হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের ইমাম ও শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)’র পবিত্র মরদেহকে শেষ বিদায় ও শেষযাত্রার দিনগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন ছিল, তা হলো—এমন গভীর শোকের মুহূর্ত, যা প্রকৃত অর্থেই এক মহাকাব্যিক শোকের রূপ ধারণ করেছিল, সেখানে আমরা সবাই এক অভূতপূর্ব আত্মিক ঐক্যে সমবেত হয়েছিলাম। আমাদের এই সমবেত হওয়ার উদ্দেশ্য ছিল এ কথা প্রমাণ করা যে, শোকাহত একটি জাতির হৃদয়ে কেবল প্রিয়জন হারানোর বেদনাই প্রবাহিত হয় না; এর চেয়েও গভীর কিছু সেখানে বিদ্যমান থাকে। থাকে এক অভিন্ন পরিচয়ের অনুভূতি, একটি অভিন্ন ভাগ্যের অংশীদার হওয়ার অনুভব, ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সেই দীর্ঘ পথের দিকে ফিরে তাকানোর অনুভূতি, যে পথ আমরা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছি। আর ঠিক যেমনটি ইরানের ‘শহীদ নেতা’ বলেছিলেন, “আমরা শিখরের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।” এই চেতনার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে জাতির সেই মহাসমাবেশে।
আমাদের জনগণকে থামানো যাবে না
এ কারণেই গত কয়েক দিনে বিদায় ও শেষযাত্রার অনুষ্ঠানে উপস্থিত এই অভূতপূর্ব গণজাগরণের অংশগ্রহণকারীদের যখন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল, “আপনি কি শেষ বিদায় জানাতে এসেছেন?”, তখন তারা জবাবে বলছিলেন, তাদের এই বিদায় আসলে তাদের শহীদ ইমামকে নতুন করে সালাম জানানোরই আরেকটি নাম।
তাদের ভাষায়, এই বিদায় বাহ্যিকভাবে সমাপ্তির প্রতীক হলেও, এর অন্তর্নিহিত অর্থ একটি গভীর জাগরণের সূচনা। এমন এক জাগরণ, যা তাদের মহান লক্ষ্য অর্জনের পথে এবং প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে। আর এখানেই নিঃসন্দেহে বলা যায়—এমন একটি জাতিকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
বিপ্লবের শহীদ নেতার শেষযাত্রার আন্তর্জাতিক তাৎপর্য
নার্গিস শোকরজাদেহ, যিনি নারী হাওজা ইলমিয়ার একজন গবেষক, বলেন—বিপ্লবের প্রজ্ঞাবান ও মজলুম নেতার শাহাদাতের মতো ঘটনাকে এই সমাজের সভ্যতাগত অভিযাত্রার কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ, এ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত অন্য কোনো বিশ্লেষণ এ ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম নয়।
তিনি বলেন, শহীদ নেতাকে শেষ বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান এবং ইরাকসহ বিভিন্ন শহরে তাঁর শেষযাত্রা প্রমাণ করেছে যে, প্রতিরোধের ধারা আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জীবন্ত ও অধিক প্রভাবশালী।
তার ভাষায়, সর্বাত্মক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও অনুষ্ঠিত এই বিশাল আয়োজনের দ্বিমুখী তাৎপর্য রয়েছে। একদিকে এটি ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং তার অতুলনীয় সামাজিক পুঁজির প্রতীক; অন্যদিকে এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উদ্দেশে একটি সুস্পষ্ট বার্তা—ইরানের জনগণ কোনো পরিস্থিতিতেই ভেঙে পড়বে না; তা বাহ্যিক চাপের মুখেই হোক কিংবা নিজেদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীককে হারানোর মতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখিই হোক।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যা, বহিরাগত চাপের ক্রমবর্ধমানতা এবং শেষ পর্যন্ত শত্রুর আগ্রাসন ও দমননীতি—এসবই এই দীর্ঘ পথচলার সাময়িক কঠিন অধ্যায়, এর সমাপ্তি নয়। একই সঙ্গে বর্ণনাযুদ্ধের এই সময়ে এমন অটল সংকল্প ও দৃঢ় প্রত্যয় সব ধরনের অচলাবস্থা ভেঙে দিতে সক্ষম এবং বর্তমান সংকট অতিক্রমের আশাবাণী বহন করে।
ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বুদ্ধিজীবীদের মূল দায়িত্ব
নার্গিস শোকরজাদেহ আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যারা নানাভাবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অচলাবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, তাদের মোকাবিলায় একটি নতুন ভাষ্য ও নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক কথন নির্মাণ করা। একই সঙ্গে এ বিষয়টির সঠিক উপলব্ধি ও অনুধাবনের পরিবেশ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশের গণমাধ্যমের সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে প্রতিশ্রুতিশীল, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী বুদ্ধিজীবীদের এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এক বিরাট দায়িত্ব পালন করতে হবে।
জাতীয় শোকেরও ঊর্ধ্বে
