হাওজা নিউজ এজেন্সি: সন্তানকে প্রতিনিয়ত তাগাদা দেওয়া, তার ভুল ধরা কিংবা বকাঝকা করার পরিবর্তে সঠিক লালন পালনের পদ্ধতি অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন।
তিনি ‘সন্তানের ভুল ধরা ও বকাঝকা’ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন
এক মা প্রশ্ন করেন, ‘আমার স্বামী আমাদের আট বছরের ছেলেকে সবসময় সতর্ক করেন এবং তার ভুল ধরেন। আমি যতই বলি যে এই পদ্ধতি সঠিক নয়, তিনি শোনেন না এবং নিজের মতোই করেন। আমার স্বামী রাগী, সবসময় ভুল ধরেন এবং অন্তর্মুখী স্বভাবের। এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যায়?’
জবাবে তারাশিয়ুন বলেন, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে অনেক বাবা-মা সঠিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরিবর্তে বারবার সতর্ক করা, আদেশ-নিষেধ কিংবা কখনো শাস্তি দেওয়ার পথ বেছে নেন। এর অন্যতম কারণ হলো, তারা সন্তানকে শেখানো ও তার আচরণ পরিচালনার বিকল্প কার্যকর পদ্ধতিগুলো জানেন না।
তিনি বলেন, ‘এই পরিবারে যা ঘটছে, সংক্ষেপে তা হলো—সন্তান প্রতিপালনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি।’
তার মতে, বাবা-মায়ের কাছে যদি সন্তানকে পরিচালনার প্রধান পদ্ধতি হয়ে ওঠে সতর্ক করা, আদেশ-নিষেধ কিংবা শাস্তি দেওয়া, তাহলে তা সবসময় প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব পদ্ধতি শিশুর ওপর বিপরীত প্রভাব ফেলে এবং তার মানসিকতার ক্ষতি করতে পারে।
তাই প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বাবা-মায়ের সন্তান প্রতিপালনবিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, শিশু কোনো ভুল করলে সাধারণত এর দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত: ভুলটি শিশুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে হতে পারে। যেমন, কোনো শিশু খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত চায়ের ট্রেতে পা লাগিয়ে চা ফেলে দিল। এ ক্ষেত্রে শিশুকে বকাঝকা করার প্রয়োজন নেই। বরং পরিবেশকে নিরাপদ করা উচিত—যেমন, চলাচলের পথে চায়ের ট্রে না রাখা।
দ্বিতীয়ত: শিশুটি হয়তো প্রয়োজনীয় কোনো দক্ষতা এখনো শেখেনি। যেমন, বাবা-মা যদি সন্তানকে বারবার বলেন, ‘বসে পড়ো, বাড়ির কাজ করো’ কিংবা ‘তুমি সবসময় কাজ শেষ রাত পর্যন্ত ফেলে রাখো কেন?’—তাহলে তারা আসলে তাকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোর পরিবর্তে শুধু তাগাদা দিচ্ছেন।
সম্ভবত শিশুটি এখনো সময় ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার দক্ষতা শেখেনি। এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো তাকে সেই দক্ষতা শেখানো, বকাঝকা করা নয়।
জনাব তারাশিয়ুন বলেন, সন্তানের সঙ্গে সহানুভূতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে আচরণ করা যেতে পারে। যেমন, মা সন্তানকে বলতে পারেন— > ‘বাবা, আমি বলছি না যে তুমি টেলিভিশন দেখবে না। তুমি দেখতে পারো। আমি এটাও বলছি না যে তুমি খেলবে না; খেলাধুলা করাও তোমার অধিকার। তবে তোমাকে বাড়ির কাজও করতে হবে। এসো, আমরা একসঙ্গে পরিকল্পনা করি। কোন কার্টুনটা তুমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করো? কখন সেটা প্রচার হয়? ছয়টায়? ঠিক আছে, ছয়টায় টেলিভিশন চালু করবে এবং অনুষ্ঠান শেষ হলে বন্ধ করে দেবে। এরপর খেলার জন্যও সময় রাখব। এসো, আমরা একসঙ্গে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা খেলি। খেলা শেষে নিশ্চিন্তে তোমার বাড়ির কাজ করবে।’
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিবেশে ঘরের উত্তেজনা কমে যায় এবং তার জায়গা নেয় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ। তাই সন্তানকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্বামীকে সন্তান প্রতিপালনে সহযোগী করবেন যেভাবে
যে মা স্বামীর আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেছেন, তার উদ্দেশে তারাশিয়ুন বলেন, সম্ভব হলে ঘরে সরাসরি স্বামীকে বারবার উপদেশ বা সমালোচনা না করে একসঙ্গে সন্তান প্রতিপালনবিষয়ক বই পড়ার জন্য সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। বিষয়টি এমনভাবে করা উচিত, যাতে তা বিরোধ বা মুখোমুখি অবস্থানের রূপ না নেয়।
তিনি নারীদের উদ্দেশে বলেন, কথার শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যদি কোমল ও কার্যকর ভাষায় স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, তাহলে তার স্বামীর আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় কিছু নারী অনিচ্ছাকৃতভাবে স্বামীর সঙ্গে কঠোর, কর্তৃত্বপূর্ণ কিংবা সমালোচনামূলক ভাষায় কথা বলেন। এতে স্বামীও প্রতিরোধী বা জেদি মনোভাব গ্রহণ করতে পারেন।
এরপর তিনি তার কাছে আসা এক নারীর ঘটনা উল্লেখ করেন। ওই নারী তাকে জানান, তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন। বিষয়টি জানার পর তিনি ওই নারীকে খুঁজে বের করে তার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত স্বামীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
ওই নারী আরও বলেন, ‘অদ্ভুত বিষয় হলো, ওই নারী আমার স্বামীর চেয়ে ১৩-১৪ বছরের বড় ছিলেন, তার বিশেষ কোনো সৌন্দর্যও ছিল না এবং আর্থিক অবস্থাও আমাদের তুলনায় দুর্বল ছিল। আমি বুঝতে পারি না, আমার স্বামী কেন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।’
তারাশিয়ুন বলেন, তিনি তখন ওই নারীকে বলেন, ‘হয়তো উত্তরটা আপনি নিজেই জানেন।’
তার ব্যাখ্যায়, ওই নারীর একটি বিশেষ গুণ ছিল—তিনি কোমল ও মিষ্টি ভাষায় কথা বলতেন। কথার মাধ্যমে তিনি ওই পুরুষের হৃদয় জয় করেছিলেন।
এই ঘটনা থেকে তিনি বলেন, কখনো কখনো একজন নারীর বহু ইতিবাচক গুণ ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার কথার ধরন যদি কঠোর বা তিক্ত হয়, তাহলে তিনি স্বামীর ওপর কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেন না। বিপরীতে, কোমল ও কার্যকর ভাষা অনেক সময় মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কথার শক্তি তরবারির চেয়েও বেশি।’
তাই একজন নারী যদি নিজের কথা বলার ধরন ও যোগাযোগের দক্ষতা উন্নত করতে পারেন, তাহলে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তিনি স্বামীকে একজন কার্যকর সহযোগী হিসেবে পাশে পেতে পারেন।
সূত্র: হাওজা নিউজ
বক্তা: হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন, পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
আপনার কমেন্ট