রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১২:২৮
তাগুত ও তার অনুসারীদের প্রথম চিহ্ন: দুনিয়ার প্রতি অন্ধ আকর্ষণ; কেন তাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া যাবে না?

অর্থ, সম্পদ, বাহ্যিক মর্যাদা ও সামাজিক প্রতিপত্তির চাকচিক্য মানুষকে সহজেই মোহগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু কোরআন ও আহলে বাইতের শিক্ষা মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার এসব অর্জন যতই আকর্ষণীয় মনে হোক, শেষ পর্যন্ত তা ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বাণীর ব্যাখ্যায় তাগুত ও তাদের অনুসারীদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কথা তুলে ধরে মানুষকে তাদের বাহ্যিক জৌলুশে প্রতারিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আবু হামজা সুমালির বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেন,

أیها المؤمنون لا یفتننکم الطواغیت و أتباعهم.

হে মুমিনগণ! তাগুত ও তাদের অনুসারীরা যেন তোমাদের প্রতারিত করতে না পারে।”

এখানে ‘তাগুত ও তাদের অনুসারী’ বলতে প্রথমত তাগুতদের ঘনিষ্ঠজন ও সহযোগীদের বোঝানো হয়েছে। পাশাপাশি এমন লোকদেরও বোঝানো হয়েছে, যারা কোনো ধরনের অনুসন্ধান, দায়িত্ববোধ বা অঙ্গীকার ছাড়াই তাগুতের প্রতি অনুরক্ত হয়ে তার অনুসরণ করে।

এরপর ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাগুত ও তাদের অনুসারীদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি

مِن أهلِ الرَّغبةِ فی هذه الدنیا.

অর্থাৎ, “তারা এই দুনিয়ার প্রতি আকাঙ্ক্ষী।”

এটি তাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তারা পার্থিব জীবন ও এর উপকরণের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট থাকে।

المائلون إلیها.

— “তারা দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে থাকে।”

অর্থাৎ, তাদের চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে পার্থিব জীবন। এর বিপরীতে মুমিনের জন্য দুনিয়ার প্রতি এমন আসক্তি থেকে দূরে থাকা জরুরি, যা তাকে তার প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে।

المفتتنون بها.

— “তারা দুনিয়ার দ্বারা মোহগ্রস্ত।”

দুনিয়ার চাকচিক্য, সম্পদ ও মর্যাদা তাদের এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে এগুলোই তাদের কাছে জীবনের প্রধান সাফল্য ও অর্জন বলে মনে হয়।

দুনিয়ার সম্পদ আসলে ‘হুতাম’
এরপর বলা হয়েছে:

المقبلون علیها و علی حطامها الهامد

— “তারা দুনিয়া ও তার ক্ষয়িষ্ণু সামগ্রীর দিকে ছুটে যায়।”

এখানে ‘হুতাম’ (حُطام) বলতে শুকনো ও ভঙ্গুর কাঠের টুকরো বা এমন বস্তু বোঝানো হয়েছে, যা সহজেই ভেঙে যায় ও ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থ, সম্পদ, বাহ্যিক মর্যাদা ও সামাজিক প্রতিপত্তি—দুনিয়ার এসব অর্জনও মূলত তেমনই ক্ষণস্থায়ী।

‘হামিদ’ (هامد) অর্থ নিভে যাওয়া, স্তিমিত বা বিলীন হয়ে যাওয়া। যেমন আগুন নিভে গেলে তার শিখা আর থাকে না, তেমনি দুনিয়ার সম্পদ ও চাকচিক্যের মধ্যেও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিহিত রয়েছে।

এরপর এসেছে:

 و هشیمها البائد.

— “এবং তার বিলীয়মান শুকনো খড়কুটো।”

‘হাশিম’ (هشیم) বলতে শুকিয়ে যাওয়া, ভেঙে চূর্ণ হওয়া ও ছড়িয়ে পড়া বস্তু বোঝায়। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কাহফের ৪৫ নম্বর আয়াতে দুনিয়ার জীবনের উপমা দিতে বলা হয়েছে:
“অতঃপর তা এমন শুকনো খড়কুটোয় পরিণত হয়, যা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়।”

অর্থাৎ, মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো খড়কুটো যেমন সামান্য বাতাসেই ছড়িয়ে পড়ে এবং হারিয়ে যায়, তেমনি দুনিয়ার সম্পদ, বৈভব ও বাহ্যিক মর্যাদাও একসময় বিলীন হয়ে যায়।

যা আজ বড়, কাল তা বিলীন

 و هَشیمُها البائد غداً

— “তার সেই হাশিম, যা আগামীকালই বিলীন হয়ে যাবে।”

আজ যে সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা বা সামাজিক প্রতিপত্তিকে মানুষ জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করছে, সময়ের প্রবাহে তা-ই একদিন হারিয়ে যাবে। বাতাসে উড়ে যাওয়া শুকনো খড়কুটোর মতো দুনিয়ার এসব অর্জনও স্থায়ী নয়।

কোরআন ও আহলে বাইতের প্রজ্ঞাময় দৃষ্টিতে, দুনিয়ার জন্য মানুষ যে সম্পদ ও বৈভব অর্জনে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়, সেগুলোর প্রকৃত মূল্য অত্যন্ত সীমিত। অথচ তাগুত ও তাদের অনুসারীরা এসব ক্ষণস্থায়ী বিষয়কেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানিয়ে নেয়।

তাই ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন—তাগুত ও তাদের অনুসারীদের বাহ্যিক জৌলুশ, সম্পদ ও দুনিয়াবি প্রভাব যেন তাদের প্রতারিত করতে না পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha