হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ধর্মীয় প্রশ্নের জাতীয় উত্তরদাতা কেন্দ্রের কালাম ও আকিদা বিভাগের বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন এবাদি-নিককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল-আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন জিয়ারতকারীরা বিশেষ করে আরবাইনের জিয়ারতের জন্য দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন এবং এই পথের কষ্ট সহ্য করেন?
তিনি উত্তরে বলেন: অতীতে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ সাধারণত জিয়ারতের সফরে অনেক কষ্ট ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন এবং কখনো কখনো দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতেন। কিন্তু বর্তমানে গাড়ি, বিমান ও অন্যান্য যানবাহনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রশ্ন আসে-কেন মানুষ এখনো বিশেষ করে আরবাইনের জিয়ারতের জন্য পায়ে হাঁটার পথ বেছে নেন এবং এর কষ্ট সহ্য করেন?
তিনি আরও বলেন: এর উত্তরে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, বিশেষ করে আরবাইনের মতো জিয়ারতের উদ্দেশ্য শুধু ইমাম মাসুম (আ.)-এর পবিত্র কবরের পাশে উপস্থিত হওয়া নয়। যদিও ইমামের মাজারে উপস্থিত হওয়া জিয়ারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য এবং এতে জিয়ারতকারী বহু বরকত লাভ করেন, তবে এই আধ্যাত্মিক আন্দোলনের আরও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে।
আরবাইনের পদযাত্রার অন্যতম দর্শন: আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান
হুজ্জাতুল ইসলাম এবাদি-নিক বলেন: ইমাম মাসুম (আ.)-এর জিয়ারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য, বিশেষ করে আরবাইনের জিয়ারত, হলো আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান প্রদর্শন। যখন কয়েক মিলিয়ন মানুষ মহিমা ও বিশালতার সঙ্গে দীর্ঘ আরবাইন পথ অতিক্রম করে সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে পৌঁছান, তখন এই পদযাত্রা প্রকৃতপক্ষে একটি গণআন্দোলন ও বিশাল মানবিক সমাবেশে পরিণত হয়। এখানে আল্লাহর মূল্যবোধ, দ্বীনি আদর্শ এবং সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.)-এর আন্দোলনের লক্ষ্যসমূহ প্রকাশিত হয় এবং বিশ্বের সামনে উপস্থাপিত হয়।
তিনি বলেন: আরবাইনের পদযাত্রা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ব্যক্তিগত একটি যাত্রা নয়; বরং এটি দ্বীনি মূল্যবোধের সম্মান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতি গঠনের একটি মাধ্যম। এই মহান আন্দোলনে আল্লাহর জন্য সংগ্রাম, ইসলামী সমাজের মর্যাদা ও সম্মান, স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রকাশ পায়।
ধর্মীয় প্রশ্নের জাতীয় উত্তরদাতা কেন্দ্রের এই বিশেষজ্ঞ বলেন: এই কারণেই আরবাইনের সময় বিশ্বের বহু মানুষের দৃষ্টি পৃথিবীর এই অঞ্চলের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং আশুরার শিক্ষা ও সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.)-এর আন্দোলনের বার্তা সারা বিশ্বে পৌঁছে যায়। তাই আরবাইনের পদযাত্রাকে শুধু ব্যক্তিগত একটি জিয়ারত সফর হিসেবে নয়; বরং একটি বৃহৎ ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
পদযাত্রা: ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ
তিনি আরবাইনের পদযাত্রার আবেগময় ও আধ্যাত্মিক দিক সম্পর্কে বলেন: জিয়ারতের জন্য পদযাত্রার মধ্যে ইমাম মাসুম (আ.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও অধিক আনুগত্য প্রকাশের একটি দিক রয়েছে। যখন একজন মানুষ কোনো শহীদ ইমামের জিয়ারতের জন্য দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন এবং কষ্ট ও কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করেন, তখন এই কাজ তাঁর অধিক ভালোবাসা, গভীর আনুগত্য এবং সেই মহান ইমামের সঙ্গে শক্তিশালী হৃদয়ের সম্পর্কের প্রতীক হতে পারে।
হুজ্জাতুল ইসলাম এবাদি-নিক আরও বলেন: মনে রাখতে হবে, অতীতেও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা না থাকলেও মানুষের কাছে ঘোড়া ও উটের মতো যাতায়াতের মাধ্যম ছিল। তবুও আহলে বাইত (আ.)-এর জীবনধারায় জিয়ারত ও ইবাদতের জন্য পায়ে হেঁটে যাওয়ার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন: উদাহরণস্বরূপ, বর্ণিত হয়েছে যে ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) কয়েকবার পায়ে হেঁটে হজ পালন করতে গিয়েছেন। এটি দেখায় যে ইবাদত ও জিয়ারতের পথে পায়ে হাঁটা এবং কষ্ট সহ্য করার মধ্যেও আধ্যাত্মিক মূল্য রয়েছে। এটি আল্লাহ ও তাঁর ওলিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক বৃদ্ধি, ভালোবাসা প্রকাশ এবং গভীর আনুগত্যের মাধ্যম হতে পারে।
আরবাইন: একটি ইবাদত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন
শেষে ধর্মীয় প্রশ্নের জাতীয় উত্তরদাতা কেন্দ্রের কালাম ও আকিদা বিভাগের বিশেষজ্ঞ জোর দিয়ে বলেন: বর্তমান যুগে ব্যাপক পরিবহন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আরবাইনের পদযাত্রাকে শুধু একটি ঐতিহ্যগত যাতায়াত পদ্ধতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এই মহান আন্দোলন একটি ইবাদত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্ম, যা জিয়ারতের পাশাপাশি আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান, মুমিনদের ঐক্য শক্তিশালী করা, আশুরার সংস্কৃতির প্রচার এবং সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.)-এর আন্দোলনের বার্তা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আপনার কমেন্ট