলনাজ মুসাভি ইয়াকতা

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha