সোমবার ২০ জুলাই ২০২৬ - ১১:০৬
স্পেনের বিশ্বজয়: সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের এক প্রতীকী জবাব

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের জয় অনেকের কাছেই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের ফল নয়; বরং সাম্রাজ্যবাদী চাপ, জায়নবাদী আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের এক প্রতীকী বার্তা। যে স্পেন ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক নীতির বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল, সেই স্পেনই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপের ট্রফি জয় করে। আর সেই ট্রফি তুলে দিতে হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই—যিনি কয়েক মাস আগেও স্পেনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ট্রাম্পের ক্ষোভের পেছনে ছিল স্পেনের স্পষ্ট ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে স্পেন রোটা (Rota) ও মোরোন (Morón) সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে হামলা চালানোর অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট ভাষায় জানায়, যুদ্ধ নয়—সংলাপ ও কূটনীতিই সংকট সমাধানের একমাত্র কার্যকর পথ।

ফিলিস্তিন প্রশ্নেও স্পেন আপসহীন অবস্থান নিয়েছে। দেশটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছে, ইসরায়েলের প্রতি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থেকেছে। শুধু সরকার নয়, স্পেনের অনেক ফুটবলার ও ক্রীড়াবিদও প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন, যা বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এসব অবস্থানের জের ধরেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্পেনকে আক্রমণ করেন, দেশটির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক প্রতিশোধের হুমকি দেন এবং স্পেনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অসহযোগী’ হিসেবে অভিহিত করেন। রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের এই ভাষা ছিল স্পেনের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে, একই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন জানায়। বিপরীতে, ফিলিস্তিনিরা অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় স্পেনকে। ফলে এই সমর্থন নিছক ফুটবলীয় আবেগে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ন্যায়বিচার এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে বিপরীতমুখী নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে স্পেনের বিশ্বজয় অনেকের কাছে কেবল একটি ক্রীড়া অর্জন নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রের বিজয়, যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তাই এই জয়কে অনেকে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ও জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী জবাব হিসেবেই দেখছেন।

যে দেশকে কয়েক মাস আগেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে অপমান করেছিলেন, সেই স্পেনই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপ জয় করল। আর ট্রাম্পকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সেই দলের হাতে ট্রফি তুলে দিতে হলো। ইতিহাস কখনো কখনো এমন কিছু দৃশ্য নির্মাণ করে, যা কোনো বক্তৃতা বা রাজনৈতিক বিবৃতির চেয়েও শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

ফুটবল নিঃসন্দেহে একটি খেলা। কিন্তু সব সময় তা শুধু খেলা থাকে না। অনেক সময় একটি ম্যাচ, একটি ট্রফি কিংবা একটি বিজয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নৈতিক অবস্থান এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। মাঠের লড়াই তখন আর শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বিশ্বরাজনীতির আলোচনার অংশে পরিণত হয়।

তাই এই বিশ্বকাপকে অনেকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না। তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল এমন এক বৈশ্বিক মঞ্চ, যেখানে সাম্রাজ্যবাদ, জায়নবাদ, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকারের প্রশ্নও প্রতীকীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইতিহাসের ভাষা সব সময় শব্দে লেখা হয় না; কখনো কখনো একটি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্তও হয়ে ওঠে ন্যায়, প্রতিরোধ ও মর্যাদার এক শক্তিশালী প্রতীক।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha