হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘কারবালার পথে শহীদ, হযরত আয়াতুল্লাহুল উজমা ইমাম শহীদ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)’ শীর্ষক আন্তঃমাযহাব সম্মেলন ‘হালকায়ে কাদেরিয়া, বোলপুর’-এর উদ্যোগে এবং ‘দিল্লি কাউন্সিল ফর অ্যাপ্রক্সিমেশন অব ইসলামিক মাজহাব’-এর সহযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গের বোলপুর শহরে অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে বিভিন্ন ইসলামী মাযহাবের আলেম, গবেষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, তরুণ এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিত্বের বৈজ্ঞানিক, বৌদ্ধিক ও বিপ্লবী দিক, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য জোরদারে তাঁর ভূমিকা, বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি, ধর্মীয় পবিত্রতার মর্যাদা রক্ষা এবং নিপীড়িত জাতিগুলোর প্রতি সমর্থন নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানটি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর আয়োজকরা উপস্থিত অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও আলোচ্য বিষয় ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা বলেন, আয়াতুল্লাহুল উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর ব্যক্তিত্ব ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা, ঐক্য এবং ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার প্রতীক।
সম্মেলনের বক্তারা তাঁর বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও বিপ্লবী অবদান তুলে ধরে তাঁকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, মাযহাবগুলোর মধ্যে নৈকট্য, আন্তঃমাযহাব সংলাপ এবং জুলুম ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, বর্তমান সময়ে তাঁর চিন্তাধারা ও দিকনির্দেশনা মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা, সংহতি এবং নিপীড়িতদের পক্ষে অবস্থানের পথপ্রদর্শক।
পরবর্তী পর্বে বিভিন্ন মাযহাবের ধর্মীয়, একাডেমিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব শহীদ নেতার ব্যক্তিত্ব, চিন্তাধারা এবং অবদানের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন।
আহলে সুন্নাতের আলেম মুফতি নূরুল আইন মিসবাহী ‘ইমাম শহীদের আশুরামুখী জীবনাদর্শ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, আশুরা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল অবস্থান এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক।
কারি আহমদ হাসান ‘ইমাম শহীদের দৃষ্টিতে ভারতের অবস্থান ও গুরুত্ব’ শীর্ষক বক্তব্যে বলেন, ভারত প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত সহাবস্থানের কেন্দ্র। এই মূল্যবান ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
পরবর্তীতে হিন্দু সমাজের নেতা নলিশ চ্যাটার্জি ‘ইমাম শহীদের প্রতি ভারতের জনগণের শ্রদ্ধা’ শীর্ষক বক্তৃতায় বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শিক্ষা এবং সত্য ও ন্যায়বিচারের বার্তা কোনো একটি ধর্ম বা মাযহাবের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির যৌথ ঐতিহ্য।
মুফতি নূরুদ্দীন মিসবাহী আহলে সুন্নাতের পবিত্র বিষয়সমূহের অবমাননা নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সর্বোচ্চ নেতার ফতোয়ার ব্যাখ্যা করে বলেন, এই ফতোয়া মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সুদৃঢ় করা, ধর্মীয় পবিত্রতার মর্যাদা রক্ষা এবং মুসলমানদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির এক স্থায়ী সনদ।
তরিকতের শায়খ সাইয়্যেদ রশাদাত আলী কাদেরি ‘ইমাম শহীদের জানাজার বৈশ্বিক প্রতিফলন’ শীর্ষক বক্তব্যে বলেন, এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে সত্য, প্রতিরোধ ও অবিচলতার আদর্শ ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী স্বাধীনচেতা মানুষের অভিন্ন সম্পদে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া হালকায়ে কাদেরিয়ার তত্ত্বাবধায়ক সাইয়্যেদ আলী জুন কাদেরি শহীদ নেতার ব্যক্তিত্ব ও কারবালামুখী ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, তাঁর জীবনাদর্শ আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ এবং ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার সংস্কৃতি প্রসারে অনুপ্রেরণার উৎস।
সম্মেলনের শেষ পর্বে ‘কাউন্সিল ফর অ্যাপ্রক্সিমেশন অব ইসলামিক মাজহাব’-এর সভাপতি হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ সাদিক হুসাইনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা সবসময় মুসলমানদের ঐক্যকে ইসলামী চিন্তার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, শিয়া ও সুন্নি একই উম্মাহর সদস্য এবং ইসলামের শত্রুরা সর্বাগ্রে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, যদি মুসলিম উম্মাহ পবিত্র কুরআন, মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ এবং আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষাকে ঐক্য ও অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, তবে কোনো শক্তিই তাদের দুর্বল করতে পারবে না। তিনি আহলে সুন্নাতের পবিত্র বিষয়সমূহের অবমাননা নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সর্বোচ্চ নেতার ঐতিহাসিক ফতোয়াকে ইসলামী ঐক্যের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই ফতোয়া মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সম্মান এবং বিভিন্ন ইসলামী মাযহাবের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি তরুণদের সর্বোচ্চ নেতার চিন্তাধারা, প্রজ্ঞা এবং ঐক্যের বার্তা সম্পর্কে জানার, তা ব্যাখ্যা করার এবং সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা, স্বাধীনতা ও শক্তি নির্ভর করছে ঐক্য, সচেতনতা, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সহযোগিতার ওপর।
আপনার কমেন্ট