হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা তাঁর সাম্প্রতিক বার্তায়, ইমাম এবং শহীদ নেতার আদর্শ অনুসরণ করে, আবারও ‘পবিত্র ঐক্য’-কে বিপ্লবের নেতৃত্বের কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন।
প্রথমেই লক্ষ্য করা উচিত, এই ধারণা কেবল একটি নৈতিক উপদেশ বা রাজনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং এটি ইসলামী বিপ্লবের দীর্ঘদিনের নীতির একটি হালনাগাদ ব্যাখ্যা। এখানে ঐক্যকে একই সঙ্গে ধর্মীয় দায়িত্ব, রাজনৈতিক অপরিহার্যতা এবং জাতীয় স্বার্থ ও কল্যাণ রক্ষার একটি কৌশলগত উপায় হিসেবে দেখা হয়েছে।
সংহতি ও ঐক্য রক্ষা: শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের পূর্বশর্ত
হুজ্জাতুল ইসলাম হাবিব বাবাই, হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বলেন যে ইসলামী বিপ্লবের দুই নেতা সবসময় সমাজের অভ্যন্তরে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লব শুরু থেকেই ইসলাম, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং ন্যায়বিচারের আদর্শকে কেন্দ্র করে জনগণের বিভিন্ন শক্তিকে একত্রিত করার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করেছে, যখনই এই সংহতি বজায় ছিল, দেশ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়েছে। আজও যুদ্ধ মোকাবিলায় সাফল্যের জন্য এই পবিত্র ঐক্য অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, ঐক্যের ওপর জোর দেওয়ার অর্থ মতভেদ অস্বীকার করা বা আন্তরিক ও সংস্কারমুখী সমালোচনাকে উপেক্ষা করা নয়। বরং রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ও জাতীয় স্বার্থের সীমার মধ্যে মতের বহুত্ব গ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা অব্যাহত থাকবে, তবে তা যেন জাতীয় ও বিপ্লবী ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
ঐক্য: নেতৃত্ব ও জনগণের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে
তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের চিন্তাধারায় ঐক্যের ভিত্তি হলো ঈমান, নেতৃত্ব (ইমামত) এবং উম্মাহর পারস্পরিক সম্পর্ক, যা ধর্মীয় শিক্ষা ও নিষ্পাপ ইমামদের জীবনাদর্শ থেকে উৎসারিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, ঐক্য বিনষ্ট করা শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়; বরং একটি পবিত্র বিষয়ে আঘাত। এছাড়া ঐক্যের প্রতি অবহেলা সমাজে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করে, যা শত্রুরই কাম্য।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতির পবিত্র ঐক্য ও সংহতি শত্রুর জটিল ষড়যন্ত্র মোকাবিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাই সবারই এ সত্য রক্ষায় ভূমিকা রাখা উচিত। কারণ, কর্মকর্তাদের প্রতি অবিশ্বাস ও জনগণের হতাশা একদিকে জাতীয় স্বার্থ দুর্বল করে, অন্যদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে সামাজিক সহনশীলতা কমিয়ে দেয়।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ এই নয় যে কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের যথার্থ সমালোচনা করা যাবে না। বরং সমালোচনা এমনভাবে করা উচিত যাতে তা জাতীয় সংহতি দুর্বল না করে।
ঐক্য ও সম্প্রীতি জোরদারে সব সক্ষমতাকে কাজে লাগানো
আইনবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হামেদ নিকুনাহাদ বলেন, দেশের সব ধরনের সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ ও বিচক্ষণভাবে কাজে লাগিয়ে জাতীয় সম্প্রীতি ও সংহতি শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পবিত্র ঐক্য রক্ষা ও জোরদারের চেষ্টা করা উচিত। এটি বর্তমান নেতা এবং শহীদ নেতার অন্যতম প্রধান আহ্বান। দেশের সব সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে শত্রুর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা যায়।
তিনি বলেন, সামাজিক ঐক্য ও সংহতি গড়ে ওঠে সমাজের বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যথাযথ ভূমিকার মাধ্যমে। তাদের উচিত সাধারণ জনগণের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া। এ জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবিত পরিবেশ থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে বাস্তব সমাজের পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে হবে এবং পূর্বধারণা ও পুনরাবৃত্ত তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে।
নিকুনাহাদ আরও বলেন, ইরানের জাতীয় পরিচয় ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইরান একটি প্রাচীন সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধ সভ্যতার দেশ। বিশেষ করে ইমাম খোমেনির আন্দোলন ও ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এই জাতীয় চেতনা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে একীভূত হয়েছে। তাঁর মতে, ইসলামী শিক্ষার প্রসারে ইরানি জাতির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনগণ ও রাষ্ট্রের ঐক্য: ইসলামী বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জনের শর্ত
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে পবিত্র ঐক্য এবং জনগণের সমর্থন বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে দেশের লক্ষ্য অর্জনের প্রধান শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বার্তাগুলোতে বিপ্লবের নেতার বারবার ঐক্য, সহনশীলতা, প্রতিরোধ ও দূরদর্শিতা-র মতো ধারণার ওপর জোর দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে একটি সমন্বিত চিন্তাধারা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ঐক্য মানে সচেতন সমন্বয়, যা শত্রু এবং বিশেষ করে তথাকথিত "সমন্বিত" ও "জ্ঞানগত" যুদ্ধের লক্ষ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
শেষে তিনি বলেন, দেশের বর্তমান সংবেদনশীল বাস্তবতা উপলব্ধি করে সবারই নিজ নিজ অবস্থান, বিশ্লেষণ ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা উচিত। তাঁর মতে, আজ ইরান আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাসের মতো কিছু সুযোগের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে পবিত্র ঐক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন, যা সাংস্কৃতিক, গণমাধ্যম ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা উচিত। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সংলাপের পরিবেশ জোরদার করা, ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা গ্রহণ করা এবং ইসলামী ও বিপ্লবী আদর্শের আলোকে শাসনব্যবস্থার কিছু দিক সংস্কার করাও প্রয়োজন।
আপনার কমেন্ট