হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামি সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থার জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, ‘ইয়াওমুল হুসাইন’ উপলক্ষে এ বছরও বিশ্বের বহু দেশে আশুরার দিনে ব্যাপক উৎসাহ ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে হুসাইনি শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে নাবাতিয়াহ অঞ্চলের আশপাশে ইসরায়েলি হামলার মতো আশুরাসদৃশ সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে এসব অনুষ্ঠান ভিন্নমাত্রা লাভ করে। ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদপ্তরের উদ্যোগে নিম্নোক্ত দেশগুলোতে এসব অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
সার্বিয়া
মহররম মাস উপলক্ষে বেলগ্রেডে ইরানি দূতাবাসের আয়োজনে এবং ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদপ্তরের সহযোগিতায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাত স্মরণে শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মোহাম্মদ হোসেইন নাঈমি ইমাম হুসাইনের (আ.) আন্দোলনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, এই আন্দোলনের স্থায়ী বার্তা হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, মানবমর্যাদা রক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি আশুরার আন্দোলনকে স্বাধীনচেতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল অবস্থানের অনুপ্রেরণামূলক আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সিয়েরা লিওন
ফ্রিটাউনের শিয়া মসজিদ মসজিদে রাসূলে আযম (সা.)-এ ব্যাপক উপস্থিতিতে শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে পশ্চিম আফ্রিকার শিয়া সমাজের সঙ্গে আশুরার সংস্কৃতি ও হুসাইনি আদর্শের গভীর সম্পর্ক ফুটে ওঠে।
ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা আবেদিন সিয়াহাত-ইসফানদিয়ারি তাঁর বক্তব্যে বলেন, মহররম কেবল শোকের মাস নয়; এটি জাগরণ, মর্যাদা ও মানবিক বিবেক পুনরুজ্জীবনের মাস। তিনি বলেন, ইমাম হুসাইনের (আ.) শিক্ষা স্বাধীনচেতা ও প্রতিরোধী মানুষ গড়ার বিদ্যালয় এবং আশুরার বার্তা সময় ও স্থানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হজরত জয়নাব (সা.)-এর সেই ঐতিহাসিক উক্তির কথা স্মরণ করেন-“আমি সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।”
তিনি আরও বলেন, প্রকৃত প্রশান্তি বাহ্যিক আরামের সঙ্গে এক নয়; আল্লাহর পথে অবিচল থাকলে কঠিন পরিস্থিতিতেও অন্তরের শান্তি অর্জন সম্ভব। তাঁর মতে, কারবালা শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং সত্য ও অসত্যের চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক। তিনি ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতিরোধকেও আশুরার চেতনার ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তুরস্ক (ইস্তাম্বুল)
আশুরা উপলক্ষে ইস্তাম্বুলে ইরানের কনস্যুলেটে বসবাসরত ইরানিদের পাশাপাশি আজারবাইজান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের শিয়া মুসলমানদের উপস্থিতিতে শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আলী ফাত্তাহজাদে আশুরার মানবগঠনমূলক শিক্ষা, ইমাম হুসাইনের (আ.) আন্দোলনের দর্শন এবং কারবালার শিক্ষা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ইমাম হুসাইনের (আ.) শোকসভায় অংশগ্রহণ আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত।
এ অনুষ্ঠানে প্রতিরোধ ফ্রন্টের শহীদ, সামরিক কমান্ডার এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহতদের স্মরণ করা হয়। আহলে বাইতের প্রশংসাগায়ক আবুল কাসেম জামানি মারসিয়া পরিবেশন করলে শোকমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এছাড়া ইস্তাম্বুলের জেইনাবিয়া হালকালি এলাকায় লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণে আরেকটি বিশাল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা আশুরাকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, মানবমর্যাদা ও জুলুমবিরোধী সংগ্রামের চিরন্তন বিদ্যালয় হিসেবে বর্ণনা করেন। তুরস্কের উপ-রাষ্ট্রপতি জেভদেত ইয়িলমাজ বলেন, মুসলিম ঐক্য জোরদার করা, মতপার্থক্যের প্রতি সম্মান দেখানো এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোই আশুরার প্রধান শিক্ষা।
অনুষ্ঠানে “হুসাইন বিশ্ববাসীর আশা” শীর্ষক একটি নাট্যাভিনয়ও মঞ্চস্থ হয়, যা দর্শকদের গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে।
নাইরোবি (কেনিয়া)
নাইরোবিতে শিয়া সম্প্রদায় ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদাত স্মরণে একটি বিশাল শোকমিছিলের আয়োজন করে।
মিছিলের উদ্দেশ্য ছিল হুসাইনি আন্দোলনের সার্বজনীন মূল্যবোধ-ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, আত্মত্যাগ, স্বাধীনতা, দয়া এবং জুলুমবিরোধী সংগ্রাম-প্রচার করা।
শিয়া আলেম, সামাজিক নেতা, যুবক, নারী, শিশু ও প্রবীণসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ এতে অংশ নেন। নাইরোবিতে ইরানের রাষ্ট্রদূত ও সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
মিছিলটি ইমাম হাসান (আ.) মসজিদ থেকে শুরু হয় এবং অংশগ্রহণকারীরা ন্যায়, সত্য, স্বাধীনতা ও জুলুমবিরোধী বার্তাসংবলিত ব্যানার বহন করেন। বক্তারা বলেন, ইমাম হুসাইনের (আ.) আন্দোলন কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং ন্যায় ও মানবমর্যাদার জন্য চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
সারায়েভোর হুসাইনিয়া ইমাম খামেনেয়ি-তে মহররমের প্রথম দশকের শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
এতে প্রবাসী ইরানি ও আহলে বাইতের অনুরাগীরা ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের স্মরণে শোক প্রকাশ করেন।
ধর্মীয় বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম রব্বানি বলেন, আশুরা হলো সত্য ও অসত্যের মধ্যে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার দিন। তিনি বলেন, শোকানুষ্ঠান, জিয়ারত এবং কারবালার ঘটনাকে স্মরণ করা ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও হুসাইনি আন্দোলনের প্রকৃত বার্তা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশু ও কিশোরদের আহলে বাইতের আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়।
আপনার কমেন্ট