শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬ - ২০:২০
ঐক্যই মুসলমানদের সংকট অতিক্রমের চাবিকাঠি; বাজারে শৃঙ্খলার জন্য দায়িত্বশীলদের বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে

ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের জুমার খতিব আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মদ সাঈদী বলেছেন, মুসলমানদের বিভেদ তাদের দুর্বল করে এবং শত্রুদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে; তাই ঐক্যই মুসলমানদের সংকট অতিক্রমের চাবিকাঠি। তিনি দেশটির সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জনগণের আস্থা ও মনোবল ধরে রাখতে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীলদের এমন কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো ঘোষণায় অযথা বাজারে অস্থিরতা তৈরি না হয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কোমের মুসাল্লা-এ কুদসে জুমার নামাজের খুতবায় তিনি ‘ঐক্য সপ্তাহ’-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ইসলামের বিস্তারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ঐক্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ইসলাম ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির ভিত্তিতে বিস্তার লাভ করেছিল।

তিনি বলেন, আওস ও খাজরাজের মধ্যে যখন তীব্র বিরোধ চলছিল এবং তারা উপলব্ধি করল যে এই বিরোধ তাদের উভয়ের ওপর ব্যাপক ক্ষতি ও ব্যয় চাপিয়ে দিচ্ছে, তখন তারা ইসলামের দিকে ফিরে আসে এবং অন্ধকার থেকে মুক্তি লাভ করে।

আয়াতুল্লাহ সাঈদী বলেন, যে মুসলমানরা ইসলামের ছায়ায় ঐক্য অর্জন করেছিল, তারা কেন আবার বিভেদের দিকে যাবে এবং আল্লাহর শত্রুদের ওপর আস্থা রাখবে? মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এটি বিশ্বপরিসরে তাদের শক্তি ও প্রভাব কমিয়ে দেয় এবং ইসলামের শত্রু ও বিরোধীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, বিভেদের কারণে মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠন, হত্যাকাণ্ড, মুসলিম ভূখণ্ড দখল, ধ্বংস ও নির্যাতনের সুযোগও শত্রুরা পেয়ে থাকে।

আয়াতুল্লাহ সাঈদী বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মুসলমানরা যখন শত্রুর মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ ছিল, তখন তারা বড় বড় বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু যখন তারা বিভক্ত হয়েছে, তখন শত্রুরা তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির সুযোগ পেয়েছে। অতএব, মুসলমানদের সংকট অতিক্রমের চাবিকাঠি হলো ঐক্য রক্ষা করা।

তিনি নাহজুল বালাগায় হযরত আলী (আ.)-এর বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আল্লাহ তাআলা অতীত বা ভবিষ্যৎ কোনো জাতিকে বিভেদের মাধ্যমে কল্যাণ দান করেননি। তাই সবাইকে ফিতনা, ষড়যন্ত্র ও শত্রুর অনুপ্রবেশ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

দায়িত্বশীলরা জনগণের সঙ্গে কথা বলার সময় আশাবাদ সৃষ্টি করবেন
কোমের জুমার খতিব বলেন, দায়িত্বশীলদের কখনোই দুর্বলতা, অক্ষমতা ও হতাশার বর্ণনাকারী হওয়া উচিত নয়। তারা যখন জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন, তখন সব পরিস্থিতিতেই দেশের শক্তি ও সক্ষমতার কথা তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের দুর্বলতা ও ঘাটতি রয়েছে; তবে এসব সমস্যার মুখোমুখি শুধু ইরান নয়, সব দেশই নানা সমস্যার সম্মুখীন। একই সঙ্গে দেশের প্রয়োজনীয় শক্তি ও সক্ষমতাও রয়েছে এবং তা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। তাই এসব সক্ষমতা ও প্রচেষ্টার কথাও জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

তিনি দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে বলেন, তাদের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয় এবং সবার জন্যও এমন সুযোগ আসে না।

বাজারে শৃঙ্খলার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে
আয়াতুল্লাহ সাঈদী বাজার পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, দায়িত্বশীলদের বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি প্রশ্ন করেন, এমন কোনো বিষয় কেন ঘোষণা করা হবে, যা জনগণের মধ্যে অস্থিরতা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে? তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি দায়িত্বশীলদের অব্যবস্থাপনার লক্ষণ।

তিনি বলেন, জনগণের মনে এমন ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয় যে বাজারকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ বাজার নিয়ন্ত্রণহীন—এমন অনুভূতি মানুষের মনোবল ও মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সতর্কতা ও মিডিয়া-সাক্ষরতা জ্ঞানযুদ্ধ মোকাবিলার উপায়
আয়াতুল্লাহ সাঈদী বলেন, জনগণের সংস্কৃতিতে শত্রুর অনুপ্রবেশ এবং মানুষের রুচি পরিবর্তনের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করা এবং ধর্মীয় ও জাতীয় মূল্যবোধ দুর্বল করে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা। এ কাজে সমাজের পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই আক্রমণ মোকাবিলার উপায় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মিডিয়া ও ভার্চুয়াল জগতের বিষয়ে মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানো। জনগণকে বুঝতে হবে, প্রতিটি ছবি, বর্ণনা বা ভিডিও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি অংশ হতে পারে।

বর্তমান সময়ে ভুয়া বর্ণনা শনাক্ত করা, গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করা এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী করা সামরিক সরঞ্জামের মতোই—বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি—গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, জ্ঞানযুদ্ধের ময়দানে প্রত্যেক নাগরিক একজন যোদ্ধা এবং প্রতিটি মোবাইল ফোন একটি দুর্গের মতো। সামান্য অসতর্কতাও মানুষের মনে শত্রুর অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এই ময়দানে বিজয়ের জন্য দূরদর্শিতা, সচেতনতা ও জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।

প্রথম খুতবা: তাকওয়া সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের শক্তি দেয়
খুতবার প্রথম অংশে আয়াতুল্লাহ সাঈদী কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন:

یَا أَیُّهَا الَّذِینَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ یَجْعَلْ لَکُمْ فُرْقَانًا.

“হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অবলম্বন করো), তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের শক্তি দান করবেন।
[সূরা আল-আনফাল, আয়াত ২৯]

তিনি বলেন, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে মুমিন এমন এক পরিপক্বতায় পৌঁছায়, যেখানে আল্লাহ তাকে এমন নূর ও অন্তর্দৃষ্টি দান করেন, যার মাধ্যমে সে সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করতে পারে।

এরপর তিনি সূরা আল-ফাতহের ২৮ নম্বর আয়াত পাঠ করেন:

هُوَ الَّذِی أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَیٰ وَدِینِ الْحَقِّ لِیُظْهِرَهُ عَلَی الدِّینِ کُلِّهِ ۚ وَکَفَیٰ بِاللَّهِ شَهِیدًا.

“তিনিই তাঁর রাসুলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি এটিকে সব দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।
[সূরা আল-ফাতহ, আয়াত ২৮]

আয়াতুল্লাহ সাঈদী বলেন, আয়াতের শেষাংশ «وَکَفَیٰ بِاللَّهِ شَهِیدًا» পুরো যুক্তির চূড়ান্ত অংশ। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাতের সত্যতা, ইসলামের সত্যতা এবং আয়াতে বর্ণিত লক্ষ্য—সব দ্বীনের ওপর ইসলামের বিজয়—সম্পর্কে আল্লাহর সাক্ষ্যকে নির্দেশ করে।

হুদাইবিয়ার শিক্ষা: বাহ্যিক পরিস্থিতিই চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়
তিনি বলেন, হুদাইবিয়ার পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলে আয়াতটির এই সমাপ্তির বিশেষ তাৎপর্য বোঝা যায়। মুসলমানরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, যা তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একদিকে মুশরিকরা মুসলমানদের হজ করতে বাধা দিয়েছিল, অন্যদিকে মুসলমানরা এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, যার কিছু শর্ত আপাতদৃষ্টিতে তাদের জন্য ক্ষতিকর ছিল।

কিন্তু আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের তাড়াহুড়ো করে বিচার করা থেকে বিরত রেখে তাঁর সাক্ষ্য ও সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতে শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ যখন কোনো বিষয়ের সাক্ষী, তখন কোনো ঘটনার বাহ্যিক চেহারা তার চূড়ান্ত বিচারের মানদণ্ড হতে পারে না।

হুদাইবিয়ার ঘটনায় আল্লাহ মুসলমানদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করেছেন, যাতে তারা বাহ্যিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিচার করার পরিবর্তে আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিকল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

তিনি বলেন, আল্লাহর ‘সাক্ষী’ হওয়ার অর্থ শুধু তিনি সবকিছু জানেন—এটুকু নয়; বরং তিনি সব বিষয়ের ওপর পূর্ণ জ্ঞান ও পরিব্যাপ্তি রাখেন। আল্লাহ সত্য দ্বীনের সাক্ষী—অর্থাৎ এই দ্বীন আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে; এটি কোনো গোত্রীয় বা জাতিগত চুক্তির ফল নয়।

তিনি বলেন, মক্কার কিছু কাফের দাবি করত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নবুওয়াতের দাবি করেছেন। পরবর্তীকালে ইয়াজিদের সময়ও একই ধরনের বিকৃত চিন্তা দেখা যায়। তারা বলত, নবী (সা.)-এর দাদা নাকি রাজত্ব ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই দাবি করেছিলেন এবং এটি কোনো ওহি ছিল না।

সত্যের পথ জটিলতা পেরিয়ে চূড়ায় পৌঁছায়
আয়াতুল্লাহ সাঈদী বলেন, আল্লাহর সাক্ষ্য «لِیُظْهِرَهُ عَلَی الدِّینِ کُلِّهِ»—“যাতে তিনি এটিকে সব দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন”—এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নেরও প্রমাণ।

অর্থাৎ সত্য দ্বীনের পথ যতই জটিলতা ও বাঁক অতিক্রম করুক—যেমন হুদাইবিয়ার ঘটনায় হয়েছিল—তা শেষ পর্যন্ত সেসব অতিক্রম করে চূড়ায় পৌঁছাবে।

তিনি বলেন, ইসলামি বিপ্লবও একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুরু হয়েছিল। সেই সময়ও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল—যে রক্ত ঝরছে, তার জবাব কে দেবে? ইমাম খোমেনি (রহ.) বলেছিলেন, “যিনি কারবালার রক্তের জবাব দিয়েছেন, তিনিই এই রক্তেরও জবাব দেবেন।”

তিনি আরও বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) ও আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী «إِنْ یَنْصُرْکُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَکُمْ»—“আল্লাহ যদি তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না”—এই ঐশী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে জনগণ ও প্রতিরোধশক্তিকে চূড়ান্ত বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন।

তাঁরা সতর্ক করেছেন যে কোনো পথের সত্যতা দ্রুত ও বাহ্যিক বিজয়ের মাধ্যমে পরিমাপ করা উচিত নয়। নিজেদের পথের সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শত্রুর বিচার, জনমতের সাময়িক পরিস্থিতি কিংবা ক্ষণস্থায়ী ঘটনাকে চূড়ান্ত মানদণ্ড বানানো উচিত নয়।

আয়াতুল্লাহ সাঈদী বলেন, যদি সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড শত্রুর দৃষ্টিভঙ্গি বা জনমতের সন্তুষ্টি হতো, তাহলে কোনো নবীই আসতে পারতেন না। কারণ যেসব সমাজে নবী পাঠানো হয়েছিল, সেসব সমাজের জনমতের বড় অংশই তাঁদের বিরোধিতা করেছিল। এই পথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর দৃষ্টিতে সত্য ও সঠিক হওয়া।

তিনি বলেন, সূরা আল-ফাতহের ২৮ নম্বর আয়াত অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিন সময়কেই নির্দেশ করে। অতীতের ক্ষেত্রে এটি দেখায় যে হুদাইবিয়ায় যা ঘটেছিল, তা পশ্চাদপসরণ বা পরাজয় ছিল না। বর্তমানের ক্ষেত্রে এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর আস্থা এবং প্রশান্তি ও স্থিরতার আহ্বান জানায়। আর ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে «لِیُظْهِرَهُ عَلَی الدِّینِ کُلِّهِ» বাক্যটি সত্য দ্বীনের বিজয়ের দিগন্তের সুসংবাদ দেয়।

অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাত কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ইসলামের রয়েছে বিশ্বজনীনতার সক্ষমতা এবং সত্য দ্বীনের বিজয়ের একটি ভবিষ্যৎ দিগন্ত।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha