স্থানীয় উদ্যোগ থেকে জাতীয় কর্মসূচি
‘ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ’-এর ধারণার শিকড় ইরানের ইসলামী বিপ্লবেরও আগের সময়ে পৌঁছে যায়। ১৯৭০-এর দশকে সিস্তান ও বালুচিস্তান অঞ্চলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী স্থানীয় সুন্নি আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শিয়া ও সুন্নিদের যৌথভাবে মহানবী (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ইরানশাহরে সুন্নি আলেম মাওলানা কামারুদ্দিনের সঙ্গে ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত যৌথভাবে উদযাপনের পরিকল্পনার কথাও স্মরণ করেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এই ধারণাকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসেন। ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত সময়কে ‘ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর বক্তব্যের আর্কাইভেও বলা হয়েছে, বিপ্লবের শুরু থেকেই এই সময়কে মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

কেন ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল?
মহানবী (সা.)-এর জন্মতারিখ নিয়ে ইসলামি ঐতিহ্যে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ১২ রবিউল আউয়াল একটি বহুল প্রচলিত তারিখ; অন্যদিকে শিয়া মুসলমানদের মধ্যে ১৭ রবিউল আউয়াল প্রচলিত। ইরানের উদ্যোগে এই দুই তারিখের মধ্যবর্তী সময়কে ঐক্যের সপ্তাহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যে পাঁচ দিনের ব্যবধানকে মতপার্থক্যের প্রতীক হিসেবে দেখা যেত, ইরান সেটিকেই শিয়া-সুন্নি সম্প্রীতির প্রতীকে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী এক বক্তব্যে এই সময়কে মুসলিম ঐক্যের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ঐক্য মানে মতপার্থক্য বিলোপ নয়
ইসলামি ঐক্য সপ্তাহের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে শিয়া ও সুন্নি মাজহাবের ধর্মীয় ও ফিকহি পার্থক্য পুরোপুরি বিলুপ্ত করার কথা বলা হয় না। বরং লক্ষ্য হলো মতপার্থক্য বজায় রেখেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও অভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানো।
এই ধারণাকে ইরানে ‘তাকরিব’ বা ইসলামি মাজহাবগুলোর মধ্যে নৈকট্য প্রতিষ্ঠা বলা হয়। বিশ্ব ইসলামি মাজহাবগুলোর নৈকট্য ফোরামের ঘোষিত লক্ষ্যও হলো বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারীদের মধ্যে পরিচিতি, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান ও ইসলামি ভ্রাতৃত্ব জোরদার করা।

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলেম-গবেষকের উপস্থিতি
ইসলামি ঐক্য সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনগুলোর একটি হলো তেহরানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলন। সম্মেলনের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম বিশ্বের আলেম ও গবেষকদের মধ্যে মতবিনিময়, বিভিন্ন মাজহাবের চিন্তাগত দূরত্ব কমানো এবং মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার পথ খোঁজা। ১৯৯০ সাল থেকে সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তিত হলেও বর্তমানে World Forum for Proximity of Islamic Schools of Thought এ আয়োজনের মূল দায়িত্ব পালন করছে।
২০২৫ সালের ৩৯তম আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৫০ জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, আলেম, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী অংশ নেন। সম্মেলনে ৪০০টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং ২০০টি ভার্চুয়াল বক্তৃতা উপস্থাপিত হয়। ওই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নবী অব রহমত ও উম্মাহর ঐক্য’।
২০২৬ সালের আয়োজনে নতুন মাত্রা
চলতি ২০২৬ সালের ৪০তম আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৩০টি দেশ থেকে প্রায় ১৪০ জন আন্তর্জাতিক বক্তা অনলাইন ‘ইউনিটি উইক’ ওয়েবিনারে অংশ নিচ্ছেন। যুদ্ধাবস্থা ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সীমাবদ্ধতায়ও মূল সম্মেলনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন বিদেশি অতিথির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
এবারের সম্মেলনের মূল পর্ব ২৭ আগস্ট তেহরানে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং ৩০ আগস্ট মাশহাদে সমাপনী আয়োজন হওয়ার কথা। তেহরানের পাশাপাশি কোম, পশ্চিম আজারবাইজান, কুর্দিস্তান, গোলেস্তান ও রেজাভি খোরাসানেও বিভিন্ন বিকেন্দ্রীভূত কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
২০২৬ সালের সম্মেলনে ইসলামি ঐক্য, শান্তি, নিরাপত্তা ও মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত শক্তির পাশাপাশি ইসলামি পরিচয়, শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ফিলিস্তিন ও লেবানন এবং মুসলিম বিশ্বের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনে ৩৬০টি গবেষণাপত্র ইতোমধ্যে জমা পড়েছে এবং সময় বাড়ানো হলে তা ৪০০ ছাড়াতে পারে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শুধু সম্মেলন নয়, মাঠপর্যায়ের কর্মসূচিও
ইসলামি ঐক্য সপ্তাহকে কেন্দ্র করে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় আলোচনা, সেমিনার, মিলাদ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিয়া-সুন্নি আলেমদের মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়েও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পাশাপাশি অনলাইন ওয়েবিনারও এখন এই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের আয়োজনে ৩০টি দেশ থেকে প্রায় ১৪০ জন আন্তর্জাতিক বক্তার অংশগ্রহণে ইউনিটি উইক ওয়েবিনার আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ইরানের জন্য এর রাজনৈতিক গুরুত্ব
ইসলামি ঐক্য সপ্তাহের তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় চিন্তায় মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মাজহাবগুলোর নৈকট্য দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইরানি নেতৃত্বের বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের বিভাজনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এ কারণে ইসলামি ঐক্য সপ্তাহকে একদিকে সুন্নি-শিয়া সম্প্রীতির ধর্মীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে এটি ইরানের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক নীতিরও একটি অংশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের আলেম, গবেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একত্রিত করার মাধ্যমে ইরান মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে।
সমর্থন ও সমালোচনা—দুই দিকই আছে
ইসলামি ঐক্য সপ্তাহের সমর্থকদের মতে, মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও কুরআন, মহানবী (সা.), তাওহিদ, কাবা ও ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মতো অভিন্ন ভিত্তিগুলোকে সামনে রেখে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অন্যদিকে, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে ‘ইসলামি ঐক্য’ ধারণাটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে এই উদ্যোগকে শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতির কর্মসূচি হিসেবে না দেখে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাত্রাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ইরানের ‘ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ’ একটি স্থানীয় শিয়া-সুন্নি সম্প্রীতির উদ্যোগ থেকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়ালের মধ্যবর্তী সময়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ উদ্যোগের মূল বার্তা হলো—মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের অভিন্ন বিশ্বাস, স্বার্থ ও পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্য ও সহযোগিতা সম্ভব।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত আলেম, গবেষক ও চিন্তাবিদের অংশগ্রহণ এ উদ্যোগের আন্তর্জাতিক পরিসরকে তুলে ধরে। ২০২৪ সালে ৩০ দেশ থেকে ৭৮ জন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং ২০২৫ সালে ৩৫০ জন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্বের অংশগ্রহণ সেই বিস্তারের উদাহরণ। আর ২০২৬ সালের আয়োজনে ৩০ দেশ থেকে প্রায় ১৪০ জন আন্তর্জাতিক বক্তার অনলাইন অংশগ্রহণ এবং প্রায় ৮০ জন বিদেশি অতিথির সরাসরি উপস্থিতির তথ্য এ আয়োজনের ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক গুরুত্ব নির্দেশ করে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ শুধু একটি ধর্মীয় সপ্তাহ নয়; এটি শিয়া-সুন্নি সংলাপ, মাজহাবগুলোর নৈকট্য এবং বৃহত্তর মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে সামনে আনার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা। একই সঙ্গে এর ধর্মীয় উদ্দেশ্যের পাশাপাশি ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এ উদ্যোগকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার কমেন্ট