হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, দিল্লিভিত্তিক তাকরিবে মাজাহিব (ইসলামী মাযহাবসমূহের নৈকট্য) ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ সাদিক হুসাইনি বলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর শাহাদাত মুসলমানদের জন্য যেন ‘দ্বিতীয় আশুরা’ ছিল।
তিনি বলেন, এই সংবাদ শোনার পর আমরা নিজেদের এতিম মনে করেছি। জীবনে বাবা-মায়ের মৃত্যু, ইমাম শহীদ এবং সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতসহ একাধিক শোকের ঘটনা দেখেছি। কিন্তু আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর শাহাদাত এমন এক ঘটনা ছিল, যেন আরেকটি আশুরা সংঘটিত হলো। প্রথমে মনে হয়েছিল সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। পরে উপলব্ধি করি, পথ ও লক্ষ্য জীবিত রয়েছে এবং শাহাদাত এই পথের শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নিজের পরিচয় ও সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি একটি ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে উঠেছেন এবং ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবার কাছ থেকে ইমাম খোমেনি (রহ.) এবং পরে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর নাম শুনেছেন।
১৯৯৫ সালে হযরত মাসুমা (সা.)-এর পবিত্র মাজারে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। এরপর থেকে নিজের চিন্তাধারা, জীবনযাপন এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। কোমে অধ্যয়নের সময়ও তিনি নিয়মিত তাঁর বক্তব্য অনুসরণ করতেন এবং সুযোগ পেলেই ইরানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম হুসাইনি বলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর আধ্যাত্মিক মর্যাদা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; ভারতের বহু সুন্নি আলেমও তাঁর শাহাদাতের সংবাদে অশ্রুপাত করেছেন। এমনকি অমুসলিমরাও এতে মর্মাহত হয়েছেন এবং ভারতে লাখো মানুষ এ ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, ইরানে প্রথম আসার সময় বিভিন্ন দেয়ালে ইমাম খোমেনির (রহ.) একটি বিখ্যাত উক্তি দেখতেন-‘বেলায়াতে ফকিহের সমর্থনে থাকো, তাহলে তোমাদের দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।‘ সে সময় এই কথার গভীরতা তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি। এখন তাঁর মতে, বেলায়াতে ফকিহের প্রতি জনগণের সমর্থনের কারণেই ইরান তার ভূখণ্ড, জাতীয় সম্পদ এবং নিরাপত্তা বড় বড় হুমকি ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের বাইরে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কারণ মনে হয়েছে জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি। তাঁর ভাষায়, জনগণ যখনই মাঠে নেমেছে, তখনই বহু ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে এবং বিভিন্ন বিচ্যুত গোষ্ঠী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
ইমাম খোমেনির (রহ.) একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে হুসাইনি বলেন, ‘মানুষের এই যুগের মানুষ রাসূলুল্লাহ (সা.), আমিরুল মুমিনীন (আ.), ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যুগের মানুষের চেয়েও উত্তম’-এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে তাঁর বহু বছর লেগেছে।
তাঁর মতে, আজকের ইরানি জনগণ তাদের নেতাকে একা ছেড়ে যায়নি, অথচ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইমামরা একাকী হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, নেতার শাহাদাতের একশোরও বেশি রাত পেরিয়ে গেলেও জনগণ এখনো মাঠে রয়েছে এবং এটি বিশ্ববাসীর জন্য বিস্ময় ও গর্বের বিষয়।
দিল্লির তাকরিবে মাজাহিব ইনস্টিটিউটের এই দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগানো জরুরি। তাঁর মতে, আজ মানুষ ইমাম শহীদের চিন্তাধারা, রচনা, বক্তব্য ও জীবনাদর্শ জানতে আগ্রহী। তাই আলেম, বুদ্ধিজীবী ও দায়িত্বশীলদের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁর চিন্তা ও শিক্ষাকে সমাজের সামনে তুলে ধরা।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে ইসলামী বিপ্লবের নেতার প্রতিনিধিরা, এমনকি সুন্নি ও অমুসলিম সমাজেও ব্যাপক সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন, যা এই চিন্তাধারার প্রতি মানুষের আগ্রহের প্রতিফলন।
গাজায় চলমান হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিছু মুসলিম গোষ্ঠীর নীরবতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা নিজেদের ইসলামী বিশ্বের ধর্মীয় নেতৃত্বের দাবিদার, তাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত-গাজার মানুষের ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের সময় তারা কী ভূমিকা পালন করেছে? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হাজার হাজার নারী ও শিশু নিহত হলেও অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্ব কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। অথচ ইসলামের শিক্ষা মুসলমানদের একে অপরের ভাগ্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বলে।
তিনি দাবি করেন, ইসলাম রক্ষার দাবিদার অনেক গোষ্ঠী গাজার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এবং এ কারণে বিশ্বের মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ ইসলামের পরিচয় জানতে আগ্রহী। তাঁর মতে, হয়তো আল্লাহর ইচ্ছায় আশুরা, কারবালা, আহলে বাইতের মক্তব এবং বিশুদ্ধ মুহাম্মদী ইসলামের সত্য আরও ব্যাপকভাবে বিশ্বের সামনে প্রকাশিত হচ্ছে।
শেষে হুজ্জাতুল ইসলাম হুসাইনি বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) যে পথের সূচনা করেছিলেন এবং আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী যা অব্যাহত রেখেছিলেন, তা আজ বিশ্বকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে যেখানে মানুষ প্রকৃত ইসলামকে জানার জন্য আগ্রহী।
তিনি বলেন, এখন ইরানের জনগণ, বুদ্ধিজীবী ও দায়িত্বশীলদের কর্তব্য হলো এই ঐতিহাসিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আশুরার বার্তা, আহলে বাইতের মক্তব এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা।
আপনার কমেন্ট