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও অধ্যাপক ড. শাহাবুদ্দিন আলামীও এ প্রসঙ্গে নিজের মতামত তুলে ধরে বলেন, ইরানের জনগণ এর আগেও এমন দিন প্রত্যক্ষ করেছে। এমন সময়, যখন অনেকেই মনে করেছিল—যে ব্যক্তিত্ব একটি ঐতিহাসিক যুগের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন, তাঁর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা বিপ্লবও সমাপ্ত হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ১৩৬৮ হিজরি শামসির খোরদাদ মাস (১৯৮৯ সালের জুন) কেবল ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে বিদায় জানানোর সময় ছিল না; বরং সেটি ছিল একটি সত্যের পরীক্ষা। এমন একটি সত্য, যার ওপর পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর যথার্থ উত্তরসূরি বারবার গুরুত্বারোপ করেছেন। সেই সত্য হলো—ইসলামী বিপ্লবের স্থায়িত্বের রহস্য কোনো ব্যক্তির মধ্যে নিহিত নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে সেই জনগণের ঈমান, সচেতন উপস্থিতি এবং অঙ্গীকারে, যারা নিজেদের পথ চিনে নিয়েছে এবং সেই পথের ধারাবাহিকতা রক্ষার মূল্য দিতেও প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, শহীদ নেতার ঐতিহাসিক শেষযাত্রায় যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো—এই ঘটনা কোনো নতুন জাগরণের সূচনা নয়; বরং শহীদের রক্ত যে জাগরণ সমাজের অন্তরে সৃষ্টি করেছে, এটি তারই সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। এ কারণেই এই শেষযাত্রাকে কেবল শোকানুষ্ঠান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, শোক যদি ঐশী দর্শনের আলোকে অর্থবহ না হয়, তবে তা মানুষকে স্থবির করে দেয়; কিন্তু ইতিহাসজুড়ে আল্লাহর ওলিদের শাহাদাত সর্বদাই নতুন গতি ও জাগরণের উৎসে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, ইমাম খোমেনীর ঐতিহাসিক বিদায়যাত্রা এবং শহীদ ইমাম খামেনেয়ীর শেষযাত্রার মধ্যে ঐতিহাসিক সাদৃশ্যও এখানেই নিহিত। উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্ববাসী কেবল জনসমুদ্রের দৃশ্য দেখেনি; তারা প্রত্যক্ষ করেছে এমন একটি জাতিকে, যারা শোককে দৃঢ় সংকল্পে রূপান্তর করার অসাধারণ সক্ষমতা অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, ১৩৬৮ হিজরি শামসির খোরদাদ ছিল সেই দিন, যেদিন ইরানের জনগণ প্রমাণ করেছিল যে তারা বিপ্লবকে কোনো এক ব্যক্তির প্রতি আবেগময় অনুরাগের সীমা থেকে উত্তীর্ণ করে একটি চিরন্তন সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের স্তরে উন্নীত করেছে। আজও সেই পরীক্ষাই আরও বৃহত্তর পরিসরে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে। তাই এই শেষযাত্রার গুরুত্বকে কেবল অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বা অনুষ্ঠানের জাঁকজমকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়। এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এমন একটি আদর্শভিত্তিক সামাজিক শক্তির প্রকাশে, যা একটি অভিন্ন আদর্শকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।
আশুরার সংস্কৃতি এবং একটি জাতির ঐতিহাসিক দায়িত্ব
ড. শাহাবুদ্দিন আলামী আরও বলেন, আশুরার সঙ্গে সম্পর্কের আলোকে এই বাস্তবতা আরও গভীর তাৎপর্য লাভ করে। আশুরার চিরস্থায়ী প্রভাবের রহস্য নিহিত ছিল এই সত্যে যে, ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর পবিত্র রক্ত সমগ্র উম্মাহর জন্য এক ঐতিহাসিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছিল। আশুরার দিন থেকে পরবর্তী প্রতিটি যুগে মূল প্রশ্ন ছিল—প্রতিটি প্রজন্ম এই আমানতের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারণ করবে। ইসলামী বিপ্লবও নিজেকে সেই ধারাবাহিক ঐতিহ্যেরই উত্তরসূরি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
এ কারণেই এই বিপ্লবে অনুষ্ঠিত বৃহৎ শেষযাত্রাগুলো কখনোই কেবল বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং সেগুলো ছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে আমানত হস্তান্তরের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এমন এক মুহূর্ত, যখন একটি জাতি প্রমাণ করে যে, তারা তাদের নেতাদের কাছ থেকে যা শিক্ষা অর্জন করেছে, তা কেবল স্মৃতির পাতায় সংরক্ষণ করেনি; বরং সেটিকে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যে রূপান্তরিত করেছে।
তিনি বলেন, এই দিনগুলোর প্রকৃত গুরুত্বও এখানেই নিহিত। আমাদের চোখের সামনে যা ঘটছে, তা কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের একটি বড় শোক অতিক্রম করার ঘটনা নয়। এই জাতি এর আগেও তাদের ইমামকে হারানোর বেদনা সহ্য করেছে এবং সেই কঠিন ঐতিহাসিক গিরিপথ সফলভাবে অতিক্রম করেছে।
আজকের গুরুত্ব অন্যত্র। প্রায় অর্ধশতাব্দীর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও মুজাহাদার পর ইসলামী বিপ্লব এমন এক ঐতিহাসিক পরিপক্বতায় পৌঁছেছে, যেখানে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ আর কেবল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, কাঠামো বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং ‘ইসলামী বিপ্লবের মানুষ’—এমন এক মানুষ, যিনি ইমামের আদর্শে, আশুরার শিক্ষায় এবং বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের দিকনির্দেশনায় গড়ে উঠেছেন এবং এখন নিজেকেই এই মহান পথের আমানত বহনকারী হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রতিবেদন: সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ মাহদী মুসাভী
আপনার কমেন্ট