হাওজা নিউজ এজেন্সি: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে বর্ণিত এই হাদিসে হযরত ঈসা (আ.) বনি ইসরাইলকে ‘হিকমত’ (প্রজ্ঞা) প্রচারের সঠিক পদ্ধতি এবং সন্দেহজনক বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন।
বক্তব্যের সারাংশ:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম! আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর একটি বাণী উদ্ধৃত করে বলেন,
إِنَّ عِيسَى بْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَامَ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ فَقَالَ: يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ، لَا تُحَدِّثُوا بِالْحِكْمَةِ الْجُهَّالَ فَتَظْلِمُوهَا.
“হে বনি ইসরাইল! অজ্ঞদের সামনে প্রজ্ঞার কথা বলো না; তা করলে তোমরা সেই প্রজ্ঞার প্রতিই অবিচার করবে।”
এখানে ‘অজ্ঞ’ (الجهّال) বলতে সকল অশিক্ষিত মানুষকে বোঝানো হয়নি। বরং তাদের বোঝানো হয়েছে, যারা গভীর ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করার মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা রাখে না, অথবা তা জানার কোনো আগ্রহও পোষণ করে না।
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো মূল্যবান জ্ঞান এমন ব্যক্তির সামনে উপস্থাপন করা হয়, যে তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। ফলে সে বিষয়টিকে অস্বীকার করে, উপহাস করে বা তার গুরুত্ব নষ্ট করে ফেলে। এতে জ্ঞানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং শ্রোতারও কোনো কল্যাণ হয় না। তাই হাদিসে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরপর হযরত ঈসা (আ.) বলেন,
وَلَا تَمْنَعُوهَا أَهْلَهَا فَتَظْلِمُوهُمْ.
“আর যারা প্রজ্ঞার উপযুক্ত, তাদের কাছ থেকে তা গোপন করো না; অন্যথায় তাদের প্রতি অবিচার করা হবে।”
অর্থাৎ যাদের মধ্যে জ্ঞান গ্রহণের যোগ্যতা, আগ্রহ ও সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা রয়েছে, তাদের কাছে হিকমত পৌঁছে দেওয়া একটি দায়িত্ব। তাদের বঞ্চিত করা অন্যায়।
হাদিসে আরও বলা হয়েছে:
وَلَا تُعِينُوا الظَّالِمَ عَلَى ظُلْمِهِ فَيُبْطِلَ فَضْلَكُمْ
“অত্যাচারীকে তার অত্যাচারে সহযোগিতা করো না; নচেৎ তোমাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।”
এরপর হযরত ঈসা (আ.) মানুষের জীবন-পরিচালনার জন্য এক মৌলিক নীতিমালা বর্ণনা করেন:
الْأُمُورُ ثَلَاثَةٌ: أَمْرٌ تَبَيَّنَ لَكَ رُشْدُهُ فَاتَّبِعْهُ، وَأَمْرٌ تَبَيَّنَ لَكَ غَيُّهُ فَاجْتَنِبْهُ، وَأَمْرٌ اخْتُلِفَ فِيهِ فَرُدَّهُ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
অর্থাৎ, মানুষের সামনে বিষয় সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে—
১. যে বিষয়ে সত্য ও সঠিক পথ স্পষ্ট
أَمْرٌ تَبَيَّنَ لَكَ رُشْدُهُ فَاتَّبِعْهُ.
“যে বিষয়ে সঠিক পথ তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে, তা অনুসরণ করো।”
যখন কোনো বিষয়ের সত্যতা, ন্যায়পরায়ণতা বা কল্যাণকর দিক সুস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন দ্বিধা না করে তা গ্রহণ করা উচিত।
২. যে বিষয়ে ভ্রান্তি ও অসত্যতা স্পষ্ট
وَأَمْرٌ تَبَيَّنَ لَكَ غَيُّهُ فَاجْتَنِبْهُ
“যে বিষয়ে ভ্রান্তি স্পষ্ট হয়ে গেছে, তা থেকে দূরে থাকো।”
যে কাজ বা চিন্তাধারার অসারতা, অন্যায় বা ক্ষতিকর দিক পরিষ্কারভাবে জানা যায়, তা পরিহার করাই মুমিনের কর্তব্য।
৩. যে বিষয় সন্দেহপূর্ণ ও অস্পষ্ট
وَأَمْرٌ اخْتُلِفَ فِيهِ فَرُدَّهُ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
“আর যে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, তা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করো।”
অর্থাৎ এমন কোনো বিষয়ে, যার সঠিক বা ভুল হওয়া এখনো স্পষ্ট নয়, সেখানে তড়িঘড়ি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। বরং ধৈর্য, সতর্কতা ও আল্লাহর নির্দেশনার অপেক্ষা অবলম্বন করতে হবে। সময়মতো সত্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং আল্লাহ তাআলা সঠিক উপলব্ধির পথ উন্মুক্ত করবেন।
হাদিসের মূল শিক্ষা
এই হাদিস আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা দেয়—
১. প্রজ্ঞা ও জ্ঞান যথাস্থানে এবং উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে উপস্থাপন করতে হবে।
২. জ্ঞান গ্রহণে সক্ষম ব্যক্তিকে কখনো জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
৩. স্পষ্ট সত্যকে অনুসরণ করতে হবে, স্পষ্ট মিথ্যা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং সন্দেহজনক বিষয়ে অযথা চূড়ান্ত রায় না দিয়ে আল্লাহর হিদায়াত ও সত্যের সুস্পষ্টতার অপেক্ষা করতে হবে।
এভাবেই হিকমত তার মর্যাদা রক্ষা করে, জ্ঞান সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং সমাজ বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতার ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে।
আপনার কমেন্ট