সোমবার ২৯ জুন ২০২৬ - ১৩:১৫
মিনাব ও লামের্দের যুদ্ধাপরাধীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে

বিচার বিভাগ সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় সর্বোচ্চ নেতা জোর দিয়ে বলেছেন: দ্বিতীয় ও তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধে শহীদ হওয়া নিরীহ ব্যক্তিদের রক্ত থেকে শুরু করে আমাদের প্রিয় দেশের ওপর এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে অবস্থানরত ইরানের নির্যাতিত জনগণের প্রত্যেক সদস্যের ওপর সংঘটিত শারীরিক, মানসিক, বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষয়ক্ষতি; মিনাব ও লামের্দে শিশু হত্যাকাণ্ড ও নজিরবিহীন যুদ্ধাপরাধ থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও জনসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর হামলা; কয়েক দিনের নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণ ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ড; এবং সর্বোপরি অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, অনন্য রত্ন ও যুগের একমাত্র মুজাহিদ নেতা (আল্লাহ তাঁর মর্যাদা উচ্চ করুন)-এর শাহাদাত-এসবের প্রতিটিই শত শত, এমনকি হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ আইনি মামলার ভিত্তি গঠন করে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতে দৃঢ়তার সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিচার বিভাগ সপ্তাহ এবং আয়াতুল্লাহ বেহেশতি ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী-এর বার্তা প্রকাশিত হয়েছে।

বার্তার পূর্ণ অনুবাদ নিম্নরূপ:

بسم‌الله الرّحمن الرّحیم

আলে রাসূলের শোকাবহ দিনসমূহ এবং হযরত সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাত উপলক্ষে আমি ইরানের সমগ্র জাতি এবং ইসলামী উম্মাহর প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলন ও বিপ্লব সত্য প্রতিষ্ঠা, উম্মাহর সংস্কার এবং জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য সংঘটিত হয়েছিল। এটি সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘর্ষের ইতিহাসে সর্বোচ্চ শিখর এবং বিশ্বের সব স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য অমূল্য ও অবিস্মরণীয় শিক্ষা বহন করে।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর রক্তকে “আল্লাহর রক্ত” বলা হয়, যা বিশ্বজগতের শিরায় প্রবাহিত হয়ে জীবনদায়ী মহাকাব্য সৃষ্টি করেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবও যেহেতু সেই আলোকোজ্জ্বল উৎস থেকে উদ্ভূত, তাই এর লক্ষ্যও সর্বদা হুসাইনি আন্দোলনের আদর্শ অর্জনের দিকে নিবদ্ধ থাকা উচিত।

প্রতি বছরের ৭ তীর (ইরানি বর্ষপঞ্জির একটি তারিখ) আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বিপ্লবের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং সেই মহান মানুষকে, যিনি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে নিরলসভাবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন। অবশেষে তিনি তাঁর একদল নিষ্ঠাবান সহযোদ্ধার সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এবং তাঁর সঙ্গে শহীদ হওয়া ৭২ জনের শাহাদাত এই রাষ্ট্র ও এর নির্মাতাদের হুসাইনি চেতনারই প্রমাণ।

বিচার বিভাগের সাফল্য জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করবে

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিচার বিভাগের দায়িত্ব হলো জনগণের অধিকার রক্ষা, জনস্বার্থ সংরক্ষণ, বৈধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ তদারকি করা।

এই পথে সাফল্যের ফল শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নয়, বরং রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা।

সমাজের ন্যায্য প্রত্যাশা হলো বিচার বিভাগ যেন ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপ দেয়, যাতে আদালত, বিচারালয় এবং সামাজিক জীবনের সর্বত্র তার ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়। জনগণ যেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় ব্যবস্থা, অধিকার হরণের হ্রাস, দ্রুত বিচার, বিচারকদের রায়ের মানোন্নয়ন এবং ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে অনুভব করতে পারে।

১৪০৪ ও ১৪০৫ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধে ইরানি জনগণের ক্ষতিগ্রস্ত অধিকার পুনরুদ্ধার বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব

বিচারব্যবস্থায় এমন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, যাতে প্রতিটি নিপীড়িত ব্যক্তি এটিকে নিজের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করে এবং ক্ষমতাবান কেউ অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের সাহস না পায়।

জনগণের অধিকার শুধু ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সমান সুযোগ, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার, সুস্থ পরিবেশ, বৈধ স্বাধীনতা এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থাও ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই সময়ে সমগ্র ইরানি জাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও বিচারিক বিষয় হলো আন্তর্জাতিক অপরাধী, ঔদ্ধত্যবাদী শক্তি এবং আগ্রাসীদের অপরাধের ফলে, বিশেষ করে ১৪০৪ ও ১৪০৫ সালে, জনগণের যে অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা।

মিনাব ও লামের্দের যুদ্ধাপরাধীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে

দ্বিতীয় ও তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধে শহীদদের রক্ত থেকে শুরু করে দেশের ওপর এবং ইরানি জনগণের ওপর সংঘটিত শারীরিক, মানসিক, বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষতি; মিনাব ও লামের্দে শিশু হত্যাকাণ্ড ও নজিরবিহীন যুদ্ধাপরাধ; চিকিৎসা ও সেবাকেন্দ্রে হামলা; নবজাতক থেকে প্রবীণদের হত্যা; এবং সর্বোপরি মহান মুজাহিদ নেতার শাহাদাত-এসবই শত শত, এমনকি হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ আইনি মামলার ভিত্তি, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতে গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।

নিঃসন্দেহে যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং তাদের অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

১. শত্রুপক্ষের মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে এসব অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছে, এমনকি তা নিয়ে গর্বও করেছে। এসব বক্তব্য আইনি দৃষ্টিতে অপরাধের স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং জনগণের ক্ষতিগ্রস্ত অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।

২. গত বছরের তীর মাসে বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেষ বৈঠকে বিপ্লবের শহীদ নেতার নির্দেশনা ছিল দ্বিতীয় আরোপিত যুদ্ধের অপরাধগুলোর বিচার এগিয়ে নেওয়া। এখন সেই নির্দেশনা তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করতে হবে এবং রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তা অনুসরণ করতে হবে। এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখবে।

শহীদ নেতার নির্দেশনার প্রতি গুরুত্ব দেওয়াই বিচার বিভাগের সাফল্যের চাবিকাঠি

সর্বাত্মক বিচারিক সংস্কার সফল করতে এবং ঘোষিত লক্ষ্য দ্রুত অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তুতি ও শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন। এগুলোর অধিকাংশই বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকগুলোতে এবং শহীদ সর্বোচ্চ নেতার বিস্তারিত নির্দেশনা ও সুপারিশে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনার প্রতি আন্তরিক মনোযোগ এবং বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকেই আমি বিচার বিভাগের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে মনে করি।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথ সহজ নয়। কিন্তু আন্তরিকতা, আল্লাহর ওপর ভরসা, উচ্চস্তরের তাকওয়া, দৃঢ় সংকল্প, নিরলস প্রচেষ্টা, সাহস, দৃঢ়তা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এই পথ সুগম হবে।

আল্লাহর ইচ্ছায় এবং প্রতীক্ষিত ন্যায় প্রতিষ্ঠাতার (ইমাম মাহদী আ.) বিশেষ অনুগ্রহে এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে-ইনশাআল্লাহ।

সাইয়্যিদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী

৭ তীর ১৪০৫ (ইরানি বর্ষপঞ্জি)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha