রবিবার ১৯ জুলাই ২০২৬ - ১৪:৩২
ইমাম হুসাইন (আ.) যখন জানতেন যে তিনি শহীদ হবেন, তখনও কেন তিনি আন্দোলন (কিয়াম) শুরু করেছিলেন?

যদি ইমাম হুসাইন (আ.) জানতেন যে তিনি কারবালায় শহীদ হবেন, তবে তিনি কেন কারবালার দিকে রওনা হয়েছিলেন?

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু মানুষ, যারা ইমামদের কর্মকাণ্ডে ত্রুটি বা সমালোচনার সুযোগ খোঁজেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেন: যদি ইমাম হুসাইন (আ.) জানতেন যে তিনি কারবালায় শহীদ হবেন, তবে তিনি কেন কারবালার দিকে রওনা হয়েছিলেন? অথচ নিজেকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া তো ইসলামে নিষিদ্ধ!

এ ধরনের ধারণা অজ্ঞতা বা অযৌক্তিক আপত্তির ফল বলে মনে করা হয়।

প্রশ্ন হলো: এই বক্তব্য কি সঠিক? যদি না হয়, তাহলে কেন?

উত্তর: ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কারবালার ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা বা তাঁর শোকগাথা শুনতে গিয়ে যে প্রশ্নটি অনেকের মনে আসতে পারে, তা হলো:

ইমাম হুসাইন (আ.) কি তাঁর এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেকে এমন এক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেননি, যা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে নিষেধ করেছেন? আল্লাহ বলেন:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَي التَّهْلُكَةِ ؛

তোমরা নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।

(সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৫)

কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁর এই কাজ যেন আত্মহত্যার শামিল।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কীভাবে সম্ভব যে ইমাম হুসাইন (আ.)-যিনি মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র, আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর পুত্র এবং ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন-এমন একটি কাজ করতে পারেন?

এই সংশয়ের উত্তর বুঝতে হলে প্রথমে কুরআনের এই আয়াতে ব্যবহৃত "হালাকত" (ধ্বংস) শব্দের অর্থ এবং কোন ধরনের ধ্বংস ইসলামে নিষিদ্ধ-তা সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। এরপর দেখা যাবে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মহান কিয়াম (আন্দোলন) আদৌ এই নিষিদ্ধ "ধ্বংস"-এর অন্তর্ভুক্ত কি না।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَي التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ . البقره / 195 .

আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। আর সৎকর্ম করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৫)

এই আয়াতে "তাহলুকাহ" (تهلكة) শব্দের অর্থ ধ্বংস বা বিনাশ। এর দ্বারা এমন প্রত্যেক কাজকে বোঝানো হয়েছে, যার ফলে মানুষ এমন বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা সাধারণ অবস্থায় সহ্য করা সম্ভব নয়; যেমন-চরম দারিদ্র্য, গুরুতর অসুস্থতা বা মৃত্যু।

এই মহিমান্বিত আয়াতে প্রথমে আল্লাহর পথে ব্যয় করার-অর্থাৎ তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ করার-আহ্বান জানানো হয়েছে। এরপর নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব, এই আয়াতে "ধ্বংস" বলতে সেই ধ্বংসকেই বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর পথে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ থেকে বিরত থাকার ফলে সৃষ্টি হয়।

এরপর আল্লাহ বলেন: আর তোমরা সৎকর্ম করো।

অর্থাৎ, আল্লাহর পথে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হও।

এটি স্পষ্ট যে, সব ধরনের আত্মত্যাগই উত্তম আত্মত্যাগ নয় এবং সব ধরনের দান বা ত্যাগই আল্লাহর কাছে প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নয়। যদি তা-ই হতো, তবে উন্মাদ বা অজ্ঞ ব্যক্তিদের বুদ্ধিহীন আত্মত্যাগও আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয় গণ্য হতো।

আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য আত্মত্যাগ ও প্রাণ উৎসর্গের জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শর্ত হলো:

১. আত্মত্যাগ এমন একটি পথ ও উদ্দেশ্যে হতে হবে, যা জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষ যুক্তিসঙ্গত ও মহৎ বলে মনে করেন। অন্যথায়, যদি তা যুক্তির সীমা অতিক্রম করে উন্মাদনা বা অচেতন আচরণের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

২. যে উদ্দেশ্যে কোনো কিছু উৎসর্গ করা হচ্ছে, সেই উদ্দেশ্যের মূল্য ও মর্যাদা উৎসর্গকৃত বস্তুর চেয়েও অধিক হতে হবে। যেমন-জ্ঞান অর্জন বা সুস্বাস্থ্য লাভের জন্য সম্পদ ব্যয় করা, অথবা মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন পূরণের জন্য কোনো পশু কোরবানি করা। সংক্ষেপে বলা যায়, উদ্দেশ্য যত মহান হবে, সেই উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগও তত বেশি মর্যাদাপূর্ণ ও পরিপূর্ণ হবে।

এই দুটি বিষয় প্রত্যেক দান, ব্যয় ও আত্মত্যাগের মৌলিক শর্ত। এগুলো পূরণ হলেই সেই আত্মত্যাগ প্রকৃত অর্থে উত্তম বলে গণ্য হবে এবং আল্লাহর পথে করা আত্মোৎসর্গ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এই ভূমিকার আলোকে স্পষ্ট হয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়াম (আন্দোলন) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর পথে ছিল। কারণ, এতে এই দুটি শর্তই পূর্ণাঙ্গভাবে বিদ্যমান ছিল। অতএব, আশুরার দিনে তিনি যে সব আত্মত্যাগ ও ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, সেগুলো সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ছিল এবং আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য।

সংক্ষেপে বলা যায়:

‘ধ্বংসের আয়াত’ (অথবা যে কোনো দলিল যা আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ করে) মানুষের নিজের জীবনকে কোনো ঝুঁকির মধ্যে ফেলার সব ধরনের ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করে না। বরং যদি কোনো মহান ও মর্যাদাপূর্ণ উদ্দেশ্যের জন্য-যেমন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর চিরস্মরণীয় কিয়াম-নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করা হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ হয় না। কারণ, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগের মধ্যে মহৎ আত্মোৎসর্গ ও পবিত্র ত্যাগের সব শর্ত সর্বোত্তমভাবে বিদ্যমান ছিল।

যদি আশুরার দিনে হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগ না থাকত, তাহলে ইসলাম, কুরআন এবং ইতিহাসজুড়ে নবীগণ যে শিক্ষা ও আদর্শ নিয়ে এসেছিলেন-তা পূর্ববর্তী শাসকদের সৃষ্ট বিদআত, বিকৃতি ও ভ্রান্ত ধারণার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যেত এবং তার কোনো প্রকৃত চিহ্ন অবশিষ্ট থাকত না। যেমন পূর্ববর্তী ধর্মগুলোও নানা বিকৃতি ও পরিবর্তনের কারণে তাদের প্রকৃত রূপ অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছিল।

অতএব, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়াম একদিকে যেমন যুক্তিসঙ্গত ও বিবেকসম্মত ছিল, অন্যদিকে তাঁর উদ্দেশ্য এমন মহান ছিল যে, এর জন্য জীবন, সম্পদ, সন্তান এবং সংক্ষেপে নিজের সমগ্র অস্তিত্ব উৎসর্গ করাও ছিল সেই উদ্দেশ্যের তুলনায় মূল্যবান।

মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha