শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬ - ১৯:৫৫
গাজার পক্ষে মরক্কানদের অভিনব ডিজিটাল উদ্যোগ

গাজা ও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানাতে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বৃহৎ এক ডিজিটাল প্রতিবাদ কর্মসূচি। ‘বাব আল-মাগারিবা তোমাদের ডাকছে’ শীর্ষক এ কর্মসূচিতে আলেম, চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, ধর্মীয় বক্তা, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীরা অংশ নেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মুসলিম আলেমদের বিশ্বসংঘের কুদস ও ফিলিস্তিন কমিটি এবং ফিলিস্তিনের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রুপ যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আল-আকসা মসজিদ, গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে চলমান পরিস্থিতি, দখলদারিত্ব এবং জেরুজালেমের জনমিতিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

কর্মসূচিতে বক্তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন এবং ফিলিস্তিনের প্রতি মরক্কোর জনগণের ঐতিহাসিক ও আবেগগত সংযোগের কথা তুলে ধরেন।

কুদস ও গাজার প্রতি ডিজিটাল সংহতি
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ফিলিস্তিনের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রুপের সমন্বয়ক ড. আবদুল হাফিজ আল-সারিতিসহ মরক্কোর বেশ কয়েকজন আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তি।

বক্তারা মরক্কোর জনগণের সঙ্গে পবিত্র জেরুজালেমের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে বাব আল-মাগারিবা বা ‘মরক্কানদের ফটক’-এর সঙ্গে মরক্কোর ঐতিহাসিক বন্ধনের কথা তুলে ধরেন।

আল-আকসা মসজিদকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা প্রসঙ্গে বক্তারা সেখানে প্রবেশে বাধা, হামলা ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের অভিযোগ তুলে ধরেন। পাশাপাশি মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েলি উগ্রপন্থীদের বিভিন্ন বক্তব্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আলোচনায় অধিকৃত জেরুজালেমে বসতি সম্প্রসারণ, জনমিতিক পরিবর্তন, ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ এবং বাড়িঘর ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন অভিযোগও উঠে আসে।

পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, সড়ক নির্মাণ, দেয়াল ও সামরিক চেকপয়েন্ট স্থাপন এবং বিভিন্ন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও বসবাসের ওপর বিধিনিষেধের বিষয় তুলে ধরেন।

গাজার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বক্তারা অবরোধ, খাদ্যসংকট ও ব্যাপক প্রাণহানির কথা উল্লেখ করেন এবং উপত্যকায় মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর আহ্বান জানান।

স্বাভাবিকীকরণ নীতি নিয়ে উদ্বেগ
ফিলিস্তিনের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রুপের মহাসচিব আজিজ হানাউই বলেন, মরক্কোর এই ডিজিটাল প্রতিবাদ কর্মসূচি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন গাজা, পশ্চিম তীর এবং ফিলিস্তিনি জনগণের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ।

তিনি ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট রয়েছে। তাঁর মতে, ফিলিস্তিন শুধু আরব ও মুসলিম বিশ্বের জন্য নয়, বরং মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্ববাসীর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

হানাউই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের নীতির সমালোচনা করেন এবং এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ জোরদারের আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতাকারী মরক্কোর একটি পর্যবেক্ষক সংগঠনের প্রধান আহমদ ওয়েইহমান সংবাদমাধ্যম আল-আহদ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, স্বাভাবিকীকরণ নীতি মরক্কোর জন্য গুরুতর রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করছে।

ওয়েইহমানের দাবি, স্বাভাবিকীকরণের যেসব বিষয়কে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তার বিপরীতে মরক্কোর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে ইসরায়েলি প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, মরক্কোর জনগণের উচিত দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এ ধরনের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

কর্মসূচির সুপারিশ
ডিজিটাল প্রতিবাদ কর্মসূচির শেষে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। এতে মরক্কোর নীতিনির্ধারকদের প্রতি রাবাতে অবস্থিত ইসরায়েলি যোগাযোগ কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।

ঘোষণাপত্রে ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে সমর্থনকারী প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বয়কট কর্মসূচি আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইনের বিশেষজ্ঞ এবং আইনজীবীদের প্রতি যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঘোষণাপত্রে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ উন্মুক্ত করা, অবরোধের অবসান এবং ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারেরও আহ্বান জানানো হয়।

মরক্কোর এ ডিজিটাল কর্মসূচি দেশটির ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয়ের একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। এর মাধ্যমে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনমত গঠন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা এবং গাজাবাসীর প্রতি সংহতি আরও জোরদারের বার্তা দিয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha