হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মহররমের অষ্টম রাত ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের সংযোগস্থলের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই রাত হযরত আলী আকবর (আ.)-এর স্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, যিনি নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের আদর্শ। আজকের ইরানি যুবকরা সেই আশুরার চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সামরিক, বৈজ্ঞানিক ও গণমাধ্যমের অঙ্গনে দেশের শক্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর চরিত্র ও গুণাবলির প্রতিচ্ছবি। আশুরার দিনে তিনি দ্বিধা ও সংশয়ের সব মেঘ দূর করে সবার আগে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন, যদিও সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল কেবল ধারালো তলোয়ার ও রক্তপিপাসু শত্রুরা। অসংখ্য শত্রুর মাঝে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নিঃসঙ্গতা কারবালার এই বীর যুবকের রক্তে সাহসের সঞ্চার করেছিল।
তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে সত্য ও আদর্শের পথে এগিয়ে যান এবং শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অন্য সঙ্গীদের মধ্যেও জাগিয়ে তোলেন। ফলে তিনি যুগে যুগে সত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার এক অনন্য আদর্শ হয়ে থাকেন।
আজও সেই আদর্শ এমন এক প্রজন্মের শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে, যারা আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি থেকে শুরু করে ন্যানোপ্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণাগার পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের দৃঢ়তা ও শক্তির পরিচয় তুলে ধরছে। এই প্রজন্ম দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তার ধারণাকে ভেঙে দিয়ে দেখিয়েছে যে, যৌবন কেবল দর্শক হয়ে থাকার সময় নয়; বরং নেতৃত্ব গ্রহণ ও পরিবর্তন আনার সময়।
যারা মাতৃভূমির ঢাল হয়ে উঠেছিল
এই চিন্তাধারা ও বীরত্বপূর্ণ চর্চার বাস্তব রূপ আধুনিক ইরানের ইতিহাসে বিশেষভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেখা গেছে।
প্রথমত, আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যখন বিশের কোঠার তরুণ কমান্ডার এবং বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কৃষিক্ষেত্র থেকে উঠে আসা যুবকেরা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। তারা অসাধারণ সামরিক কৌশল, অনন্য সাহস এবং সীমিত সম্পদ নিয়ে বিশ্বের সজ্জিত সেনাবাহিনীর জটিল পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ করে দেন। নিজেদের রক্ত উৎসর্গ করে তারা দেশের এক ইঞ্চি মাটিও বিচ্ছিন্ন হতে দেননি।
তবে এই আত্মত্যাগের চেতনা যুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি। আধুনিক সামরিক চ্যালেঞ্জ এবং দেশের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক অভিযানে, যা “রমজান যুদ্ধ” নামে পরিচিত, আবারও সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের তরুণ সদস্যরা রাডার স্টেশন, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেন।
রোজা ও ঈমানের চেতনা নিয়ে তারা নিজেদেরকে দেশের আকাশসীমার রক্ষাকবচে পরিণত করেন। এই আধুনিক যুদ্ধে শহীদ হওয়া তরুণ প্রতিরক্ষাকর্মীরা তাঁদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও শক্তিকে সুসংহত করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে ইরানি যুবক কঠিনতম সামরিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখেও পিছিয়ে যায় না।
গবেষণাগার ও কৌশলগত শিল্পে মেধাবীদের বীরত্ব
এই বিপ্লবী প্রজন্মের বীরত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। আজ জাতীয় শক্তির নতুন দুর্গ গড়ে উঠেছে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও গবেষণার অগ্রভাগে।
৩৫ বছরের কম বয়সী তরুণ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও গবেষকেরা কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করছেন এবং পরাশক্তিগুলোর বৈজ্ঞানিক একচেটিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। পারমাণবিক শিল্প ও জ্বালানি চক্রের স্বদেশায়নের ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য ইরানকে এই প্রযুক্তির অধিকারী সীমিত সংখ্যক দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে ন্যানোপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং দেশীয় উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রেও তারা শক্তির প্রচলিত সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
রাতের সমাবেশে আশুরার চেতনার প্রকাশ
এই গৌরবময় কাহিনির আরেকটি দিক আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাতের ধর্মীয় সমাবেশ, মাহফিল ও সেবামূলক কেন্দ্রগুলোতে দেখা যায়। বিদেশি গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণার বিপরীতে এসব অনুষ্ঠান বর্তমান ইরানি সমাজের বাস্তব ও প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরে।
এসব কার্যক্রমের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব তরুণ ও কিশোর স্বেচ্ছাসেবকদের কাঁধে। তারা ঐতিহ্যবাহী শোকানুষ্ঠানকে আধুনিক সমাজের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করেছে। শুধু খাবার বিতরণ নয়, তারা বৈজ্ঞানিক প্রদর্শনী, পারিবারিক ও আইনি পরামর্শকেন্দ্র, বিনামূল্যের চিকিৎসা সেবা এবং প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক সেবার নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে।
একই সঙ্গে এই প্রজন্মের আরেক অংশ তথাকথিত “সফট ওয়ার”-এর সৈনিক হিসেবে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সক্রিয়। তরুণ শিল্পী, অ্যানিমেটর ও মিডিয়া কর্মীরা উচ্চমানের পডকাস্ট, প্রামাণ্যচিত্র, গভীর চিন্তাশীল ভিডিও এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে আশুরার শান্তিপূর্ণ কিন্তু শক্তিশালী বার্তা বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিচ্ছেন এবং বৈশ্বিক মিডিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
যে প্রজন্ম পশ্চাদপসরণ চেনে না
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করে যে মহররমের অষ্টম রাত কেবল অতীতের কোনো শোকগাথা নয়; বরং এটি এমন এক প্রজন্মের অগ্রযাত্রার জীবন্ত, শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণামূলক ঘোষণা, যারা থেমে থাকা জানে না।
ইরানি যুবক দেখিয়েছে যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত রক্ষা কিংবা জনগণের নিঃস্বার্থ সেবায়—সব ক্ষেত্রেই তারা হযরত আলী আকবর (আ.)-এর সেই শিক্ষা অনুসরণ করছে, যা হলো দেশের ও আদর্শের প্রয়োজনে সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।
ঈমান ও দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শক্তি তাদেরই সৃষ্টি। এই প্রজন্ম ইরানের স্থিতিশীলতার ভিত্তিকে এতটাই মজবুত করেছে যে কোনো ঝড়ই তা নাড়িয়ে দিতে পারে না। তারা “আমরা পারি” এই স্লোগানের বাস্তব প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে আরও দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে।
আপনার কমেন্ট